
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

২৮ বছর পর বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েই প্রথমবারের মতো নকআউটে জয় তুলে নিয়েছে নরওয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস স্টেডিয়ামে আইভরি কোস্টকে হারিয়ে আর্লিং হাল্যান্ড-মার্টিন ওডেগার্ডরা মাতলেন বুনো উল্লাসে। মাঠ ঘুরে উইনিং ল্যাপও দিলেন। সেই সঙ্গে সঙ্গে ফের ফিরিয়ে আনলেন ‘ভাইকিং রো’।
ড্রামস্টিক হাতে তাতে নেতৃত্ব দিলেন অধিনায়ক ওডেগার্ড। হাল্যান্ড-নুসাসহ স্কোয়াডের বাকিরা বসে পড়লেন মাঠে। সামনের ড্রামে ওডেগার্ডের একেক জোড়া বাড়িতেই হাল্যান্ডরা বাইরে শুরু করলেন এক অদৃশ্য নৌকা। ড্রামের তালে তালে স্টেডিয়ামে উপস্থিত নরওয়েজিনরাও যোগ দিলেন সে ‘নৌ যাত্রা’য়। সঙ্গে প্রতিবার ড্রামের বাড়ির পর স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে উচ্চারণ— ‘রো! রো! রো!’।

আইভরি কোস্ট ম্যাচেই কেবল নয়, এর আগে গ্রুপ পর্বে সেনেগালকে হারিয়ে যখন নরওয়ে নিজেদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার নকআউট নিশ্চিত করে, সেদিনও একই উদ্যাপনে মেতেছিলেন ওডেগার্ড-হাল্যান্ডরা। সবাই মিলে যেন বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন প্রাচীন নর্ডিক এক যুদ্ধজাহাজকে। তারা বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, হাজার বছরের পুরনো জলদস্যুদের ইতিহাসকে।
মাঠ পেরিয়ে বিশ্ব জুড়ে ‘ভাইকিং রো’ মহামারি
সেনেগাল ম্যাচের পরই নরওয়েজিয়ানদের ‘ভাইকিং রো’ গোটা বিশ্বে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে। পরিণত হয় অনলাইনের সবচেয়ে বড় ভাইরাল ট্রেন্ডে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তোলপাড়। আইভরি কোস্ট ম্যাচের পরও ব্যতিক্রম হয়নি। এ ম্যাচের পরও অনলাইন মাতাচ্ছে ‘ভাইকিং রো’।
সেনেগাল ম্যাচের পরই নিউইয়র্কের বিখ্যাত টাইমস স্কয়ারের রেড স্টেপে শত শত নরওয়ে সমর্থক লাল-নীল জার্সি পরে একসঙ্গে মেঝেতে বসে পড়েন এবং ফুটবলারদের অনুকরণে ‘ভাইকিং রো’ চ্যান্ট করতে থাকেন, যার ভিডিও বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষের টাইমলাইনে ঘুরপাক খায়।

শুধু টাইমস স্কয়ারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি সে উন্মাদনা, নিউইয়র্কের সাবওয়ে ট্রেনের মেঝেতে বসে, চলন্ত এসকেলেটরে, এমনকি ম্যানহাটনের একটি ইয়োগা ক্লাসের ভেতরেও আমেরিকানদের সঙ্গে নিয়ে নরওয়েজিয়ান ফ্যানদের এই নৌকার বৈঠা বাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে।
সারা বিশ্বেই স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় নরওয়েজিয়ান ও নরওয়ে ফুটবল দলের ভক্ত-সমর্থকরা ‘ভাইকিং রো’ করে ইন্টারনেট সয়লাব করে দিয়েছেন। সেই উন্মাদনা এমনকি ছড়িয়ে পড়ে অসলোতে নরওয়ে পার্লামেন্টেও! সেখানে বিশ্বকাপের নকআউটে কোয়ালিফাই করার ঐতিহাসিক অর্জনকে সম্মান জানাতে এবং জাতীয় সংহতি প্রকাশ করতে পার্লামেন্টের অধিবেশন কিছুক্ষণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করা হয়। এরপর দেশের মন্ত্রিসভার সদস্যসহ সরকারি ও বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা সমস্বরে ‘রো! রো!’ স্লোগান দিয়ে আইনসভার ভেতরেই নৌকা বাওয়ার অভিনয় করেন।
ওলে ফ্রয়স্তাদের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত
বৈশ্বিক ক্রীড়া গণমাধ্যমগুলো নরওয়ের ‘ভাইকিং রো’কে চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা, সুশৃঙ্খল এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ‘ফ্যান ট্র্যাডিশন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। এই বিশ্বমাতানো উদ্যাপনের পেছনের ইতিহাস কী? কীভাবে ‘ভাইকিং রো’ নরওয়েজিয়ানদের উদ্যাপনের অংশ হলো?
এই অবিশ্বাস্য রকমের সংক্রামক উদ্যাপনের পেছনে রয়েছেন ওলে ফ্রয়স্তাদ নামের এক কট্টর নরওয়েজিয়ান ফুটবল ভক্ত। তার উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত একটি সাধারণ আইডিয়াই পুরো নরওয়েকে এক সুতোয় বেঁধেছে, বিশ্ববাসীর কাছে দিয়েছে নতুন পরিচয়।

সারা বিশ্বকে সংক্রমিত করা এ উদ্যাপন হাজার বছরের পুরনো স্মৃতিকে মনে করিয়ে দিলেও এর উৎপত্তি কিন্তু এই মাত্র গত বছর। ওলে ফ্রয়স্তাদ ভাবছিলেন, ঠিক কেমন একটি উদ্যাপন গোটা জাতিকে এক সুতোয় বাঁধতে পারবে। সেই ভাবনা থেকেই তিনি ফেরেন ইতিহাসের পাতায়, টেনে আনেন জলদস্যুদের ইতিহাস।
নিজের একটি সাধারণ ভাবনার এই বৈশ্বিক ও জাতীয় রূপ দেখে আবেগাপ্লুত ওলে ফ্রয়স্তাদ গণমাধ্যমকে বলেন, আমি স্রেফ একটা আইডিয়া দিয়েছিলাম। সেটা যে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারের লাল সিঁড়িতে বা সাবওয়ে ট্রেনের ভেতরে আমেরিকানদের এভাবে লাইনে বসিয়ে দেবে, সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি! ভাইকিং রো এখন আর শুধু নরওয়ের নেই, এটা পুরো ফুটবল বিশ্বের একটা উৎসব হয়ে গেছে।
কিন্তু ভাইকিংসদের সঙ্গে নরওয়ের সম্পর্ক কী?
ফ্রয়স্তাদের উদ্ভাবন করা ‘ভাইকিং রো’য়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নরওয়ের হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রক্তের টান। ভাইকিংসদের সঙ্গে নরওয়ের সম্পর্ক কোনো রূপকথা বা সিনেমার গল্প নয়, এটি তাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও সংস্কৃতিরও অন্যতম মূল ভিত্তি।
অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত গোটা ইউরোপ কাঁপানো, দূরদর্শী ও অকুতোভয় সমুদ্রচারী যোদ্ধা, জলদস্যু ও বণিকদের ‘ভাইকিং’ বলা হতো। আর এই ভাইকিংসদের মূল কেন্দ্রস্থল ছিল বর্তমান স্ক্যান্ডিনেভিয়ান তিন দেশ নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক। ৮৭২ সালে ঐতিহাসিক ‘ব্যাটল অব হাভরসফিয়র্ডে’র মাধ্যমে প্রথম ভাইকিং রাজা হারাল্ড ফেয়ারহেয়ার ছোট ছোট উপজাতীয় রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে একীভূত নরওয়ে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ফলে আজকের আধুনিক নরওয়ে রাষ্ট্রটি সরাসরি সেই প্রাচীন ভাইকিংদেরই রক্ত বহন করছে। ভাইকিংদের ভাষা, নর্স মিথোলজি, জীবনদর্শন ও অদম্য মানসিকতার ডিএনএ আজও নরওয়েজিয়ানের ধমনীতে প্রবাহিত। নিজেদের যেকোনো বড় জাতীয় অর্জনে ভাইকিং ইতিহাসকে টেনে আনা তাদের জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক ও গভীর গর্বের বিষয়। ফ্রয়স্তাদও সেই ইতিহাসকেই সংশ্লিষ্ট করেছেন উদ্যাপনে।
লংশিপের রণকৌশল: একতা ও নিখুঁত সিনক্রোনাইজেশনের প্রতীক
ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের অদৃশ্য বৈঠা বাওয়ার উদ্যাপনের পেছনে রয়েছে ভাইকিংদের জীবনধারণ ও যুদ্ধের এক চমৎকার রণকৌশল। ভাইকিংদের প্রধান শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্বের মূল চাবিকাঠি ছিল তাদের তৈরি বিশেষ ধরনের যুদ্ধজাহাজ, যা ‘লংশিপ’ নামে পরিচিত। এই জাহাজগুলো ছিল অত্যন্ত হালকা, সুগঠিত ও গতিশীল, যা সাগরের উত্তাল তরঙ্গ মাড়িয়ে নদী বা সমুদ্রের একদম অগভীর পানিতেও সহজে চলতে পারত।
এই লংশিপগুলোর মূল চালিকাশক্তি ছিল মানুষের শারীরিক শক্তি ও বৈঠা বাওয়া বা ‘রোয়িং’। একটি বিশাল লংশিপে ৩০ থেকে ৬০ জন ভাইকিং যোদ্ধা একসঙ্গে বসে বৈঠা বাইতেন। জাহাজের মাঝখানে একজন অভিজ্ঞ নেতা ড্রাম বাজিয়ে বা তালি দিয়ে বৈঠা বাওয়ার গতি ও ছন্দ ঠিক রাখতেন।

ভাইকিং রণকৌশলে এই বৈঠা বাওয়া ছিল চরম একতা, নিখুঁত টাইমিং ও পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রতীক। যদি একজন যোদ্ধাও সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য নিজের তাল হারাতেন, তবে পুরো জাহাজের গতি থমকে যেত এবং বিশাল বৈঠাগুলো একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতো।
সমুদ্রের ভয়াবহ ঝড় কিংবা শত্রুসেনাদের মুখোমুখি যুদ্ধযাত্রার সময় নিজেদের মনোবল ধরে রাখতে তারা ড্রামের তালের সঙ্গে মিল রেখে সমস্বরে হুংকার ছাড়ত। ফুটবল মাঠে আরলিং হাল্যান্ডরা ঠিক সেই হাজার বছর আগের লংশিপের একতা ও ছন্দেরই আধুনিক পুনরুত্থান ঘটাচ্ছেন।
‘ভাইকিং স্পিরিটে’ তারকাখ্যাতি বনাম চরম সাম্যবাদ
আধুনিক স্পোর্টস অ্যানালিস্ট ও সমাজবিজ্ঞানীরা এই উদ্যাপনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিকও বিশ্লেষণ করছেন। তারা বলছেন, আধুনিক ফুটবলে যেখানে তারকা খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত অহংকার বা ‘ইগো’ প্রায়ই দলের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে নরওয়ের এই উদযাপন এক অনন্য বার্তা দেয়।
মাঠে যখন হাল্যান্ড বা ওডেগার্ডের মতো শত কোটি টাকার সুপারস্টাররা সাইডবেঞ্চের অতিরিক্ত খেলোয়াড় কিংবা কোচিং স্টাফদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মেঝেতে বসে একই ছন্দে বৈঠা বাইতে থাকেন, সেটি দলের ভেতরের সাম্যবাদের ধারণাকে ছড়িয়ে দেয়। প্রতিপক্ষকেও বার্তা দেওয়া হয়— আমরা মাঠে আলাদা কোনো ব্যক্তি নই, আমরা সবাই একই নৌকার যাত্রী।

এই অনন্য ও সুশৃঙ্খল রণকৌশল প্রতিপক্ষের মনেও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করে। বিবিসি স্পোর্টসের বিশ্লেষক এবং ইংল্যান্ডের সাবেক কিংবদন্তি স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়ারার বিষয়টিকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, আইসল্যান্ডের সেই বিখ্যাত ‘ভাইকিং ক্ল্যাপে’র পর ফুটবল বিশ্বে এত শক্তিশালী ও সংক্রামক কোনো ফ্যান ট্রাডিশন আর দেখা যায়নি। নরওয়ে ফুটবল দুনিয়াকে স্রেফ নাচিয়ে ছাড়ছে।
একই সুর শোনা গেছে আরেক সাবেক ইংলিশ ফুটবলার ও স্কাই স্পোর্টসের জনপ্রিয় ফুটবল ধারাভাষ্যকার জেমি ক্যারাঘেরের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, খেলোয়াড়দের এই উদযাপনটা দেখতে যতটা সুন্দর, প্রতিপক্ষের জন্য মানসিকভাবে ততটাই ভীতিজাগানিয়া। আপনি যখন দেখবেন ১১ জন অ্যাথলেট আপনার সামনে বসে যুদ্ধের নৌকার মতো হুংকার ছাড়ছে, তখন মানসিকভাবে আপনি একধাপ পিছিয়ে যাবেনই।
প্রশংসার সঙ্গে রয়েছে সমালোচনাও
তবে এই নজিরবিহীন উদযাপন যে সর্বজনীনভাবে প্রশংসিত, তা কিন্তু নয়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের রাজনীতি ও ক্রীড়াঙ্গনে এটি বেশ কিছু তপ্ত বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। নরওয়ের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী দেশ সুইডেনের মূলধারার প্রভাবশালী পত্রিকা ড্যাজেনস নাইহেটের এই উদ্যাপনকে কটাক্ষ করে একে ‘ভাইকিং ভাঁড়ামো’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের সম্পাদকীয়তে দাবি করা হয়েছে, সুইডিশ খেলোয়াড়রা মাঠে এমন উগ্র বা নাটকীয় আচরণ করলে তারা লজ্জায় মুখ ঢাকতেন।
নরওয়ের কিছু বামপন্থি সমাজবিজ্ঞানী ও সমালোচকও ‘ভাইকিং রো’কে সমালোচনা করতে ছাড়েননি। তাদের মতে, হাজার বছর আগের জলদস্যু ও যোদ্ধাদের সংস্কৃতিকে এভাবে মূলধারার খেলায় ফিরিয়ে আনা ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’ ও ‘হাইপার-ম্যাসকিউলিনিটি’ বা উগ্র পুরুষতান্ত্রিকতাকেই উসকে দেয়।
তবে এসব সমালোচনাকে হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছেন ফুটবল ভক্তরা। সুইডিশ মিডিয়ার সমালোচনার কড়া জবাব দিয়ে নরওয়ে জাতীয় দলের প্রধান কোচ স্তাল সোলবাকেন ও বলেন, বাইরে কে কী সমালোচনা করল, কোন দেশের মিডিয়া এটাকে ‘ভাঁড়ামো’ বলল তা নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। মাঠে ও ড্রেসিংরুমে আমার ছেলেরা যে একতা দেখিয়েছে, এটাই আসল ভাইকিং স্পিরিট।

ম্যাচের মূল নায়ক আরলিং হাল্যান্ডও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, যখন আমরা সবাই একসঙ্গে মাঠের ঘাসে বসে ওভাবে বৈঠা বাইতে শুরু করি, তখন শরীরে অন্যরকম একটা শক্তি চলে আসে। এটা আমাদের ডিএনএতে আছে। আমরা এখানে শুধু ম্যাচ জিততে আসিনি, আমরা ভাইকিংদের মতোই বিশ্বমঞ্চ জয় করতে এসেছি।
দলের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডও তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে যোগ করেন, এই সেলিব্রেশনটা আমাদের পুরো স্কোয়াডকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে। গ্যালারিতে যখন হাজার হাজার ফ্যান আমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাত নাড়ায়, তখন মনে হয় পুরো স্টেডিয়ামটাই একটা বিশাল ভাইকিং লংশিপ। এই একতাই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার হওয়ার সাহস দিচ্ছে।
নিউজার্সির মহাযুদ্ধের অপেক্ষায় লংশিপ
২৮ বছর পর বিশ্বকাপে এসেই নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করাটাই নরওয়ের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা সাফল্য। তবে সেখানেই তারা থেমে থাকেনি, শেষ বত্রিশের ম্যাচে আফ্রিকার সিংহ আইভরি কোস্টকে ‘নকডআউট’ করে ছেড়েছে।
এই সাফল্যকে হাল্যান্ড-ওডেগার্ডরা আরও লম্বা করতে চাইবেন নিশ্চয়, তবে তাদের সে আকাঙ্ক্ষা পূরণ সহজ হবে না মোটেও। কারণ নকআউটের দ্বিতীয় রাউন্ডে শেষ ষোলোর খেলায় তাদের প্রতিপক্ষ পাঁচ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল!
নিউইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আগামী রোববার (৫ জুলাই) দিবাগত রাতে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যদের মুখোমুখি হবেন স্তাল সোলবাকেনের শিষ্যরা। জাপানের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের গোলে জিতে মানসিকভাবে চনমনে থাকা ব্রাজিলের বিপক্ষে হাল্যান্ড-ওডেগার্ডদের লড়াই যে সহজ হবে না, তা বলাই বাহুল্য।
ব্রাজিলিয়ান সাম্বার সামনে নরওয়ের এই প্রাচীন ভাইকিং লংশিপ কি আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, নাকি নিউজার্সির বুকেই সলিলসমাধি ঘটবে— তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও চার দিন। সে ম্যাচের ফলাফল যাই হোক না কেন, নরওয়েজিয়ানরা তাদের হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য, অদম্য ইচ্ছা, অনন্য টিমওয়ার্ক আর ‘ভাইকিং রো’ দিয়ে এ বিশ্বকাপকে এরই মধ্যে চিরস্মরণীয় করে তুলেছে।

২৮ বছর পর বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েই প্রথমবারের মতো নকআউটে জয় তুলে নিয়েছে নরওয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস স্টেডিয়ামে আইভরি কোস্টকে হারিয়ে আর্লিং হাল্যান্ড-মার্টিন ওডেগার্ডরা মাতলেন বুনো উল্লাসে। মাঠ ঘুরে উইনিং ল্যাপও দিলেন। সেই সঙ্গে সঙ্গে ফের ফিরিয়ে আনলেন ‘ভাইকিং রো’।
ড্রামস্টিক হাতে তাতে নেতৃত্ব দিলেন অধিনায়ক ওডেগার্ড। হাল্যান্ড-নুসাসহ স্কোয়াডের বাকিরা বসে পড়লেন মাঠে। সামনের ড্রামে ওডেগার্ডের একেক জোড়া বাড়িতেই হাল্যান্ডরা বাইরে শুরু করলেন এক অদৃশ্য নৌকা। ড্রামের তালে তালে স্টেডিয়ামে উপস্থিত নরওয়েজিনরাও যোগ দিলেন সে ‘নৌ যাত্রা’য়। সঙ্গে প্রতিবার ড্রামের বাড়ির পর স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে উচ্চারণ— ‘রো! রো! রো!’।

আইভরি কোস্ট ম্যাচেই কেবল নয়, এর আগে গ্রুপ পর্বে সেনেগালকে হারিয়ে যখন নরওয়ে নিজেদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার নকআউট নিশ্চিত করে, সেদিনও একই উদ্যাপনে মেতেছিলেন ওডেগার্ড-হাল্যান্ডরা। সবাই মিলে যেন বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন প্রাচীন নর্ডিক এক যুদ্ধজাহাজকে। তারা বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, হাজার বছরের পুরনো জলদস্যুদের ইতিহাসকে।
মাঠ পেরিয়ে বিশ্ব জুড়ে ‘ভাইকিং রো’ মহামারি
সেনেগাল ম্যাচের পরই নরওয়েজিয়ানদের ‘ভাইকিং রো’ গোটা বিশ্বে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে। পরিণত হয় অনলাইনের সবচেয়ে বড় ভাইরাল ট্রেন্ডে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তোলপাড়। আইভরি কোস্ট ম্যাচের পরও ব্যতিক্রম হয়নি। এ ম্যাচের পরও অনলাইন মাতাচ্ছে ‘ভাইকিং রো’।
সেনেগাল ম্যাচের পরই নিউইয়র্কের বিখ্যাত টাইমস স্কয়ারের রেড স্টেপে শত শত নরওয়ে সমর্থক লাল-নীল জার্সি পরে একসঙ্গে মেঝেতে বসে পড়েন এবং ফুটবলারদের অনুকরণে ‘ভাইকিং রো’ চ্যান্ট করতে থাকেন, যার ভিডিও বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষের টাইমলাইনে ঘুরপাক খায়।

শুধু টাইমস স্কয়ারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি সে উন্মাদনা, নিউইয়র্কের সাবওয়ে ট্রেনের মেঝেতে বসে, চলন্ত এসকেলেটরে, এমনকি ম্যানহাটনের একটি ইয়োগা ক্লাসের ভেতরেও আমেরিকানদের সঙ্গে নিয়ে নরওয়েজিয়ান ফ্যানদের এই নৌকার বৈঠা বাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে।
সারা বিশ্বেই স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় নরওয়েজিয়ান ও নরওয়ে ফুটবল দলের ভক্ত-সমর্থকরা ‘ভাইকিং রো’ করে ইন্টারনেট সয়লাব করে দিয়েছেন। সেই উন্মাদনা এমনকি ছড়িয়ে পড়ে অসলোতে নরওয়ে পার্লামেন্টেও! সেখানে বিশ্বকাপের নকআউটে কোয়ালিফাই করার ঐতিহাসিক অর্জনকে সম্মান জানাতে এবং জাতীয় সংহতি প্রকাশ করতে পার্লামেন্টের অধিবেশন কিছুক্ষণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করা হয়। এরপর দেশের মন্ত্রিসভার সদস্যসহ সরকারি ও বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা সমস্বরে ‘রো! রো!’ স্লোগান দিয়ে আইনসভার ভেতরেই নৌকা বাওয়ার অভিনয় করেন।
ওলে ফ্রয়স্তাদের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত
বৈশ্বিক ক্রীড়া গণমাধ্যমগুলো নরওয়ের ‘ভাইকিং রো’কে চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা, সুশৃঙ্খল এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ‘ফ্যান ট্র্যাডিশন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। এই বিশ্বমাতানো উদ্যাপনের পেছনের ইতিহাস কী? কীভাবে ‘ভাইকিং রো’ নরওয়েজিয়ানদের উদ্যাপনের অংশ হলো?
এই অবিশ্বাস্য রকমের সংক্রামক উদ্যাপনের পেছনে রয়েছেন ওলে ফ্রয়স্তাদ নামের এক কট্টর নরওয়েজিয়ান ফুটবল ভক্ত। তার উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত একটি সাধারণ আইডিয়াই পুরো নরওয়েকে এক সুতোয় বেঁধেছে, বিশ্ববাসীর কাছে দিয়েছে নতুন পরিচয়।

সারা বিশ্বকে সংক্রমিত করা এ উদ্যাপন হাজার বছরের পুরনো স্মৃতিকে মনে করিয়ে দিলেও এর উৎপত্তি কিন্তু এই মাত্র গত বছর। ওলে ফ্রয়স্তাদ ভাবছিলেন, ঠিক কেমন একটি উদ্যাপন গোটা জাতিকে এক সুতোয় বাঁধতে পারবে। সেই ভাবনা থেকেই তিনি ফেরেন ইতিহাসের পাতায়, টেনে আনেন জলদস্যুদের ইতিহাস।
নিজের একটি সাধারণ ভাবনার এই বৈশ্বিক ও জাতীয় রূপ দেখে আবেগাপ্লুত ওলে ফ্রয়স্তাদ গণমাধ্যমকে বলেন, আমি স্রেফ একটা আইডিয়া দিয়েছিলাম। সেটা যে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারের লাল সিঁড়িতে বা সাবওয়ে ট্রেনের ভেতরে আমেরিকানদের এভাবে লাইনে বসিয়ে দেবে, সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি! ভাইকিং রো এখন আর শুধু নরওয়ের নেই, এটা পুরো ফুটবল বিশ্বের একটা উৎসব হয়ে গেছে।
কিন্তু ভাইকিংসদের সঙ্গে নরওয়ের সম্পর্ক কী?
ফ্রয়স্তাদের উদ্ভাবন করা ‘ভাইকিং রো’য়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নরওয়ের হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রক্তের টান। ভাইকিংসদের সঙ্গে নরওয়ের সম্পর্ক কোনো রূপকথা বা সিনেমার গল্প নয়, এটি তাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও সংস্কৃতিরও অন্যতম মূল ভিত্তি।
অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত গোটা ইউরোপ কাঁপানো, দূরদর্শী ও অকুতোভয় সমুদ্রচারী যোদ্ধা, জলদস্যু ও বণিকদের ‘ভাইকিং’ বলা হতো। আর এই ভাইকিংসদের মূল কেন্দ্রস্থল ছিল বর্তমান স্ক্যান্ডিনেভিয়ান তিন দেশ নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক। ৮৭২ সালে ঐতিহাসিক ‘ব্যাটল অব হাভরসফিয়র্ডে’র মাধ্যমে প্রথম ভাইকিং রাজা হারাল্ড ফেয়ারহেয়ার ছোট ছোট উপজাতীয় রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে একীভূত নরওয়ে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ফলে আজকের আধুনিক নরওয়ে রাষ্ট্রটি সরাসরি সেই প্রাচীন ভাইকিংদেরই রক্ত বহন করছে। ভাইকিংদের ভাষা, নর্স মিথোলজি, জীবনদর্শন ও অদম্য মানসিকতার ডিএনএ আজও নরওয়েজিয়ানের ধমনীতে প্রবাহিত। নিজেদের যেকোনো বড় জাতীয় অর্জনে ভাইকিং ইতিহাসকে টেনে আনা তাদের জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক ও গভীর গর্বের বিষয়। ফ্রয়স্তাদও সেই ইতিহাসকেই সংশ্লিষ্ট করেছেন উদ্যাপনে।
লংশিপের রণকৌশল: একতা ও নিখুঁত সিনক্রোনাইজেশনের প্রতীক
ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের অদৃশ্য বৈঠা বাওয়ার উদ্যাপনের পেছনে রয়েছে ভাইকিংদের জীবনধারণ ও যুদ্ধের এক চমৎকার রণকৌশল। ভাইকিংদের প্রধান শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্বের মূল চাবিকাঠি ছিল তাদের তৈরি বিশেষ ধরনের যুদ্ধজাহাজ, যা ‘লংশিপ’ নামে পরিচিত। এই জাহাজগুলো ছিল অত্যন্ত হালকা, সুগঠিত ও গতিশীল, যা সাগরের উত্তাল তরঙ্গ মাড়িয়ে নদী বা সমুদ্রের একদম অগভীর পানিতেও সহজে চলতে পারত।
এই লংশিপগুলোর মূল চালিকাশক্তি ছিল মানুষের শারীরিক শক্তি ও বৈঠা বাওয়া বা ‘রোয়িং’। একটি বিশাল লংশিপে ৩০ থেকে ৬০ জন ভাইকিং যোদ্ধা একসঙ্গে বসে বৈঠা বাইতেন। জাহাজের মাঝখানে একজন অভিজ্ঞ নেতা ড্রাম বাজিয়ে বা তালি দিয়ে বৈঠা বাওয়ার গতি ও ছন্দ ঠিক রাখতেন।

ভাইকিং রণকৌশলে এই বৈঠা বাওয়া ছিল চরম একতা, নিখুঁত টাইমিং ও পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রতীক। যদি একজন যোদ্ধাও সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য নিজের তাল হারাতেন, তবে পুরো জাহাজের গতি থমকে যেত এবং বিশাল বৈঠাগুলো একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতো।
সমুদ্রের ভয়াবহ ঝড় কিংবা শত্রুসেনাদের মুখোমুখি যুদ্ধযাত্রার সময় নিজেদের মনোবল ধরে রাখতে তারা ড্রামের তালের সঙ্গে মিল রেখে সমস্বরে হুংকার ছাড়ত। ফুটবল মাঠে আরলিং হাল্যান্ডরা ঠিক সেই হাজার বছর আগের লংশিপের একতা ও ছন্দেরই আধুনিক পুনরুত্থান ঘটাচ্ছেন।
‘ভাইকিং স্পিরিটে’ তারকাখ্যাতি বনাম চরম সাম্যবাদ
আধুনিক স্পোর্টস অ্যানালিস্ট ও সমাজবিজ্ঞানীরা এই উদ্যাপনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিকও বিশ্লেষণ করছেন। তারা বলছেন, আধুনিক ফুটবলে যেখানে তারকা খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত অহংকার বা ‘ইগো’ প্রায়ই দলের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে নরওয়ের এই উদযাপন এক অনন্য বার্তা দেয়।
মাঠে যখন হাল্যান্ড বা ওডেগার্ডের মতো শত কোটি টাকার সুপারস্টাররা সাইডবেঞ্চের অতিরিক্ত খেলোয়াড় কিংবা কোচিং স্টাফদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মেঝেতে বসে একই ছন্দে বৈঠা বাইতে থাকেন, সেটি দলের ভেতরের সাম্যবাদের ধারণাকে ছড়িয়ে দেয়। প্রতিপক্ষকেও বার্তা দেওয়া হয়— আমরা মাঠে আলাদা কোনো ব্যক্তি নই, আমরা সবাই একই নৌকার যাত্রী।

এই অনন্য ও সুশৃঙ্খল রণকৌশল প্রতিপক্ষের মনেও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করে। বিবিসি স্পোর্টসের বিশ্লেষক এবং ইংল্যান্ডের সাবেক কিংবদন্তি স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়ারার বিষয়টিকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, আইসল্যান্ডের সেই বিখ্যাত ‘ভাইকিং ক্ল্যাপে’র পর ফুটবল বিশ্বে এত শক্তিশালী ও সংক্রামক কোনো ফ্যান ট্রাডিশন আর দেখা যায়নি। নরওয়ে ফুটবল দুনিয়াকে স্রেফ নাচিয়ে ছাড়ছে।
একই সুর শোনা গেছে আরেক সাবেক ইংলিশ ফুটবলার ও স্কাই স্পোর্টসের জনপ্রিয় ফুটবল ধারাভাষ্যকার জেমি ক্যারাঘেরের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, খেলোয়াড়দের এই উদযাপনটা দেখতে যতটা সুন্দর, প্রতিপক্ষের জন্য মানসিকভাবে ততটাই ভীতিজাগানিয়া। আপনি যখন দেখবেন ১১ জন অ্যাথলেট আপনার সামনে বসে যুদ্ধের নৌকার মতো হুংকার ছাড়ছে, তখন মানসিকভাবে আপনি একধাপ পিছিয়ে যাবেনই।
প্রশংসার সঙ্গে রয়েছে সমালোচনাও
তবে এই নজিরবিহীন উদযাপন যে সর্বজনীনভাবে প্রশংসিত, তা কিন্তু নয়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের রাজনীতি ও ক্রীড়াঙ্গনে এটি বেশ কিছু তপ্ত বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। নরওয়ের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী দেশ সুইডেনের মূলধারার প্রভাবশালী পত্রিকা ড্যাজেনস নাইহেটের এই উদ্যাপনকে কটাক্ষ করে একে ‘ভাইকিং ভাঁড়ামো’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের সম্পাদকীয়তে দাবি করা হয়েছে, সুইডিশ খেলোয়াড়রা মাঠে এমন উগ্র বা নাটকীয় আচরণ করলে তারা লজ্জায় মুখ ঢাকতেন।
নরওয়ের কিছু বামপন্থি সমাজবিজ্ঞানী ও সমালোচকও ‘ভাইকিং রো’কে সমালোচনা করতে ছাড়েননি। তাদের মতে, হাজার বছর আগের জলদস্যু ও যোদ্ধাদের সংস্কৃতিকে এভাবে মূলধারার খেলায় ফিরিয়ে আনা ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’ ও ‘হাইপার-ম্যাসকিউলিনিটি’ বা উগ্র পুরুষতান্ত্রিকতাকেই উসকে দেয়।
তবে এসব সমালোচনাকে হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছেন ফুটবল ভক্তরা। সুইডিশ মিডিয়ার সমালোচনার কড়া জবাব দিয়ে নরওয়ে জাতীয় দলের প্রধান কোচ স্তাল সোলবাকেন ও বলেন, বাইরে কে কী সমালোচনা করল, কোন দেশের মিডিয়া এটাকে ‘ভাঁড়ামো’ বলল তা নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। মাঠে ও ড্রেসিংরুমে আমার ছেলেরা যে একতা দেখিয়েছে, এটাই আসল ভাইকিং স্পিরিট।

ম্যাচের মূল নায়ক আরলিং হাল্যান্ডও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, যখন আমরা সবাই একসঙ্গে মাঠের ঘাসে বসে ওভাবে বৈঠা বাইতে শুরু করি, তখন শরীরে অন্যরকম একটা শক্তি চলে আসে। এটা আমাদের ডিএনএতে আছে। আমরা এখানে শুধু ম্যাচ জিততে আসিনি, আমরা ভাইকিংদের মতোই বিশ্বমঞ্চ জয় করতে এসেছি।
দলের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডও তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে যোগ করেন, এই সেলিব্রেশনটা আমাদের পুরো স্কোয়াডকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে। গ্যালারিতে যখন হাজার হাজার ফ্যান আমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাত নাড়ায়, তখন মনে হয় পুরো স্টেডিয়ামটাই একটা বিশাল ভাইকিং লংশিপ। এই একতাই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার হওয়ার সাহস দিচ্ছে।
নিউজার্সির মহাযুদ্ধের অপেক্ষায় লংশিপ
২৮ বছর পর বিশ্বকাপে এসেই নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করাটাই নরওয়ের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা সাফল্য। তবে সেখানেই তারা থেমে থাকেনি, শেষ বত্রিশের ম্যাচে আফ্রিকার সিংহ আইভরি কোস্টকে ‘নকডআউট’ করে ছেড়েছে।
এই সাফল্যকে হাল্যান্ড-ওডেগার্ডরা আরও লম্বা করতে চাইবেন নিশ্চয়, তবে তাদের সে আকাঙ্ক্ষা পূরণ সহজ হবে না মোটেও। কারণ নকআউটের দ্বিতীয় রাউন্ডে শেষ ষোলোর খেলায় তাদের প্রতিপক্ষ পাঁচ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল!
নিউইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আগামী রোববার (৫ জুলাই) দিবাগত রাতে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যদের মুখোমুখি হবেন স্তাল সোলবাকেনের শিষ্যরা। জাপানের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের গোলে জিতে মানসিকভাবে চনমনে থাকা ব্রাজিলের বিপক্ষে হাল্যান্ড-ওডেগার্ডদের লড়াই যে সহজ হবে না, তা বলাই বাহুল্য।
ব্রাজিলিয়ান সাম্বার সামনে নরওয়ের এই প্রাচীন ভাইকিং লংশিপ কি আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, নাকি নিউজার্সির বুকেই সলিলসমাধি ঘটবে— তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও চার দিন। সে ম্যাচের ফলাফল যাই হোক না কেন, নরওয়েজিয়ানরা তাদের হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য, অদম্য ইচ্ছা, অনন্য টিমওয়ার্ক আর ‘ভাইকিং রো’ দিয়ে এ বিশ্বকাপকে এরই মধ্যে চিরস্মরণীয় করে তুলেছে।

মন্টেরি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে শুরুতে কোডি গাকপোর গোলে লিড নেয় নেদারল্যান্ডস। তবে নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে (৯০ মিনিটে) ইসা দিওপের দুর্দান্ত গোলে সমতায় ফেরে মরক্কো। অতিরিক্ত সময়েও আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।
১ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর টিকিটের এই লড়াইয়ে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ১-১ সমতায় থাকার পর টাইব্রেকারে জিতে বিশ্বকাপের শেষ ১৬ নিশ্চিত করেছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টাইব্রেকারে হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা পেল জার্মানি।
১ দিন আগে
৬ মিনিটের ইনজুরি টাইমের শেষ মিনিটে দারুণ ফিনিশিংয়ে ব্রাজিলকে জয়সূচক গোল এনে দিলেন গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি। জাপানের রক্ষণদুর্গ ভেঙে ২-১ গোলের জয় নিয়ে হেক্সা মিশনে ব্রাজিল উঠল শেষ ষোলোতে।
২ দিন আগে
নকআউট মিশনেও নেইমারকে ছাড়াই মাঠে নেমছে ব্রাজিল। কার্লোস আনিচেলত্তির দল বলের দখল আর আক্রমণের ধারা অব্যাহত রেখেছিল। কিন্তু প্রথমার্ধেই গোল করে এগিয়ে গেছে এশিয়ার পরাশক্তি জাপান।
২ দিন আগে