ভেনেজুয়েলায় মরদেহে উপচে পড়ছে মর্গ, স্বজনদের আহাজারি

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে নিখোঁজদের তালিকায় স্বজনদের নামের সন্ধান। ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের বেলো মন্টে মর্গের সামনে একের পর এক এসে থামছে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি আর পিকআপ ভ্যান। প্রতিটি যানবাহনই বহন করে আনছে ভূমিকম্পে নিহত মানুষের মরদেহ। স্বজনরা ভিড় করছেন শুধু একটি আশায়— হয়তো নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজ মিলবে।

গত বুধবার ক্যারিবীয় উপকূলে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। শত শত ভবন ধসে পড়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। নিহতদের বড় একটি অংশের মরদেহ নেওয়া হচ্ছে কারাকাসের বেলো মন্টে মর্গে, যেখানে পরিস্থিতি এখন সামাল দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।

মর্গের বাইরে শোকাহত পরিবারগুলোর মানসিক সহায়তায় কাজ করছেন মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কামিলা রদ্রিগেজ। তিনি বলেন, 'গতকাল (শনিবার) পুরো রাস্তা মৃত স্বজনদের নিয়ে আসা মানুষের ভিড়ে ভর্তি ছিল।'

মর্গের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন মারহোরি সেদেনো। ভেনেজুয়েলার ১২৫ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে তিনি একসঙ্গে হারিয়েছেন মা, বাবা ও ভাইকে।

কারাকাসের অভিজাত এলাকা লস পালোস গ্রান্দেসে এল আবিলা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত চারতলা আবাসিক ভবন 'রেসিদেনসিয়াস ওবেলিস্কো' ধসে পড়লে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন তার ৭২ বছর বয়সী মা জোইলা সেদেনো, ৭৪ বছর বয়সী বাবা হাসিন্তো রুইজ এবং ৪৪ বছর বয়সী ভাই হোসে রুইজ।

ভূমিকম্পের পর এখনো এমন রাস্তায় থাকতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। ছবি: সংগৃহীত
ভূমিকম্পের পর এখনো এমন রাস্তায় থাকতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। ছবি: সংগৃহীত

শুক্রবার রাত ৯টা পর্যন্ত তিনি শুধু ভাইয়ের মরদেহ শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। ফরেনসিক পুলিশ তাকে একটি ছবি দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করে। কিন্তু তার মা ও বাবা তখনো ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ে ছিলেন।

মারহোরি বলেন, 'ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সময় আমার ভাই ভবনে ঢুকছিল। আমরা বিশ্বাস করি, সে ভেতরে গিয়ে আমার মা-বাবাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেছিল। একটু আগেই সে এক বন্ধুর সঙ্গে সমুদ্রসৈকত থেকে ফিরেছিল। সেই বন্ধুটিও মারা গেছে।'

মারহোরির ধারণা, ওই ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে তখনো অন্তত ২৫ জন আটকা ছিলেন। মর্গের ভেতরের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'ভেতরের অবস্থা ভয়াবহ। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না কতটা চাপের মধ্যে তারা কাজ করছে। এমন ট্র্যাজেডি কারও জীবনে না আসুক।'

জীবিত উদ্ধার হলেও হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যু

আরেক নারী বেলকিস সেদেনো এসেছিলেন তার ৫৬ বছর বয়সী ভাবি মারিয়া এলেনা মোরেনোর খোঁজে। মারিয়া সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরার বাসিন্দা ছিলেন।

বেলকিস বলেন, 'তাদের ভবন পুরোপুরি ধসে গেছে। ১০ তলা ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। বৃহস্পতিবার ভোরে তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। সে একাই ছিল, কারণ তার ছেলে বান্ধবীকে নিয়ে সুপারমার্কেটে গিয়েছিল।'

তার ভাষ্য, রাত প্রায় ২টার দিকে জীবিত উদ্ধার হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভুয়া সুনামি সতর্কবার্তায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে মারিয়াকে দীর্ঘ সময় খোলা জায়গায় পড়ে থাকতে হয়। বেলকিস বলেন, 'যখন শেষ পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখন তিনি মৃত অবস্থায় পৌঁছান।'

'মানুষ নিজেদের গাড়িতে মরদেহ নিয়ে আসছে'

ভেনেজুয়েলার জাতীয় ফিউনারেল হোমস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এডগার হার্নান্দেজ জানান, সারা দেশের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দুই শতাধিক কফিন ও মরদেহ বহনের ব্যাগসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করেছে৷তারা উদ্ধারকাজেও সহায়তা করছে।

এডগার বলেন, 'অনেক মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে মরদেহ বেলো মন্টে মর্গে নিয়ে আসছেন। কারণ লা গুয়াইরার মর্গে এত চাপ যে সেটি কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং সেখানে পৌঁছানোও কঠিন।'

সরকারের আশ্বাস, জনগণের ক্ষোভ

শনিবার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বিদেশি উদ্ধারকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, 'আজ আমরা আরও ৩৩ জন জীবিত মানুষকে উদ্ধার করতে পেরেছি।' পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি জানান, কারাবালেদা শহরে আরও এক ১১ বছর বয়সী শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্ধার অভিযানের বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, সরকারি উদ্ধারকারী দল হাতুড়ি, স্ট্রেচার ও ভারী সরঞ্জাম ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত মানুষকে বের করে আনছে।

তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অনেকের দাবি, দুর্যোগের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তারা কার্যত নিজেদের ভাগ্যের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

রাজধানীর একটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গেলে স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে পড়েন ডেলসি রদ্রিগেজ। এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলেন, 'সরকার মানুষের জন্য কিছুই করছে না!'

বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর জরুরি সেবায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়া এবং দুর্যোগের ব্যাপকতাই সরকারি ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

ধ্বংসস্তূপের শহরে মানবতার হাত

কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় এখনও শত শত পরিবার তাঁবু, গদি বা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছে। ভবন ধসে পড়ার আতঙ্কে তারা ঘরে ফিরতে পারছেন না। অনেক পরিবারের সঙ্গেই রয়েছে ছোট ছোট শিশু। তবে এই কঠিন সময়েও সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় ভরসা। স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার, পানি, কফি ও মানসিক সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে।

মারহোরি সেদেনো বলেন, 'আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই, কারণ ভেনেজুয়েলার মানুষের হৃদয় অনেক বড়। মানুষ অসাধারণভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে।'

সরকারি সহায়তার ঘাটতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, 'হয়তো সরকারের সাড়া নেই। কিন্তু এত ভালো মানুষ সাহায্য করছেন যে সেটাই আমাদের টিকে থাকার শক্তি হয়ে উঠেছে।'

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মাশহাদে চিরনিদ্রায় শায়িত আলি খামেনি, বিদায় জানাতে লাখো মানুষের ঢল

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) মাশহাদের দিকে এগিয়ে যায় খামেনির মরদেহবাহী ট্রাক। রাস্তার দুই পাশে কালো পোশাক পরা লাখো শোকাহত মানুষ ইরানের পতাকা, খামেনির ছবি ও বিপ্লবী স্লোগান লেখা লাল প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ধীরগতিতে এগিয়ে চলা শবযাত্রার সময় পুরো শহরে শোক, ধর্মীয় আবেগ ও প্রতিশোধের আহ্বানের মিশ্র পরিবেশ

১৩ ঘণ্টা আগে

আমিরাতে বিগ টিকেট লটারিতে ১০ লাখ দিরহাম জিতলেন বাংলাদেশি আতিক

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এ খবর দিয়েছে গালফ নিউজ। খবরে বলা হয়েছে, বিগ টিকেট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিজয়ী বাংলাদেশি মোহাম্মদ আতিক হাসানের টিকিট নম্বর ছিল ৩৫৯৬৮৫। তবে তিনি কত দিন ধরে এই ড্রতে অংশ নিচ্ছিলেন বা পুরস্কারের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

১৫ ঘণ্টা আগে

ওয়াশিংটনে কনস্যুলার সেবা নিতে ফি দেওয়া যাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে

দূতাবাস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সারচার্জ বা প্রসেসিং ফি প্রযোজ্য হবে, যা সেবাগ্রহীতাকে বহন করতে হবে। প্রযোজ্য সারচার্জের হার ব্যবহৃত পেমেন্ট পদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

১৫ ঘণ্টা আগে

সন্দেভাজনদের বাংলাদেশে পুশব্যাক সম্পূর্ণ অবৈধ— বললেন আসামের বিধায়ক আজমল

আসামের বিরোধী দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (এআইইউডিএফ) এই প্রধান সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আরও বলেন, কথিত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আইন ও সংবিধান অনুসরণ করতেই হবে। সীমান্তে কাউকে জোর করে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

১৬ ঘণ্টা আগে