প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা বহাল কলকাতা হাইকোর্টে

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২২ মে ২০২৬, ০৯: ৫৯
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। প্রতীকী ছবি

পশ্চিমবঙ্গে গবাদি পশু কেনাবেচা ও জবাইয়ের ওপর রাজ্য সরকারের জারি করা বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তিটি বহাল রেখেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ বা সুস্থতার সনদ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই গবাদি পশু জবাই করা যাবে না। একই সঙ্গে ‘প্রকাশ্যে পশু জবাই নিষিদ্ধ’— এই শর্তটি মূল বিজ্ঞপ্তিতে যুক্ত করার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ দেন। হাইকোর্ট ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে মূল মামলাটি চালু রাখলেও সরকারের বিজ্ঞপ্তির ওপর কোনো ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়েছে, শুনানি শেষে ডিভিশন বেঞ্চ পূর্ববর্তী রায়ের সূত্র ধরে রাজ্য সরকারকে বেশ কিছু নির্দেশনা দেন। আদালত মনে করিয়ে দেন, ‘বিহার রাজ্য বনাম মোহাম্মদ হানিফ কুরেশি’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন— গরু জবাই ঈদুল আজহার কোনো অপরিহার্য অংশ বা ইসলাম ধর্মের বাধ্যতামূলক ধর্মীয় প্রয়োজনীয়তা নয়।

এ ছাড়া ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইনের ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, জবাইয়ের ছাড়পত্রের জন্য কোনো আবেদন করা হলে রাজ্য সরকারকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়ার বিদ্যমান ব্যবস্থা এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পরিকাঠামো রাজ্য সরকারকে নতুন করে পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ১৩ মে ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাজ্য সরকার। ওই বিজ্ঞপ্তিতে মোট আটটি দফা রয়েছে। এতে বলা হয়, কোনো ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর ও মহিষ জবাইয়ের আগে পশুর সুস্থতার সনদ বা ‘ফিট সার্টিফিকেট’ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কেবল ১৪ বছরের বেশি বয়সী অথবা বার্ধক্য, স্থায়ী পঙ্গুত্ব ও নিরাময় অযোগ্য রোগে আক্রান্ত গবাদিপশুই কেনাবেচা ও জবাই করা যাবে এবং সরকারি বা রেজিস্টার্ড পশু চিকিৎসকদের পরীক্ষার পরেই নির্দিষ্ট পশুটি জবাইয়ের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

রাজ্য সরকারের এ বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ একাধিক মামলা দায়ের হয়। বুধবারও তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভা সদস্য (এমপি) মহুয়া মৈত্রসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি মিলে একটি মামলা করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার এসব মামলার যৌথ শুনানিতে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আপাতত রাজ্যের বিজ্ঞপ্তিতে কোনো ধরনের স্থগিতাদেশ দেওয়া হবে না।

মোহম্মদ জাফর ইয়াসনি নামে এক মামলাকারী আদালতে বলেন, ‘রাজ্যে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পরিকাঠামোই নেই। পশু চিকিৎসক কারা, সাধারণ মানুষ তা জানে না। আগামী ২৮ ঈদুল আজহা, এর ঠিক আগে তড়িঘড়ি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। একটি গরুর গড় আয়ু ১৫ বছর, তাহলে কোরবানিদাতারা হঠাৎ ১৪ বছরের গরু কোথায় খুঁজে পাবেন?’ সাধারণ মানুষ যেন আইনি হয়রানির শিকার না হন, সেই দাবি জানান তিনি।

‘জমিয়ত উলামায়ে’র পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য ১৯৫০ সালের মূল আইনটির বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি এবং সংশ্লিষ্ট আইনের সাংবিধানিক বৈধতা— উভয়কেই চ্যালেঞ্জ করেছি। ১৯৫০ সালের আইনটির উদ্দেশ্য ছিল পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ করা। কৃষিকাজের স্বার্থে পশু সংরক্ষণ করা উচিত, তাই ওই আইন আনা হয়। কিন্তু এখন আর কৃষিকাজ গরু বা মহিষের উপর নির্ভরশীল নয়। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সেই পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরিসংখ্যান বলছে গবাদি পশুর সংখ্যা স্বাস্থ্যকর হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দুধ উৎপাদনও বেড়েছে। মোট গবাদি পশুর জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশেরও বেশি গরু। গরুর সংখ্যা ১.৩ শতাংশ বেড়েছে। পুরুষ গবাদি পশুর সংখ্যা কমলেও স্ত্রী গবাদি পশুর সংখ্যা বেড়েছে। উত্তরপ্রদেশে গবাদি পশু জবাই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ, তবুও সেখানে গরুর সংখ্যা কমছে। আর পশ্চিমবঙ্গে বাড়ছে।’

বিকাশ রঞ্জন আরও বলেন, ওই আইনটি শুধু সেসব এলাকায় কার্যকর, যেগুলো ১৯৫২ সালে পৌরসভা ছিল, এর বাইরে নয়। কারণ, আইনটি ১৯৫২ সালেই কার্যকর হয়েছিল। ফলে কলকাতা এবং কালিম্পংয়ের বাইরে এই আইন কার্যকর করা উচিত নয়। আইনে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো পশু জবাই করতে পারবেন না।’ কিন্তু এই আইনের অধীনে পঞ্চায়েত সমিতিগুলোকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। কোনো জৈবিক পরীক্ষা ছাড়া কীভাবে একটি পশুর বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব?”

বিকাশ রঞ্জন যুক্তি দেন, আইনে বলা হয়েছে, পশুর ফিটনেস সার্টিফিকেট দিতে অস্বীকার করলে কোনো ব্যক্তি ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্যের কাছে আপিল করতে পারবেন। অর্থাৎ আইনে আপিলের অধিকার বাধ্যতামূলক। আর বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে গত ১৩ মে। বলা হয়েছে, ধর্মীয়, চিকিৎসা বা অন্যান্য বিশেষ উদ্দেশে এই আইন প্রযোজ্য হবে না, যতক্ষণ না তা প্রতিবেশীদের ধর্মীয় অনুভূতি বা আইনশৃঙ্খলার ওপর প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ ধর্মীয় উদ্দেশ্যের জন্য আইনেই ব্যতিক্রমের ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো আইন যদি দীর্ঘদিন কার্যকর করা না হয়, তবে তার কার্যকারিতা ক্ষীণ হয়ে যায়।

আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন আদালতে আরও বলেন, ‘মানুষ এখানে কোনো প্রদর্শনীর জন্য আসেনি। গরুর হাট বন্ধ হয়ে গেছে। এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ তাদের ধর্মীয় আচার পালন করতে না পেরে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ধার্মিক নই, কিন্তু সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। অন্য ধর্মের সঙ্গে যুক্ত গবাদি পশু ব্যবসায়ীরাও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে জবাইয়ের জন্য ফিটনেস সার্টিফিকেট পাওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। কোনো পশুকে জবাইয়ের উপযুক্ত ঘোষণা করা হলে, পৌরসভা অনুমোদিত জবাইখানায় জবাই করা যাবে। পশ্চিমবঙ্গে এমন কতগুলো কেন্দ্র রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।’

সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারের জারি করা বিজ্ঞপ্তিটির কার্যকারিতা বহাল রেখে রাজ্যকে পরিকাঠামো খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন এবং প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন। আদালত বলেন, ‘যদি এই আইন কার্যকর না থাকত, তাহলে এতগুলো মামলা দায়ের করারই কোনো প্রয়োজন হতো না। প্রতি বছর এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে। তাহলে কি এটা বলা ন্যায্য হবে যে আইনটি কার্যকর ছিল না?’

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বার্লিনের জঙ্গলে অস্ত্রের গোপন ভাণ্ডার, রুশ গোয়েন্দা সংযোগের সন্দেহ

ডোব্রিন্ট জানান, ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে— এমন গুরুতর সহিংস কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে’ তদন্ত শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাটি জার্মানির বর্তমান ‘উচ্চ ঝুঁকি’র নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে। এতে বিদেশি কোনো শক্তির সম্পৃক্ততা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

৭ ঘণ্টা আগে

স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ফের কারাগারে ইমরান খান

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইমরান খানকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে আবার রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকেরা পরীক্ষার পর তাকে ‘চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ’ ঘোষণা করেছেন।

১৬ ঘণ্টা আগে

ট্রাম্প কি ইরানের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর বাণিজ্য বন্ধ করতে পারবেন

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো দেশ ইরানকে আর্থিক, ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো সহায়তা দিলে সেই দেশকেও ‘প্রচণ্ড অর্থনৈতিক ক্ষতির’ মুখে পড়তে হবে।

১৯ ঘণ্টা আগে

কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা: নিহত ১৩, আহত ৩৩

রাশিয়ার এই ভয়াবহ হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক সহায়তার জোর আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, "ইউক্রেন যতদিন পর্যাপ্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা না পাবে, ততদিন রাশিয়া শান্তির বিষয়টি বিন্দুমাত্র গু

২ দিন আগে