ইতিহাস

ইরান-আমেরিকা দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হলো যেভাবে

অরুণাভ বিশ্বাস

আজকের দিনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৈরিতা বিশ্ব রাজনীতির এক জটিল ও উত্তপ্ত অধ্যায়। তবে এই দ্বন্দ্ব রাতারাতি সৃষ্টি হয়নি। একে বোঝার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে অন্তত সাত দশক পেছনে—ইরানের তেলসম্পদ, রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ, ইসলামী বিপ্লব, জিম্মি সংকট ও ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে মোড়ানো ইতিহাসের পাতায়।

১৯৫৩ সাল ছিল এই বৈরিতার সূচনাবিন্দু। ইরানে তখন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায়। তিনি ইরানের তেলসম্পদ জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেন, যেটি তখন ব্রিটিশ মালিকানাধীন অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির (বর্তমানে BP) হাতে ছিল। এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমাদের—বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের—স্বার্থে ধাক্কা দেয়। এরপর ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ‘অপারেশন আজাক্স’ নামে এক গোপন অভিযানের মাধ্যমে ১৯৫৩ সালে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে ইরানে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। পশ্চিমাপন্থী শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানো হয়।

এই ঘটনা ইরানিদের মনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাসের বীজ বপন করে। অনেক ইরানিই বিশ্বাস করতেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করেছে শুধুমাত্র তেলের নিয়ন্ত্রণের জন্য।

১৯৭৯ সাল ছিল এই দ্বন্দ্বের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশাল মোড়। ওই বছর ইরানে ঘটে যায় ইসলামী বিপ্লব। আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে শাহের শাসন শেষ হয়, এবং ইরান এক ইসলামী প্রজাতন্ত্রে রূপ নেয়। বিপ্লবের কয়েক মাস পরই ঘটে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা—ইরানের তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করে ফেলে একদল কট্টরপন্থী ছাত্র। তারা দাবি তোলে, যুক্তরাষ্ট্র যেন শাহকে ইরানে ফিরিয়ে দেয় বিচার করার জন্য। যুক্তরাষ্ট্র এতে রাজি না হওয়ায় জিম্মিরা ৪৪৪ দিন আটকে থাকে।

এই ‘ইরান হোস্টেজ ক্রাইসিস’ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে ছিন্ন হয়ে যায়। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে এক ‘রোগ রাষ্ট্র’ বা “rogue state” হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে।

১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে সাহায্য করে আমেরিকা—যদিও পরবর্তীকালে তারা সাদ্দামের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে যায়। ১৯৮৮ সালে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে, যাতে ২৯০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এই ঘটনার ফলে ইরানিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকে ইরান পরমাণু শক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র সন্দেহ প্রকাশ করে যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। এরপর থেকে শুরু হয় নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং কখনো কখনো সামরিক হুমকি।

২০১৫ সালে এই উত্তেজনার কিছুটা অবসান ঘটে ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (JCPOA) বা ইরান পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তিতে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয় এবং এর বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে সরে আসেন এবং পুনরায় কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যা আবার উত্তেজনা উসকে দেয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বৈরিতা আরও জটিল আকার নেয়—বিশেষ করে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হলে। ইরান এটিকে যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে দেখে এবং প্রতিশোধ নেয়ার কথা জানায়।

এই পুরো সময়জুড়ে ইরান ও আমেরিকার সম্পর্ক ছিল এক প্রকার ঠাণ্ডা যুদ্ধের মতো। সামরিক মুখোমুখি সংঘর্ষ না হলেও, পরোক্ষ সংঘাত, সাইবার হামলা, গোপন অভিযান এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসে মদদদাতা হিসেবে দেখে, আবার ইরান মনে করে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি ও হস্তক্ষেপের মূল উৎস।

এই দ্বন্দ্ব এখন কেবল ইরান-আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুই দেশের এই দীর্ঘ বৈরিতার মূলে রয়েছে স্বার্থের সংঘাত, ইতিহাসের আঘাত, এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস।

জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ক্লারা ফিশার বলেন, “ইরান-আমেরিকা দ্বন্দ্ব কোনো একক ঘটনার ফল নয়; এটি একটি দীর্ঘ ইতিহাসের ফল যেখানে প্রতিটি অধ্যায় আরও জটিলতা তৈরি করেছে।” তাঁর মতে, এই সম্পর্ক শুধুমাত্র পরমাণু চুক্তি বা নিষেধাজ্ঞার বিষয় নয়, এটি হলো “ক্ষমতা, সংস্কৃতি, এবং আত্মপরিচয়ের সংঘাত।”

এই দীর্ঘ ইতিহাস বোঝা গেলে বোঝা যাবে, কেন আজও প্রতিটি নতুন ঘটনার পর ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সমাধান সম্ভব, কিন্তু তার জন্য দরকার সাহসী কূটনীতি, পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গিকে বোঝার মনোভাব, এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সদিচ্ছা।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

লিবিয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাতে বৃহত্তম তেল শোধনাগার বন্ধ

লিবিয়ার বৃহত্তম তেল শোধনাগার জাওয়িয়ার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই এলাকায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে শোধনাগারটির আশপাশে সংঘাত শুরু হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা।

৬ ঘণ্টা আগে

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি ছিল আড়ম্বরপূর্ণ। শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে আরও বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা শপথ গ্রহণ করেছেন।

৮ ঘণ্টা আগে

আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ভারতের, আকাশে আলোকরশ্মিতে কৌতূহল বাংলাদেশে

যদিও ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পরীক্ষাটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আইসিবিএম শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্রের ছিল।

৮ ঘণ্টা আগে

মমতার বিশ্বস্ত সহকর্মী থেকে যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

মমতা ব্যানার্জীর একসময়ের সতীর্থ বা রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তার কাছেই পর পর দুটো বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন মিজ. ব্যানার্জী - প্রথমবার ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে, আবার এ বছর তার ঘরের মাঠ বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে।

৮ ঘণ্টা আগে