লাল কার্ড ইস্যুতে ফিফা সভাপতিকে নিজেই ফোন করেছিলেন— স্বীকার করলেন ট্রাম্প

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
২০১৮ সালের এক অনুষ্ঠানে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো (বাঁয়ে) ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ম্যাচে লাল কার্ড খেয়েও পরের ম্যাচে খেলার সুযোগ পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগান। আর এর পেছনে ছিল খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ। এবার সে হস্তক্ষেপের কথা খোলাখুলিই স্বীকার করলেন তিনি।

ট্রাম্প বললেন, তার কাছে বালোগানের লাল কার্ড খাওয়ার ঘটনাকে ফাউলই মনে হয়নি। তাই সে সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন ফিফা সভাপতিকে। তবে কোনোভাবেই এ বিষয়ে চাপ তৈরি করেননি বলেও দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

বালোগানের লাল কার্ড খাওয়ার পরও নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়েছে আগেই। ট্রাম্পের খোলাখুলি স্বীকারোক্তি সে বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে ফিফা ‘সীমা অতিক্রম করেছে’ বলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, জার্মান ফুটবল ফেডারেশনসহ ইউরোপের একাধিক সংস্থা এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে।

গত বুধবার শেষ বত্রিশের ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে ৬৪তম মিনিটে লাল কার্ড দেখেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান। সরাসরি লাল কার্ড পাওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরের ম্যাচে নিষিদ্ধ হন তিনি। ফিফার শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই বলেই আগে জানানো হয়েছিল।

কিন্তু রোববার ফিফা হঠাৎ করেই বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খেলার সুযোগ পান যুক্তরাষ্ট্রের এই তারকা ফরোয়ার্ড।

এই সিদ্ধান্তের পরই প্রশ্ন ওঠে, এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল কি না। পরে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য ট্রাম্প বুধবার থেকেই অন্তত তিনবার ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।

সোমবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প প্রথমবারের মতো সেই যোগাযোগের কথা স্বীকার করেন। এবং স্বভাবসুলভভাবে এমন কিছু কথা বললেন, যেন এ ঘটনাটি অত্যন্ত স্বাভাবিক।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি শুধু বলেছিলাম, বিষয়টি আরেকবার পর্যালোচনা করা হোক। কারণ আমার মনে হয়নি এটা কোনো ফাউল ছিল। আমি তাকে কী করতে হবে, সেটা বলিনি। বলার ক্ষমতাও আমার নেই।’

ট্রাম্পের দাবি, বালোগানের চ্যালেঞ্জ কখনোই লাল কার্ড পাওয়ার মতো ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে এমন সিদ্ধান্ত দেখিনি। আমি খেলাধুলা ভালোবাসি, নিজেও ভালো অ্যাথলেট ছিলাম। খেলাটা আমি খুব ভালো বুঝি। এটা কোনো ফাউলই ছিল না, এমনকি সাধারণ ইনফ্র্যাকশনও নয়।’

‘দুজন খেলোয়াড় পুরো গতিতে দৌড়ে এসে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এত গতিতে দৌড়ানোর সময় কারও পায়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পা রাখা সম্ভব নয়। যদি সে প্রতিপক্ষকে ঘুষি মারত বা সত্যিই কোনো গুরুতর অপরাধ করত, তাহলে আমার অবস্থান ভিন্ন হতো,’— বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

লাল কার্ডের কারণে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ হওয়ার নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প৷ ‘একটি ম্যাচে শাস্তি দেওয়া এক বিষয়। কিন্তু যে ম্যাচটি এখনো শুরুই হয়নি, তার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া কীভাবে ন্যায্য হতে পারে? এটা খুবই অন্যায্য।’

বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড়দের মাঠে থাকা উচিত মন্তব্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমাদের সেরা খেলোয়াড়রা খেলবে, তাদেরও সেরা খেলোয়াড়রা খেলবে। তারপর আমরা জিতি বা হারি, সেটাই হবে প্রকৃত অর্থে ন্যায্য প্রতিযোগিতা।’

তবে ট্রাম্প ইনফান্তিনোকে সরাসরি দায়ী করতে চাননি। তার দাবি, সিদ্ধান্তটি ফিফার কোনো কমিটি নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, ইনফান্তিনো নিজে এই সিদ্ধান্ত নেননি। একটি কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তারা সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। কারণ প্রথমত, এটা কোনো ফাউলই ছিল না।’

ট্রাম্পের বক্তব্যের কিছুক্ষণ পরই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেন যে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ফোন পেয়েছিলেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফিফার বিচারিক সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে।

ইনফান্তিনোর ভাষ্য, ‘আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জানিয়েছি, বিষয়টি ফিফার স্বাধীন বিচারিক সংস্থার বিবেচনায় রয়েছে। তারা ফিফার শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী এবং মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। আমি কখনো কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হই, কখনো হই না; কিন্তু সব সময়ই তাদের স্বাধীনতাকে সম্মান করি।’

তবে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আইনি ভিত্তি কী, সে বিষয়ে ট্রাম্প বা ফিফা— কেউই স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি।

ফিফা শুধু জানায়, শৃঙ্খলাবিধির ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারিক কমিটি কোনো শাস্তি আংশিক বা পুরোপুরি স্থগিত রাখতে পারে। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেই বালোগানের নিষেধাজ্ঞা ১২ মাসের পরীক্ষামূলক সময়ের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। বিশ্বকাপ চলাকালে এমন নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত আগে দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ইস্যুতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ প্রকাশ্যেই বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সব আমেরিকানের পক্ষ থেকে ওই হাস্যকর লাল কার্ড থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।’ ট্রাম্প জবাবে শুধু বলেন, ‘বিষয়টি বেশ মজার ছিল।’

মার্কিনিরা বিষয়টিকে সহজভাবে নিলেও নজিরবিহীন এ ঘটনা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে সব জায়গা থেকে। বিশেষ করে ইউরোপের ফুটবল-সংশ্লিষ্টরা এক হাত নিয়েছেন ফিফাকে।

এ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে উয়েফার পক্ষ থেকে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ফুটবল ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কিন্তু ফিফা নিজস্ব নিয়মই উপেক্ষা করেছে। তাদের ভাষায়, ‘যখন নিয়মের রক্ষকরাই নিয়মের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হন, তখন ফুটবলের সততা ও প্রতিযোগিতার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।’

বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও সিদ্ধান্তটিকে ‘বিস্ময়কর’ বলে অভিহিত করেছে। জাতীয় দলের কোচ রুডি গার্সিয়া এটিকে ‘এপ্রিল ফুলের কৌতুকে’র সঙ্গে তুলনা করেন। ফিফার আপিল কমিটি তাদের আপিলও খারিজ করে দেয়।

জার্মান ফুটবল ফেডারেশনও প্রশ্ন তুলেছে, সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফল কি না। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নরওয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটির সভাপতি লিসা ক্লাভেনেস বলেন, ‘এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়াম ম্যাচের বিষয় নয়, এটি পুরো ফুটবলের সততা এবং ফেয়ার প্লের মৌলিক নীতির প্রশ্ন।’

ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্ল্যাটারও সামাজিক মাধ্যমে কড়া সমালোচনা করে লেখেন, ‘লাল কার্ড রাজনৈতিক ফোন কলে বাতিল হয় না। এটি বাতিল হয় নিয়ম, প্রমাণ ও স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ফোনের পরই একজন খেলোয়াড় বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচের আগে হঠাৎ নিষেধাজ্ঞামুক্ত হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক— ফিফা, তুমি কোথায় যাচ্ছ?’

শেষ ষোলোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে বালোগানকে ফিরে পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় স্বস্তির খবরই ছিল। তবে ম্যাচে নেমে তেমন কিছুই করতে পারেননি তিনি। ৯০ মিনিট খেলে বল স্পর্শ করেছেন মাত্র ১৯ বার।

ad
ad

খেলা থেকে আরও পড়ুন

বাংলাদেশের ব্রাজিল সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠিতে রাষ্ট্রদূত— হলুদ জার্সি আবার জ্বলে উঠবে

এ ম্যাচে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ব্রাজিল সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন একটি খোলা চিঠি লিখেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো এফ ডি ফেরেস। চিঠিতে তিনি বাংলাদেশের সমর্থকদের অকুণ্ঠ সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, কঠিন এই সময় কেটে যাবে, ব্রাজিল আবার ঘুরে দাঁড়াবে, আর হলুদ

১৩ ঘণ্টা আগে

জিম্বাবুয়েকে ১৪১ রানে আটকে দিয়েও ২৫ রানে হারল বাংলাদেশ

ওয়ানডে ম্যাচে ১৪১ রান চেজ করতে নেমে নিদারুণ ব্যর্থতার পরিচয় দিলেন ব্যাটাররা। দুই অঙ্কের রান পেলেন মাত্র তিনজন— তৌহিদ হৃদয় (৫৮ বলে ২৫), নুরুল হাসান সোহান (৪৪ ব ৩১) আর মেহেদি হাসান মিরাজ (১৮ বলে ১০)। তাতে শেষ পর্যন্ত ৩৩ ওভার ১ বলে মাত্র ১১৬ রানে অলআউট হলো বাংলাদেশ। হেরে গেল ২৫ রানে।

১৪ ঘণ্টা আগে

বালেগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার— ফিফার সিদ্ধান্তে চটেছে ইউয়েফা

বার্তা সংস্থা এএফপি জানাচ্ছে, সোমবার এক বিবৃতিতে ইউয়েফা জানায়, ফুটবল কিছু মৌলিক নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে সেই নিয়মের প্রতি সবার আস্থা থাকা জরুরি।

১৮ ঘণ্টা আগে

নাহিদের দেশসেরা বোলিং ফিগারে জিম্বাবুয়ে ১৪১ রানে অলআউট

নাহিদ রানার আগুনঝরা বোলিংয়ে ওয়ানডে সিরিজে দুর্দান্ত সূচনা করেছে বাংলাদেশ। হারারে স্পোর্টস ক্লাবে তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে স্বাগতিক জিম্বাবুয়েকে মাত্র ১৪১ রানে অলআউট করে দিয়েছে টাইগাররা। ১০ ওভারে মাত্র ২১ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে সেরা বোলিংয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছেন এই গত

১৯ ঘণ্টা আগে