
পবিত্র কুণ্ডু

আজ রাতে নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন আর্জেন্টিনা ও স্পেন ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে, তখন মাঠের ২২ জন খেলোয়াড়ের লড়াইয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে দুটি ভিন্ন গোলার্ধের ফুটবলীয় দর্শনের সংঘাত। হাইভোল্টেজ এই ম্যাচ শুরুর আগে কোনো নির্দিষ্ট স্টাইল বা ঘরানাকে বিজয়ী ঘোষণা করাটা কেবলই অনুমান মাত্র।
কারণ আধুনিক বিশ্বফুটবল এখন এক চরম ট্যাকটিক্যাল বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে মূল লড়াইটা জেতা বনাম হারার নয়, সব দলই মাঠে নামে জয়ের তীব্র ক্ষুধা নিয়ে। আসল লড়াইটা হলো ‘জেতার পথের দর্শন’ বা রণকৌশলের ভিন্নতার। দলগুলো কীভাবে নিজেদের চেনা ঐতিহ্যকে ধরে রেখেও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে জয়ের সমীকরণ মেলাচ্ছে, মেটলাইফের ফাইনাল মূলত তারই এক চূড়ান্ত প্রদর্শনী।
আর্জেন্টিনার ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের ফুটবলীয় আত্মপরিচয় ও জাতীয় অহংকারের মূল ভিত্তি ছিল ‘লা নুয়েস্ত্রা’।
স্প্যানিশ এই শব্দবন্ধের অর্থ ‘আমাদের নিজস্ব জিনিস’। এটি শুধু কোনো মাঠের ছক ছিল না, এটি ছিল আর্জেন্টাইনদের কাছে ফুটবলের চিরন্তন রোমান্টিকতা। ‘লা নুয়েস্ত্রা’র মূল বিশ্বাসই ছিল— মাঠে যদি আমরা নিখুঁত ও চোখধাঁধানো ড্রিবলিং করি, বলের দখল নিজেদের পায়ে রেখে শৈল্পিক ছন্দ বজায় রাখি, তবে প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, জয় স্বাভাবিক নিয়মেই ধরা দেবে। অর্থাৎ খেলার প্রক্রিয়া সুন্দর হলে ফল আসতে বাধ্য।
তবে লিওনেল মেসির বর্তমান আর্জেন্টিনা দল সেই চিরায়ত রোমান্টিকতার মোহ কাটিয়ে অনেক বেশি বাস্তবমুখী ও ফলকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে।
কোচ লিওনেল স্কালোনির ‘লা স্কালোনিতা’ এখন আর কেবল সুন্দরের পেছনে ছোটে না। তারা জানে, আধুনিক ফুটবলে প্রতিপক্ষকে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেওয়া মানেই বিপদ। তাই স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা এখন নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল কার্যকারিতার ওপর জোর দেয়। প্রয়োজন হলে তারা চরম শারীরী ফুটবল খেলে, ফাউল করে হলেও প্রতিপক্ষের আক্রমণকে মাঝমাঠেই নস্যাৎ করে এবং পাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে ম্যাচ বের করে আনে।
২০২১ কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও কাতার বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি— গত পাঁচ বছরের সব সাফল্যই এসেছে এই বাস্তববাদী মানসিকতার হাত ধরে। চলতি বিশ্বকাপেও কেপ ভার্দে, মিসর ও সুইজারল্যান্ডের মতো দলগুলোর শক্ত প্রতিরোধ আর্জেন্টিনা ভাঙতে পেরেছে কেবল এই ইস্পাতকঠিন ম্যাচ ম্যানেজমেন্টের জোরে।
অন্য প্রান্তে স্পেনের ফুটবলও এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আজ ফাইনালের মঞ্চে। ২০১০ সালে স্পেন যেভাবে পাসের পর পাস খেলে প্রতিপক্ষকে সম্মোহিত করে ‘তিকিতাকা’ স্টাইলে বিশ্বজয় করেছিল, সেই ধারার কার্যকারিতা ফুটবলীয় বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় একসময় থমকে দাঁড়ায়।
প্রতিপক্ষ দলগুলো বক্সের সামনে রক্ষণভাগের নিরেট দেয়াল তুলে (লো-ব্লক বা বাস পার্কিং) স্পেনের এই পাসিং ফুটবলকে অকার্যকর করে দিতে শুরু করে। ফলে দেখা যেত, স্পেন ম্যাচে হাজারটা পাস খেলছে, বলের দখল রাখছে ৮০ শতাংশ, কিন্তু গোল করতে পারছে না।
বর্তমান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তিকিতাকাকে পুরোপুরি বর্জন করেননি, বরং এর আধুনিকায়ন করেছেন। তার নতুন কৌশল ‘ফুয়েন্তেবাদ’ মূলত তিকিতাকার মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণকে ধরে রেখে খেলাকে অনেক বেশি গোলমুখী ও গতিশীল করা।
ফুয়েন্তেবাদের মূল রেসিপি হলো— রক্ষণভাগকে দুর্ভেদ্য প্রাচীর বানানো, মাঝমাঠের দখল নিজেদের পায়ে রাখা, কিন্তু ফাঁকা জায়গা পেলেই পাসের গতি বাড়িয়ে সরাসরি বক্সে হানা দেওয়া। আর এই সরাসরি আক্রমণের জন্য তিনি দুই প্রান্তের এক প্রান্তে ব্যবহার করছেন লামিনে ইয়ামালকে, আরেক প্রান্তে নিকো উইলিয়ামস কিংবা অ্যালেক্স বায়েনার মতো ক্ষিপ্রগতির তরুণ উইঙ্গারদের। সেমিফাইনালেও জমাট মাঝমাঠের পাশাপাশি উইংগারদের ব্যবহার করে তৈরি করা এই আধুনিক ও ক্ষুরধার কৌশলের গতির কাছেই পরাস্ত হয়ে বিদায় নিতে হয়েছে শক্তিশালী ফ্রান্সকে।
বিশ্ব ফুটবলের যান্ত্রিক ও ইউরোপীয়করণ স্পষ্ট হলেও ফুটবলারদের ভেতরের আদি সংস্কৃতির ডিএনএ পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। ঠিক যেমন উত্তমাশা অন্তরীপে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের জলরাশি একসঙ্গে মিশে গেলেও স্রোতের রঙে নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব জানান দেয়, ফুটবলেও তেমনি। আর এই বৈচিত্র্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ আজকের ফাইনালের দুই দল, যাদের ফুটবলীয় সম্পর্কের নাড়ি পোঁতা আছে শতাব্দীর প্রাচীন ইতিহাসে।
১৬শ শতকের ঐতিহাসিক ঔপনিবেশিক শাসনের বন্ধনের কারণে আর্জেন্টিনায় স্প্যানিশ ভাষা এলেও কালক্রমে তারা নিজেদের মতো করে এর একটা আলাদা কথ্য রূপ তৈরি করেছে, যাকে বলা হয় ‘রিওপ্লাতেন্সে স্প্যানিশ’। মাঠের তীব্র স্নায়ুযুদ্ধে এই অভিন্ন ভাষা দুই দলের খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে, রেফারিকে প্রভাবিত করায় কিংবা নিজেদের মধ্যে তাৎক্ষণিক রণকৌশল সাজানোর ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত সমতা তৈরি করবে।
শুধু ভাষাই নয়, দুই দেশের ফুটবলীয় ট্যাকটিক্যাল আদান-প্রদানও দীর্ঘদিনের।
গত শতকের পঞ্চাশের দশকে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি আলফ্রেডো ডি স্টেফানো স্পেনে পাড়ি জমিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাস বদলে ল্যাটিন সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে ইউরোপীয় ঘরানার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। আবার ১৯৭৮ বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনার কোচ সিজার লুইস মেনত্তি আশির দশকে বার্সেলোনার কোচের দায়িত্ব নিয়ে স্পেনে পজিশনাল প্লের যে বীজ বুনেছিলেন, তা থেকেই পরে স্পেনের তিকিতাকার জন্ম।
অন্যদিকে দিয়েগো সিমিওনের মতো আর্জেন্টাইন কোচরা স্পেনে গিয়ে শিখিয়েছেন নিরেট রক্ষণাত্মক ফুটবল। আর লিওনেল মেসি? তিনি তো আর্জেন্টিনার সহজাত ‘লা নুয়েস্ত্রা’ ঘরানার রক্ত আর স্পেনের ‘লা মাসিয়া’ একাডেমির নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলার এক জীবন্ত সংকর।
আজকের এই মেগা ফাইনালের ভাগ্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে মাঝমাঠের দখলদারিত্বের ওপর, যেখানে মুখোমুখি বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই মিডফিল্ড ইঞ্জিন।
স্পেনের মাঝমাঠের মূল শক্তি তাদের বহুমুখিতা। ডিফেন্সের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ানো ম্যানচেস্টার সিটির চালিকাশক্তি রদ্রি এই মুহূর্তে বিশ্বফুটবলের সেরা হোল্ডিং মিডফিল্ডার। তার সাথে পিএসজির বক্স-টু-বক্স ডায়নামো ফাবিয়ান রুইজ এবং হাফ-স্পেস ব্যবহারে ওস্তাদ বার্সেলোনা বয় দানি ওলমো মিলে স্পেনের উইংভিত্তিক তীব্র গতিশীল ফুটবলকে সচল রাখছেন। তারা চাইলে তিকিতাকার মতো পজেশন ধরে রাখতে পারেন, আবার এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সরাসরি কাউন্টার-অ্যাটাকে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করতে পারেন।
বিপরীতে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড গড়ে উঠেছে নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ফ্লেক্সিবিলিটি ও আগ্রাসী হাই-প্রেসিংয়ের ওপর ভিত্তি করে।
মাঝমাঠের ‘মোটর’ রদ্রিগো ডি পল পুরো মাঠ জুড়ে দৌড়ে ও ট্যাকল করে প্রতিপক্ষকে বোতলবন্দি রাখেন এবং মেসিকে খেলার স্বাধীনতা দেন। লিভারপুলের আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার ঠান্ডা মাথায় বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। আর চেলসির এনজো ফের্নান্দেস কাজ করেন ডিফেন্স ও অ্যাটাকের সেতু হিসেবে। এই তিনজনের কেউই নির্দিষ্ট এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন না। ফলে কোনো ফিজিক্যাল দল সহজে তাদের ফাটল ধরাতে পারে না।
আজকের ম্যাচটি তাই আসলে স্পেনের গতিময় পজিশনাল ফুটবলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক হাই-প্রেসিংয়ের এক চূড়ান্ত দাবা খেলা। রদ্রি যদি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যান, তবে স্পেনের উইঙ্গাররা আর্জেন্টিনাকে কোণঠাসা করবে। অন্যদিকে ডি পল ও এনজো যদি রদ্রিকে প্রেস করে বল কেড়ে নিতে পারেন, তবে মেসির পা হয়ে হুলিয়ান আলভারেজ বা লাউতারো মার্টিনেজরা স্পেনের হাই-লাইন ডিফেন্স ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় আজ কাপ যার হাতেই উঠুক না কেন, দিন শেষে ফুটবলবিশ্ব যে দুই ঘরানার সেরা ট্যাকটিক্যাল বিবর্তনের এক মহাকাব্যিক লড়াই দেখতে চলেছে, তা নিশ্চিত।

আজ রাতে নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন আর্জেন্টিনা ও স্পেন ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে, তখন মাঠের ২২ জন খেলোয়াড়ের লড়াইয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে দুটি ভিন্ন গোলার্ধের ফুটবলীয় দর্শনের সংঘাত। হাইভোল্টেজ এই ম্যাচ শুরুর আগে কোনো নির্দিষ্ট স্টাইল বা ঘরানাকে বিজয়ী ঘোষণা করাটা কেবলই অনুমান মাত্র।
কারণ আধুনিক বিশ্বফুটবল এখন এক চরম ট্যাকটিক্যাল বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে মূল লড়াইটা জেতা বনাম হারার নয়, সব দলই মাঠে নামে জয়ের তীব্র ক্ষুধা নিয়ে। আসল লড়াইটা হলো ‘জেতার পথের দর্শন’ বা রণকৌশলের ভিন্নতার। দলগুলো কীভাবে নিজেদের চেনা ঐতিহ্যকে ধরে রেখেও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে জয়ের সমীকরণ মেলাচ্ছে, মেটলাইফের ফাইনাল মূলত তারই এক চূড়ান্ত প্রদর্শনী।
আর্জেন্টিনার ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের ফুটবলীয় আত্মপরিচয় ও জাতীয় অহংকারের মূল ভিত্তি ছিল ‘লা নুয়েস্ত্রা’।
স্প্যানিশ এই শব্দবন্ধের অর্থ ‘আমাদের নিজস্ব জিনিস’। এটি শুধু কোনো মাঠের ছক ছিল না, এটি ছিল আর্জেন্টাইনদের কাছে ফুটবলের চিরন্তন রোমান্টিকতা। ‘লা নুয়েস্ত্রা’র মূল বিশ্বাসই ছিল— মাঠে যদি আমরা নিখুঁত ও চোখধাঁধানো ড্রিবলিং করি, বলের দখল নিজেদের পায়ে রেখে শৈল্পিক ছন্দ বজায় রাখি, তবে প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, জয় স্বাভাবিক নিয়মেই ধরা দেবে। অর্থাৎ খেলার প্রক্রিয়া সুন্দর হলে ফল আসতে বাধ্য।
তবে লিওনেল মেসির বর্তমান আর্জেন্টিনা দল সেই চিরায়ত রোমান্টিকতার মোহ কাটিয়ে অনেক বেশি বাস্তবমুখী ও ফলকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে।
কোচ লিওনেল স্কালোনির ‘লা স্কালোনিতা’ এখন আর কেবল সুন্দরের পেছনে ছোটে না। তারা জানে, আধুনিক ফুটবলে প্রতিপক্ষকে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেওয়া মানেই বিপদ। তাই স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা এখন নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল কার্যকারিতার ওপর জোর দেয়। প্রয়োজন হলে তারা চরম শারীরী ফুটবল খেলে, ফাউল করে হলেও প্রতিপক্ষের আক্রমণকে মাঝমাঠেই নস্যাৎ করে এবং পাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে ম্যাচ বের করে আনে।
২০২১ কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও কাতার বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি— গত পাঁচ বছরের সব সাফল্যই এসেছে এই বাস্তববাদী মানসিকতার হাত ধরে। চলতি বিশ্বকাপেও কেপ ভার্দে, মিসর ও সুইজারল্যান্ডের মতো দলগুলোর শক্ত প্রতিরোধ আর্জেন্টিনা ভাঙতে পেরেছে কেবল এই ইস্পাতকঠিন ম্যাচ ম্যানেজমেন্টের জোরে।
অন্য প্রান্তে স্পেনের ফুটবলও এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আজ ফাইনালের মঞ্চে। ২০১০ সালে স্পেন যেভাবে পাসের পর পাস খেলে প্রতিপক্ষকে সম্মোহিত করে ‘তিকিতাকা’ স্টাইলে বিশ্বজয় করেছিল, সেই ধারার কার্যকারিতা ফুটবলীয় বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় একসময় থমকে দাঁড়ায়।
প্রতিপক্ষ দলগুলো বক্সের সামনে রক্ষণভাগের নিরেট দেয়াল তুলে (লো-ব্লক বা বাস পার্কিং) স্পেনের এই পাসিং ফুটবলকে অকার্যকর করে দিতে শুরু করে। ফলে দেখা যেত, স্পেন ম্যাচে হাজারটা পাস খেলছে, বলের দখল রাখছে ৮০ শতাংশ, কিন্তু গোল করতে পারছে না।
বর্তমান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তিকিতাকাকে পুরোপুরি বর্জন করেননি, বরং এর আধুনিকায়ন করেছেন। তার নতুন কৌশল ‘ফুয়েন্তেবাদ’ মূলত তিকিতাকার মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণকে ধরে রেখে খেলাকে অনেক বেশি গোলমুখী ও গতিশীল করা।
ফুয়েন্তেবাদের মূল রেসিপি হলো— রক্ষণভাগকে দুর্ভেদ্য প্রাচীর বানানো, মাঝমাঠের দখল নিজেদের পায়ে রাখা, কিন্তু ফাঁকা জায়গা পেলেই পাসের গতি বাড়িয়ে সরাসরি বক্সে হানা দেওয়া। আর এই সরাসরি আক্রমণের জন্য তিনি দুই প্রান্তের এক প্রান্তে ব্যবহার করছেন লামিনে ইয়ামালকে, আরেক প্রান্তে নিকো উইলিয়ামস কিংবা অ্যালেক্স বায়েনার মতো ক্ষিপ্রগতির তরুণ উইঙ্গারদের। সেমিফাইনালেও জমাট মাঝমাঠের পাশাপাশি উইংগারদের ব্যবহার করে তৈরি করা এই আধুনিক ও ক্ষুরধার কৌশলের গতির কাছেই পরাস্ত হয়ে বিদায় নিতে হয়েছে শক্তিশালী ফ্রান্সকে।
বিশ্ব ফুটবলের যান্ত্রিক ও ইউরোপীয়করণ স্পষ্ট হলেও ফুটবলারদের ভেতরের আদি সংস্কৃতির ডিএনএ পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। ঠিক যেমন উত্তমাশা অন্তরীপে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের জলরাশি একসঙ্গে মিশে গেলেও স্রোতের রঙে নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব জানান দেয়, ফুটবলেও তেমনি। আর এই বৈচিত্র্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ আজকের ফাইনালের দুই দল, যাদের ফুটবলীয় সম্পর্কের নাড়ি পোঁতা আছে শতাব্দীর প্রাচীন ইতিহাসে।
১৬শ শতকের ঐতিহাসিক ঔপনিবেশিক শাসনের বন্ধনের কারণে আর্জেন্টিনায় স্প্যানিশ ভাষা এলেও কালক্রমে তারা নিজেদের মতো করে এর একটা আলাদা কথ্য রূপ তৈরি করেছে, যাকে বলা হয় ‘রিওপ্লাতেন্সে স্প্যানিশ’। মাঠের তীব্র স্নায়ুযুদ্ধে এই অভিন্ন ভাষা দুই দলের খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে, রেফারিকে প্রভাবিত করায় কিংবা নিজেদের মধ্যে তাৎক্ষণিক রণকৌশল সাজানোর ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত সমতা তৈরি করবে।
শুধু ভাষাই নয়, দুই দেশের ফুটবলীয় ট্যাকটিক্যাল আদান-প্রদানও দীর্ঘদিনের।
গত শতকের পঞ্চাশের দশকে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি আলফ্রেডো ডি স্টেফানো স্পেনে পাড়ি জমিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাস বদলে ল্যাটিন সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে ইউরোপীয় ঘরানার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। আবার ১৯৭৮ বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনার কোচ সিজার লুইস মেনত্তি আশির দশকে বার্সেলোনার কোচের দায়িত্ব নিয়ে স্পেনে পজিশনাল প্লের যে বীজ বুনেছিলেন, তা থেকেই পরে স্পেনের তিকিতাকার জন্ম।
অন্যদিকে দিয়েগো সিমিওনের মতো আর্জেন্টাইন কোচরা স্পেনে গিয়ে শিখিয়েছেন নিরেট রক্ষণাত্মক ফুটবল। আর লিওনেল মেসি? তিনি তো আর্জেন্টিনার সহজাত ‘লা নুয়েস্ত্রা’ ঘরানার রক্ত আর স্পেনের ‘লা মাসিয়া’ একাডেমির নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলার এক জীবন্ত সংকর।
আজকের এই মেগা ফাইনালের ভাগ্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে মাঝমাঠের দখলদারিত্বের ওপর, যেখানে মুখোমুখি বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই মিডফিল্ড ইঞ্জিন।
স্পেনের মাঝমাঠের মূল শক্তি তাদের বহুমুখিতা। ডিফেন্সের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ানো ম্যানচেস্টার সিটির চালিকাশক্তি রদ্রি এই মুহূর্তে বিশ্বফুটবলের সেরা হোল্ডিং মিডফিল্ডার। তার সাথে পিএসজির বক্স-টু-বক্স ডায়নামো ফাবিয়ান রুইজ এবং হাফ-স্পেস ব্যবহারে ওস্তাদ বার্সেলোনা বয় দানি ওলমো মিলে স্পেনের উইংভিত্তিক তীব্র গতিশীল ফুটবলকে সচল রাখছেন। তারা চাইলে তিকিতাকার মতো পজেশন ধরে রাখতে পারেন, আবার এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সরাসরি কাউন্টার-অ্যাটাকে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করতে পারেন।
বিপরীতে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড গড়ে উঠেছে নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ফ্লেক্সিবিলিটি ও আগ্রাসী হাই-প্রেসিংয়ের ওপর ভিত্তি করে।
মাঝমাঠের ‘মোটর’ রদ্রিগো ডি পল পুরো মাঠ জুড়ে দৌড়ে ও ট্যাকল করে প্রতিপক্ষকে বোতলবন্দি রাখেন এবং মেসিকে খেলার স্বাধীনতা দেন। লিভারপুলের আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার ঠান্ডা মাথায় বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। আর চেলসির এনজো ফের্নান্দেস কাজ করেন ডিফেন্স ও অ্যাটাকের সেতু হিসেবে। এই তিনজনের কেউই নির্দিষ্ট এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন না। ফলে কোনো ফিজিক্যাল দল সহজে তাদের ফাটল ধরাতে পারে না।
আজকের ম্যাচটি তাই আসলে স্পেনের গতিময় পজিশনাল ফুটবলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক হাই-প্রেসিংয়ের এক চূড়ান্ত দাবা খেলা। রদ্রি যদি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যান, তবে স্পেনের উইঙ্গাররা আর্জেন্টিনাকে কোণঠাসা করবে। অন্যদিকে ডি পল ও এনজো যদি রদ্রিকে প্রেস করে বল কেড়ে নিতে পারেন, তবে মেসির পা হয়ে হুলিয়ান আলভারেজ বা লাউতারো মার্টিনেজরা স্পেনের হাই-লাইন ডিফেন্স ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় আজ কাপ যার হাতেই উঠুক না কেন, দিন শেষে ফুটবলবিশ্ব যে দুই ঘরানার সেরা ট্যাকটিক্যাল বিবর্তনের এক মহাকাব্যিক লড়াই দেখতে চলেছে, তা নিশ্চিত।

স্বীকার করে নিলেন, যোগ্য দল হিসেবে ভালো খেলেই বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন। আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ নিয়েও স্কালোনি জানালেন অনিশ্চয়তার কথা। বললেন, আবার এমন একটি দল আবার গঠন করা কঠিন কাজ। নিজের মেয়াদ পূর্ণ করার কথা জানালেও দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বলেই জানালেন তিনি।
৭ ঘণ্টা আগে
টুর্নামেন্টে রেকর্ড ১০টি গোল করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বুট নিজের করে নিলেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। অন্যদিকে, লিওনেল মেসিকে এবারও সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে ৮ গোল নিয়ে সিলভার বুটেই।
৭ ঘণ্টা আগে
এর আগে ২০০৮ সালে ইউরো জয়ের দুই বছর পর ২০১০ সালেও তারা বিশ্বকাপ জিতে একই কীর্তি গড়েছিল।
১০ ঘণ্টা আগে
বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল পেয়েছেন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি। সেই সঙ্গে স্পেনে গেছে সেরা গোলরক্ষক আর সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়েরর আরও দুই ব্যক্তিগত পুরস্কার। সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে।
১৫ ঘণ্টা আগে