লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, ইরানে সহিংস বিক্ষোভে নিহত ৬

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে তেহরানে বিক্ষোভে নেমেছেন দেশটির দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা। ছবি: এএফপি

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় কোণঠাসা হয়ে থাকা ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে টানা কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ করছেন দেশটির নাগরিকরা। এ বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়ে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

চরম অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে চলমান এ বিক্ষোভ এরই মধ্যে গত তিন বছরের মধ্যে দেশটিতে হওয়া সবচেয়ে বড় বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে ইরানে চলমান সহিংসতায় ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা অন্তত সাতজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ জানায়, বৃহস্পতিবার লোরেস্তান প্রদেশের একটি শহরে পুলিশ সদর দপ্তরে হামলার সময় অন্তত তিনজন নিহত হন, আহত হন আরও ১৭ জন। বিক্ষোভকারীরা সেখানে কয়েকটি পুলিশ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেন।

শহরটি রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রাস্তায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। গুলির শব্দের মধ্যেই বিক্ষোভকারীরা ‘লজ্জা! লজ্জা!’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন।

এ ছাড়া লোর্দেগান, কুহদাশত ও ইসফাহান প্রদেশেও বিক্ষোভকারীদের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘হেনগাও’ দাবি করেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বিক্ষোভকারীরা প্রাণ হারিয়েছেন।

ফারসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কিছু বিক্ষোভকারী প্রাদেশিক গভর্নরের কার্যালয়, মসজিদ, শহিদ ফাউন্ডেশন, টাউন হল ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি ভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রাস্তায় জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের পেছনে গুলির শব্দ শোনা গেছে।

এদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, কুহদাশতে বিক্ষোভকারীদের হামলায় তাদের আধা সামরিক বাহিনীর এক সদস্য নিহত হয়েছেন।

লোরেস্তান প্রদেশের উপগভর্নর সাঈদ পুরালি বলেন, ‘জনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের সময় কুহদাশতের ২১ বছর বয়সী এক বাসিজ সদস্য দাঙ্গাকারীদের হামলায় নিহত হয়েছেন।’ বাসিজ বাহিনী আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত একটি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী।

ইরানের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত বুধবার দেশ জুড়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল ইরান সরকার। তা সত্ত্বেও মারভদাশত, কেরমানশাহ, হামেদানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও ধরপাকড় অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া গেছে।

এর আগে সদ্য বিদায়ী বছরে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান অবমূল্যায়নে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান মর্নিংস্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্কিন ডলার দাম এখন ৪১ হাজার ১২৫ ইরানিয়ান রিয়াল। দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ।

মুদ্রার মান কমে যাওয়া ও নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে গত রোববার থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখে আন্দোলন শুরু করেন। তেহরানে প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়। মঙ্গলবার অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ আন্দোলনে যোগ দিলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ আন্দোলন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভুগছে। তার ওপর গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় দেশটির পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

এ অবস্থায় বিক্ষোভ দমনে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান সরকার। সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বলেছেন, সরকার ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসতে রাজি।

তবে একই সঙ্গে কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বুধবার ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল সতর্ক করে বলেন, অর্থনৈতিক বিক্ষোভকে অস্থিরতা তৈরি, সরকারি সম্পদ ধ্বংস বা বিদেশি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের হাতিয়ার বানানোর যেকোনো চেষ্টা আইনি ও কঠোর জবাবের মুখে পড়বে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করে বিক্ষোভকারীদের ‘যৌক্তিক দাবি’ স্বীকার করেন এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা অবৈধ: জাতিসংঘ দূত

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলাকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়েছেন ইরানে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত মাই সাটো। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, দেশটিতে আগে থেকেই মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল নাজুক। এ হামলার পর সে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটছে এবং মানবিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।

১১ ঘণ্টা আগে

ইরানের নিরাপত্তা প্রধান ও বাসিজ ফোর্স প্রধান নিহত, দাবি ইসরায়েলের

ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) আওতাধীন আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ ফোর্সের’ কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইসরায়েল।

১২ ঘণ্টা আগে

মস্কোয় চিকিৎসা নিচ্ছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা

মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় আহত ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বর্তমানে মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কুয়েতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জারিদার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে তাকে মস্কো পাঠানো হয়েছে।

১৩ ঘণ্টা আগে

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল— কে কী পেতে চাইছে যুদ্ধ থেকে?

ওয়াশিংটন ও তাদের মিত্রদের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হতো যদি এই যুদ্ধের মাধ্যমে আয়াতুল্লাহদের শাসনের অবসান ঘটে এবং দ্রুত সেখানে একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার আসে; যারা নিজেদের জনগণ বা প্রতিবেশীদের জন্য আর হুমকি হবে না।

১৩ ঘণ্টা আগে