মেটার ‘আসক্তিকর’ নকশা শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছে: ইইউ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ২০: ৩২
নকশা ‘আসক্তিকর’ উল্লেখ করে মেটার বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জারি করেছে ইউরোপীয় কমিশন। ছবি: রয়টার্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ‘আসক্তিকর নকশা’ (অ্যাডিক্টিভ ডিজাইন) ব্যবহারকারীদের, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে অভিযোগ তুলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রও জারি করেছে ইইউয়ের নির্বাহী সংস্থা ইউরোপীয় কমিশন।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার প্রকাশিত হয় মেটার বিরুদ্ধে ইইউয়ের এই অভিযোগপত্র। তবে মেটা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছে। শিশু-কিশোরদের সুরক্ষায় তারা ব্যবস্থা নিয়েছে বলে দাবি করেছে।

অভিযোগপত্রে ইউরোপীয় কমিশন বলেছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ভিডিও অটোপ্লে, ইনফিনিট স্ক্রল, রিলস ও স্টোরিজসহ অন্যান্য ফিচার এমনভাবে ডিজাইন করা, যেন ব্যবহারকারীরা একবার ঢুকলে আটকে যায়। এ ডিজাইন মানুষের মস্তিষ্ককে ‘অটোপাইলট মোডে’ নিয়ে যায়। এর ফলে ব্যবহারকারীরা অজান্তেই দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে থেকে যান, যা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের দিকে ঠেলে দেয়।

ইইউয়ের মতে, মেটার অ্যাপগুলোর ডিজাইন ইউরোপের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টের (ডিএসএ) ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিধান লঙ্ঘন করতে পারে। তাদের তদন্তে উঠে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো— মেটা জানত যে বিপুলসংখ্যক শিশু ও কিশোর গভীর রাত পর্যন্ত ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কাছেই এমন তথ্য ছিল যে রিলস, স্টোরিজ ও অন্যান্য ফিচার শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত, এমনকি বাধ্যতামূলক ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি করতে পারে। তবু মেটা এসব ঝুঁকি কমাতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি।

ইইউ বর্তমানে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাব্যতা বিবেচনা করছে। ফলে এ অভিযোগকে ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘অটোপাইলট মোডে’ নিয়ে যায় অ্যালগরিদম

অভিযোগপত্রে কমিশন বলেছে, ভিডিও অটোপ্লে ও ইনফিনিট স্ক্রলের মতো নকশা ব্যবহারকারীদের সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়। এতে ব্যবহারকারীরা একটি ভিডিও শেষ হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরেকটি ভিডিও দেখতে শুরু করেন কিংবা অনন্তকাল ধরে কনটেন্ট স্ক্রল করতে থাকেন।

কমিশনের মতে, এ প্রক্রিয়া মস্তিষ্ককে ‘অটোপাইলট মোডে’ নিয়ে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে উৎসাহিত করে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে কমিশন।

২০২৪ সালের মে মাসে শুরু হয়েছিল এই তদন্ত। বর্তমান অভিযোগ ছাড়াও কমিশন আরও কয়েকটি বিষয় তদন্ত করছে। এর মধ্যে রয়েছে তথাকথিত ‘র‌্যাবিট হোল ইফেক্ট’, যেখানে অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের, বিশেষ করে তরুণদের একই ধরনের নেতিবাচক কনটেন্ট ধারাবাহিকভাবে দেখাতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড বা শরীরের গঠন নিয়ে ক্ষতিকর কনটেন্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তের আরেকটি অংশে কমিশনের অভিযোগ, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার ঠেকাতে মেটা ব্যর্থ হয়েছে। কমিশনের দাবি, এটি শুধু ইইউ আইনেরই নয়, মেটার নিজস্ব শর্তাবলীরও লঙ্ঘন।

কী পরিবর্তন চায় ইউরোপীয় কমিশন, কী বলছে মেটা

কমিশন চায় মেটা ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশায় মৌলিক পরিবর্তন আনুক। এর মধ্যে রয়েছে— ডিফল্ট হিসেবে ভিডিও অটোপ্লে ও ইনফিনিট স্ক্রল বাতিল করা; নির্দিষ্ট সময় পর বাধ্যতামূলক স্ক্রিন বিরতি চালু করা; অ্যালগরিদমে পরিবর্তন এনে অতিমাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক কনটেন্ট কম দেখানো; ও শিশু-কিশোরদের জন্য ঝুঁকি কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।

তবে মেটা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন, কমিশনের প্রাথমিক পর্যায়ের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তারা একমত নন। তাদের দাবি, তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেকেই কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় তারা উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে।

মেটার ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ‘টিন অ্যাকাউন্টস’ চালু করেছে, যেখানে কিশোরদের জন্য স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। এতে অভিভাবকেরা রাতের বেলায় ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার বন্ধ করতে পারেন এবং দৈনিক স্ক্রিন টাইম ১৫ মিনিট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করে দিতে পারেন।

মেটা এখন কমিশনের অভিযোগের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবে এবং তদন্তসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করতে পারবে। তবে শেষ পর্যন্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে মেটাকে বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে। মেটার রাজস্বের আকার বিবেচনায় এটি কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞার পথে ইউরোপ?

মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার কয়েক দিনের মধ্যেই ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনের গঠিত অনলাইন শিশু-নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাদের বহুল প্রতীক্ষিত সুপারিশ জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। লিয়েন গত মে মাসেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক এক সম্মেলনে এ বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন।

ওই সময় তিনি বলেন, আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কত দেরিতে শুরু করানো যায়, তা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। প্রশ্নটি এই নয় যে তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশাধিকার থাকা উচিত কি না। প্রশ্ন হলো— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাছে তরুণদের প্রবেশাধিকার থাকা উচিত কি না।

বর্তমানে ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনসহ অন্তত ১০টি ইইউ সদস্যরাষ্ট্র শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা করছে। ফলে পুরো ইউরোপ জুড়ে অভিন্ন নীতি গ্রহণে কমিশনের ওপর চাপও বাড়ছে।

ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রযুক্তিনীতিবিষয়ক প্রধান হেনা ভিরকুনেন বলেন, ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর আসক্তিকর নকশা ও তার প্রভাবের জন্য তাদের জবাবদিহির একটি স্পষ্ট কাঠামো দিয়েছে। ইউরোপে আমাদের আইন কার্যকর করতে আমরা পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মেটার বিরুদ্ধে ‘আসক্তিকর অ্যালগরিদম’ নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়

মেটার অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্ম ডিজাইন নিয়ে কয়েক বছর ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তদন্ত চলছে। ২০২১ সালে সাবেক ফেসবুক কর্মী ফ্রান্সেস হাউগেনের ফাঁস করা অভ্যন্তরীণ নথিতে দাবি করা হয়, কোম্পানি নিজেই জানত যে ইনস্টাগ্রাম অনেক কিশোরীর শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তবুও ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়নি।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর অ্যাটর্নি জেনারেলদের জোট মেটার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করে। অভিযোগ ছিল, প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন অ্যালগরিদম ও নকশা তৈরি করেছে, যা শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখে এবং আসক্তির ঝুঁকি বাড়ায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেটার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৩ সালে ব্যক্তিগত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে স্থানান্তরের অভিযোগে ইইউর তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ মেটাকে ১২০ কোটি ইউরো (প্রায় ১৩০ কোটি ডলার) জরিমানা করে, যা তখন পর্যন্ত জিডিপিআর আইনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা ছিল। পরে ২০২৪ সালে ‘পে অর কনসেন্ট’ মডেলসহ প্রতিযোগিতা আইন ও ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘনের অভিযোগেও মেটার বিরুদ্ধে পৃথক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ ‘আসক্তিকর নকশা’ সংক্রান্ত অভিযোগ শুধু একটি পৃথক মামলা নয়, বরং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা, অ্যালগরিদমিক জবাবদিহি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেলকে নতুন করে আইনের আওতায় আনার ইউরোপীয় প্রচেষ্টারই অংশ।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বেরোনোর পথ কঠিন, বিরতি টিকিয়ে রাখাও চ্যালেঞ্জিং— ইরান যুদ্ধে উভয় সংকটে ট্রাম্প

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প বলেছেন, অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যত ‘শেষ’। তার এ অবস্থান এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। এর আগে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলা

৯ ঘণ্টা আগে

স্পেনে ভয়াবহ দাবানলে ১২ জনের মৃত্যু

আঞ্চলিক সরকার জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের আলমেরিয়া প্রদেশের লস গাইয়ারদোস এলাকায় এ দাবানলের সূত্রপাত হয়। নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

১১ ঘণ্টা আগে

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইএসি সদস্যদের সরালেন ট্রাম্প, বাড়ছে উদ্বেগ

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে—ওই ই-মেইলে বলা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, ইলেকশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিশনের কমিশনার হিসেবে আপনার দায়িত্ব অবিলম্বে কার্যকরভাবে শেষ করা হলো।’

১২ ঘণ্টা আগে

মার্কিন হামলার জবাব ইরানের, ফের উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দিনের হামলার জবাব হিসেবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব দেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের ভূখণ্ড ইরানে হামলার জন্য ব্যবহার করা হয়নি।

১৩ ঘণ্টা আগে