সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, পারমাণবিক সক্ষমতার নতুন বার্তা চীনের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
চীনের নৌবাহিনীর পারমাণবিক শক্তিচালিত টাইপ–০৯৪এ ‘জিন’ শ্রেণির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন। ছবিটি ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক মহড়ার সময় তোলা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

সাবমেরিন থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে পারমাণবিক সক্ষমতার নতুন অগ্রগতি বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে চীন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ পরীক্ষার মাধ্যমে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই নয়, বরং পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিন পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর সক্ষমতাও যাচাই করার সুযোগ পেয়েছে বেইজিং।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, পারমাণবিক অস্ত্র বহনকারী সাবমেরিনকে শত্রুর নজর এড়িয়ে পরিচালনা করা এবং একই সঙ্গে এর সঙ্গে নিরাপদ যোগাযোগ বজায় রাখা বিশ্বের সবচেয়ে জটিল সামরিক সক্ষমতাগুলোর একটি। বিশেষ করে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক আনুগত্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গত সোমবার পরীক্ষামূলকভাবে ওই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়। এতে একটি ডামি ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এটি ছিল একটি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম), যা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়ে। এ ঘটনায় অঞ্চলটির কয়েকটি দেশও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তবে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও কর্মকর্তারা এটিকে ‘নিয়মিত সামরিক মহড়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের দাবি, এ পরীক্ষা কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা লক্ষ্যবস্তুকে উদ্দেশ্য করে পরিচালিত হয়নি এবং পুরো প্রক্রিয়া পেশাদারভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে শুক্রবার চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কিছু সংবাদকে ‘সম্পূর্ণ বিকৃতি ও অতিরঞ্জন’ বলে উড়িয়ে দেয়। মন্ত্রণালয় জানায়, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত নিয়ম মেনেই এই পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। তাদের ভাষ্য, চীনের পারমাণবিক বাহিনীর আধুনিকায়নের উদ্দেশ্য জাতীয় কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

এটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। ওই সময় হাইনান দ্বীপ থেকে একটি মোবাইল লঞ্চারের মাধ্যমে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছিল দেশটি।

সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক কলিন কোহ বলেন, এ পরীক্ষায় শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও সাবমেরিনের প্রযুক্তিগত কর্মক্ষমতা নয়, পুরো কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও মূল্যায়ন করা হয়েছে।

কলিনের মতে, এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও চীন কার্যকর সাবমেরিনভিত্তিক পারমাণবিক হামলা চালানোর সক্ষমতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে না পারলেও গুয়াম ও হাওয়াইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর সক্ষমতা তারা প্রদর্শন করতে চাইছে।

পারমাণবিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু?

বিশ্লেষকদের মতে, সোমবারের ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে চীনের ছয়টি টাইপ-০৯৪ পারমাণবিক শক্তিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিনের (এসএসবিএন) একটি থেকে। এসএসবিএন হলো এমন বড় আকারের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন, যা পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনকারী আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য তৈরি।

হাইনান দ্বীপভিত্তিক এই সাবমেরিন বহরকে চীনের সামরিক আধুনিকায়নের সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা অংশগুলোর একটি বলে মনে করেন আঞ্চলিক সামরিক বিশ্লেষকেরা। কারণ এগুলো চীনের ‘সেকেন্ড-স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ বা পালটা পারমাণবিক হামলার সক্ষমতার মূল ভিত্তি।

অর্থাৎ, শত্রুপক্ষ যদি প্রথম হামলায় চীনের স্থলভিত্তিক পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসও করে দেয়, তবু সমুদ্রে লুকিয়ে থাকা এসব সাবমেরিন থেকে পালটা পারমাণবিক হামলা চালানো সম্ভব হবে। এ সক্ষমতা বেইজিংয়ের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আগে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না’— এমন নীতি অনুসরণ করে।

নজরদারিতে চীনের সাবমেরিন

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিয়মিত যুদ্ধজাহাজ, সমুদ্রতলের সেন্সর নেটওয়ার্ক ও উন্নত নজরদারি সরঞ্জামযুক্ত পি-৮ পসাইডন টহল বিমানের মাধ্যমে চীনের সাবমেরিনগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করার চেষ্টা করে। চীনের সক্ষমতা যত বাড়বে, এ ধরনের নজরদারিও তত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০২২ সালের এক পেন্টাগন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চীন প্রায় অব্যাহতভাবে পারমাণবিক প্রতিরোধমূলক টহল পরিচালনা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য বহু বছর ধরেই এ ধরনের সক্ষমতা বজায় রেখেছে। ভারতও বর্তমানে নিজস্ব এসএসবিএন বহর গড়ে তুলছে।

এ সপ্তাহে প্রকাশিত বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টসের এক গবেষণায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না করলেও কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে গবেষকদের জানিয়েছেন, চীনের এসব টহলরত সাবমেরিনে বাস্তব পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে গবেষণাটিতে এটিও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সামরিক শুদ্ধি অভিযান, বিশেষ করে রকেট ফোর্সের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অপসারণ ইঙ্গিত দেয়— স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পারমাণবিক ওয়ারহেড সহজে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় না।

‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’ শক্তিশালী করছে চীন

সোমবারের ক্ষেপণাস্ত্রটি ঠিক কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে কিংবা উৎক্ষেপণে কোন মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই পরীক্ষায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল— চীনের সাবমেরিনগুলো উপকূল ছেড়ে কতটা গোপনে গভীর সমুদ্রে প্রবেশ করতে পারে।

বর্তমান টাইপ-০৯৪ সাবমেরিনের পরিবর্তে আরও আধুনিক ও কম শব্দ উৎপন্নকারী নতুন প্রজন্মের সাবমেরিন তৈরির কাজও চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সবচেয়ে উন্নত জেএল-৩ সাবমেরিনভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে হলে সাবমেরিনকে দক্ষিণ চীন সাগর পেরিয়ে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে যেতে হবে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী নৌ বাহিনীর নজরে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার পাল্লার জেএল-৩ ক্ষেপণাস্ত্র একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ের সামরিক কুচকাওয়াজেও এটি প্রদর্শন করা হয়েছিল।

চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস বলেছে, এই উৎক্ষেপণ প্রমাণ করে যে বেইজিং তার ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’— অর্থাৎ স্থল, সমুদ্র ও আকাশ— এই তিন প্ল্যাটফর্ম থেকেই পারমাণবিক হামলা চালানোর সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী করছে।

পত্রিকাটির মতে, এর ফলে বাইরের শক্তিগুলো সর্বোচ্চ সামরিক চাপ বা আগাম হামলার মাধ্যমে চীনকে ছাড় দিতে বাধ্য করার কৌশল থেকে সরে আসতে বাধ্য হবে, যা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বেরোনোর পথ কঠিন, বিরতি টিকিয়ে রাখাও চ্যালেঞ্জিং— ইরান যুদ্ধে উভয় সংকটে ট্রাম্প

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প বলেছেন, অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যত ‘শেষ’। তার এ অবস্থান এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। এর আগে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলা

৭ ঘণ্টা আগে

স্পেনে ভয়াবহ দাবানলে ১২ জনের মৃত্যু

আঞ্চলিক সরকার জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের আলমেরিয়া প্রদেশের লস গাইয়ারদোস এলাকায় এ দাবানলের সূত্রপাত হয়। নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

৯ ঘণ্টা আগে

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইএসি সদস্যদের সরালেন ট্রাম্প, বাড়ছে উদ্বেগ

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে—ওই ই-মেইলে বলা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, ইলেকশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিশনের কমিশনার হিসেবে আপনার দায়িত্ব অবিলম্বে কার্যকরভাবে শেষ করা হলো।’

১০ ঘণ্টা আগে

মার্কিন হামলার জবাব ইরানের, ফের উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দিনের হামলার জবাব হিসেবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব দেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের ভূখণ্ড ইরানে হামলার জন্য ব্যবহার করা হয়নি।

১১ ঘণ্টা আগে