
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এখন পর্যন্ত তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দায়িত্বের মুখোমুখি। ইরানের সঙ্গে প্রায় চার মাস ধরে চলা সংঘাতের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ তিনি। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে অনেকেই মনে করছেন, এই দায়িত্বে তার সফলতা কিংবা ব্যর্থতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নয়, হোয়াইট হাউসের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভাগ্যও নির্ধারণ করতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সাময়িক শান্তি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে, যার ফলে আপাতত দুই পক্ষের সরাসরি বৈরিতার অবসান ঘটেছে। তবে মূল সংকটের জায়গাগুলো এখনো অমীমাংসিত। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাদের সমর্থন এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে চূড়ান্ত সমাধান খুঁজতে আলোচনার জন্য দুই পক্ষ ৬০ দিনের সময় নিয়েছে।
এই আলোচনা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। একই সঙ্গে এটি ভ্যান্সের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্যও বড় ধরনের পরীক্ষা। পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। আলোচনায় অংশ নিতে বৃহস্পতিবার রাতে সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল ভ্যান্সের। তার জন্য নির্ধারিত ফ্লাইটও প্রস্তুত ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই সফর বাতিল করা হয়। যদিও হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি দল এখনো সুইজারল্যান্ডে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এমন দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে ভ্যান্সের নতুন বই ‘কমিউনিয়ন’। ক্যাথলিক ধর্মে তার দীক্ষাগ্রহণ ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর লেখা বইটির প্রচারণা উপলক্ষ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন তিনি। এসব সাক্ষাৎকারে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ইরান চুক্তির অন্যতম প্রধান সমর্থক এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও নিজেকে তুলে ধরছেন।
পুরো বিষয়টি অনেকটা নির্বাচনি প্রচারণার আবহ তৈরি করেছে। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে ভ্যান্স সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে প্রশাসনের আশাবাদের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতির বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম কঠোর সমালোচনাও করেন। তবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন কি না— এমন প্রশ্ন এলে কৌশলে সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চালচিত্র— লাভবান ইরান, শঙ্কিত প্রতিদ্বন্দ্বীরাসংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স বলেন, ‘ইরানিরা যদি তাদের আচরণ পরিবর্তন না করে, তাহলে তাদের সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর যদি তারা আচরণ পরিবর্তন করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং ইরানের জনগণের জন্যও তা আমূল পরিবর্তন বয়ে আনবে।’
রয়টার্সের বলছে, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও ইরান আলোচনায় ভ্যান্সের ভূমিকার গুরুত্ব নিয়ে জোরালো আলোচনা চলছে। দলের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রভাবশালী নেতা এবং দক্ষিণ ক্যারোলিনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম তাকে এই শান্তি উদ্যোগের ‘স্থপতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। গ্রাহামের মতে, চূড়ান্ত কোনো চুক্তি হলে সেটি অনুমোদনের জন্য সিনেটে উপস্থাপনের দায়িত্বও ভ্যান্সের নেওয়া উচিত।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে নিজস্ব ভঙ্গিতে রসিকতা করতেও ছাড়েননি। বুধবার ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘যদি এটি সফল হয়, তাহলে সব কৃতিত্ব আমি নেব। আর যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে সব দোষ জেডির ঘাড়ে চাপাব।’ ট্রাম্পের মন্তব্যে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। যদিও এ বিষয়ে ভ্যান্সের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ট্রাম্পের পক্ষে ঢাল
ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার ভাষায় ‘চিরতরে যুদ্ধের অবসান’ ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার নির্দেশ দেন।
ট্রাম্পের কিছু রিপাবলিকান মিত্র অভিযোগ করেছেন, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা কমাতে তিনি তেহরানের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন। যদিও ট্রাম্প বর্তমান সাময়িক শান্তি চুক্তিকে বড় ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরছেন, সমালোচকদের মতে এখন পর্যন্ত চুক্তিটি তার ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর খুব সামান্যই অর্জন করতে পেরেছে।
ইরানের ধর্মতান্ত্রিক (থিওক্রেটিক) সরকার এখনো বহাল রয়েছে। তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ হয়নি। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতও আগের মতো রয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি তাদের সমর্থনও অব্যাহত আছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা (অ্যাপ্রুভাল রেটিং) ধীরে ধীরে কমতে শুরু করায় ভ্যান্স এক ধরনের জটিল রাজনৈতিক অবস্থানে পড়েছেন। একদিকে তাকে প্রেসিডেন্টের নীতির পক্ষে শক্ত অবস্থান নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনা অক্ষুণ্ণ রাখতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন থেকে কিছুটা দূরত্বও বজায় রাখতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কিছু ইতিবাচক সূচকের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন, ‘এখনো অনেক কাজ বাকি’। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ওপর আস্থা রাখুন। তিনি আমেরিকান জনগণের জন্য ক্ষতিকর কোনো চুক্তি করবেন— এমন ধারণা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে রক্ষণশীল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মেগিন কেলিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ইরান সংকট থেকে নিজেকে দূরে রাখা রাজনৈতিকভাবে অপরিণত আচরণ হতো। তিনি দাবি করেন, আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার সিদ্ধান্ত তিনি সচেতনভাবেই নিয়েছেন।
একই সাক্ষাৎকারে যুদ্ধপন্থি রক্ষণশীলদের কড়া সমালোচনা করে ভ্যান্স বলেন, তারা সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে চান ‘যতক্ষণ না শেষ বোমাটি ফেলা হচ্ছে কিংবা শেষ ইরানি নাগরিকটি মারা যাচ্ছে’।
রিপাবলিকানদের ভেতরেও মতভেদ
জে ডি ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাত্রা বাড়ানোর বিরোধিতা করে আসছেন। বরং তিনি ট্রাম্পকে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ক্রমবর্ধমান সেই অংশের তিনি অন্যতম মুখ, যারা মনে করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা কমানো উচিত।
তবে এই অবস্থানের জন্য তাকে সমালোচনারও মুখে পড়তে হচ্ছে। ডানপন্থি গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বেন শাপিরো বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজে বলেন, ‘আমার মতে, এই আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যথাযথভাবে সহায়তা করতে পারেননি।’
কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী এ ধরনের হাই-প্রোফাইল আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর। কিন্তু ট্রাম্প দৃশ্যত রুবিওর পরিবর্তে ভ্যান্সকেই সামনে নিয়ে এসেছেন। ফলে প্রশাসনের ভেতরে রুবিওর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যদিও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও এবং পুরো প্রশাসন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পেছনে শতভাগ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।’ এ ছাড়া হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে কেউই বর্তমান সাময়িক শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করেননি।
মার্কো রুবিওকেও ২০২৮ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট মনোনয়নের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তিনি কিংবা ভ্যান্স— কেউই এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি।
হোয়াইট হাউজের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, ভ্যান্সকে সামনে আনার বিষয়টি আসলে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ। তার ভাষায়, ‘এই টানাপোড়েন অনেককে বিভ্রান্ত করছে। কিন্তু ট্রাম্প জানেন তিনি কী করছেন। তিনি কার্যত বাস্তব সময়েই নিজের দলের সম্ভাব্য নেতাদের অডিশন নিচ্ছেন।’
এরই মধ্যে সমানতালে চলছে ভ্যান্সের বইয়ের প্রচারণা। প্রায় প্রতিটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দিনের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি তিনি নিজের বইয়ের কথাও তুলে ধরছেন।
গত মঙ্গলবার এবিসি নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য ভিউ’-এ ইরান, অভিবাসন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে একের পর এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হন জে ডি ভাইস প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সেখানেও রসিকতা বজায় রেখে তিনি বলেন, ‘চলুন বইয়ের ব্যাপারে কথা বলি— আমি তো আসলে এখানে বই বিক্রি করতেই এসেছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এখন পর্যন্ত তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দায়িত্বের মুখোমুখি। ইরানের সঙ্গে প্রায় চার মাস ধরে চলা সংঘাতের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ তিনি। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে অনেকেই মনে করছেন, এই দায়িত্বে তার সফলতা কিংবা ব্যর্থতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নয়, হোয়াইট হাউসের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভাগ্যও নির্ধারণ করতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সাময়িক শান্তি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে, যার ফলে আপাতত দুই পক্ষের সরাসরি বৈরিতার অবসান ঘটেছে। তবে মূল সংকটের জায়গাগুলো এখনো অমীমাংসিত। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাদের সমর্থন এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে চূড়ান্ত সমাধান খুঁজতে আলোচনার জন্য দুই পক্ষ ৬০ দিনের সময় নিয়েছে।
এই আলোচনা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। একই সঙ্গে এটি ভ্যান্সের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্যও বড় ধরনের পরীক্ষা। পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। আলোচনায় অংশ নিতে বৃহস্পতিবার রাতে সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল ভ্যান্সের। তার জন্য নির্ধারিত ফ্লাইটও প্রস্তুত ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই সফর বাতিল করা হয়। যদিও হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি দল এখনো সুইজারল্যান্ডে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এমন দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে ভ্যান্সের নতুন বই ‘কমিউনিয়ন’। ক্যাথলিক ধর্মে তার দীক্ষাগ্রহণ ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর লেখা বইটির প্রচারণা উপলক্ষ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন তিনি। এসব সাক্ষাৎকারে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ইরান চুক্তির অন্যতম প্রধান সমর্থক এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও নিজেকে তুলে ধরছেন।
পুরো বিষয়টি অনেকটা নির্বাচনি প্রচারণার আবহ তৈরি করেছে। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে ভ্যান্স সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে প্রশাসনের আশাবাদের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতির বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম কঠোর সমালোচনাও করেন। তবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন কি না— এমন প্রশ্ন এলে কৌশলে সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চালচিত্র— লাভবান ইরান, শঙ্কিত প্রতিদ্বন্দ্বীরাসংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স বলেন, ‘ইরানিরা যদি তাদের আচরণ পরিবর্তন না করে, তাহলে তাদের সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর যদি তারা আচরণ পরিবর্তন করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং ইরানের জনগণের জন্যও তা আমূল পরিবর্তন বয়ে আনবে।’
রয়টার্সের বলছে, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও ইরান আলোচনায় ভ্যান্সের ভূমিকার গুরুত্ব নিয়ে জোরালো আলোচনা চলছে। দলের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রভাবশালী নেতা এবং দক্ষিণ ক্যারোলিনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম তাকে এই শান্তি উদ্যোগের ‘স্থপতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। গ্রাহামের মতে, চূড়ান্ত কোনো চুক্তি হলে সেটি অনুমোদনের জন্য সিনেটে উপস্থাপনের দায়িত্বও ভ্যান্সের নেওয়া উচিত।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে নিজস্ব ভঙ্গিতে রসিকতা করতেও ছাড়েননি। বুধবার ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘যদি এটি সফল হয়, তাহলে সব কৃতিত্ব আমি নেব। আর যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে সব দোষ জেডির ঘাড়ে চাপাব।’ ট্রাম্পের মন্তব্যে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। যদিও এ বিষয়ে ভ্যান্সের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ট্রাম্পের পক্ষে ঢাল
ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার ভাষায় ‘চিরতরে যুদ্ধের অবসান’ ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার নির্দেশ দেন।
ট্রাম্পের কিছু রিপাবলিকান মিত্র অভিযোগ করেছেন, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা কমাতে তিনি তেহরানের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন। যদিও ট্রাম্প বর্তমান সাময়িক শান্তি চুক্তিকে বড় ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরছেন, সমালোচকদের মতে এখন পর্যন্ত চুক্তিটি তার ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর খুব সামান্যই অর্জন করতে পেরেছে।
ইরানের ধর্মতান্ত্রিক (থিওক্রেটিক) সরকার এখনো বহাল রয়েছে। তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ হয়নি। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতও আগের মতো রয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি তাদের সমর্থনও অব্যাহত আছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা (অ্যাপ্রুভাল রেটিং) ধীরে ধীরে কমতে শুরু করায় ভ্যান্স এক ধরনের জটিল রাজনৈতিক অবস্থানে পড়েছেন। একদিকে তাকে প্রেসিডেন্টের নীতির পক্ষে শক্ত অবস্থান নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনা অক্ষুণ্ণ রাখতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন থেকে কিছুটা দূরত্বও বজায় রাখতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কিছু ইতিবাচক সূচকের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন, ‘এখনো অনেক কাজ বাকি’। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ওপর আস্থা রাখুন। তিনি আমেরিকান জনগণের জন্য ক্ষতিকর কোনো চুক্তি করবেন— এমন ধারণা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে রক্ষণশীল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মেগিন কেলিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ইরান সংকট থেকে নিজেকে দূরে রাখা রাজনৈতিকভাবে অপরিণত আচরণ হতো। তিনি দাবি করেন, আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার সিদ্ধান্ত তিনি সচেতনভাবেই নিয়েছেন।
একই সাক্ষাৎকারে যুদ্ধপন্থি রক্ষণশীলদের কড়া সমালোচনা করে ভ্যান্স বলেন, তারা সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে চান ‘যতক্ষণ না শেষ বোমাটি ফেলা হচ্ছে কিংবা শেষ ইরানি নাগরিকটি মারা যাচ্ছে’।
রিপাবলিকানদের ভেতরেও মতভেদ
জে ডি ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাত্রা বাড়ানোর বিরোধিতা করে আসছেন। বরং তিনি ট্রাম্পকে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ক্রমবর্ধমান সেই অংশের তিনি অন্যতম মুখ, যারা মনে করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা কমানো উচিত।
তবে এই অবস্থানের জন্য তাকে সমালোচনারও মুখে পড়তে হচ্ছে। ডানপন্থি গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বেন শাপিরো বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজে বলেন, ‘আমার মতে, এই আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যথাযথভাবে সহায়তা করতে পারেননি।’
কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী এ ধরনের হাই-প্রোফাইল আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর। কিন্তু ট্রাম্প দৃশ্যত রুবিওর পরিবর্তে ভ্যান্সকেই সামনে নিয়ে এসেছেন। ফলে প্রশাসনের ভেতরে রুবিওর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যদিও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও এবং পুরো প্রশাসন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পেছনে শতভাগ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।’ এ ছাড়া হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে কেউই বর্তমান সাময়িক শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করেননি।
মার্কো রুবিওকেও ২০২৮ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট মনোনয়নের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তিনি কিংবা ভ্যান্স— কেউই এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি।
হোয়াইট হাউজের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, ভ্যান্সকে সামনে আনার বিষয়টি আসলে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ। তার ভাষায়, ‘এই টানাপোড়েন অনেককে বিভ্রান্ত করছে। কিন্তু ট্রাম্প জানেন তিনি কী করছেন। তিনি কার্যত বাস্তব সময়েই নিজের দলের সম্ভাব্য নেতাদের অডিশন নিচ্ছেন।’
এরই মধ্যে সমানতালে চলছে ভ্যান্সের বইয়ের প্রচারণা। প্রায় প্রতিটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দিনের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি তিনি নিজের বইয়ের কথাও তুলে ধরছেন।
গত মঙ্গলবার এবিসি নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য ভিউ’-এ ইরান, অভিবাসন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে একের পর এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হন জে ডি ভাইস প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সেখানেও রসিকতা বজায় রেখে তিনি বলেন, ‘চলুন বইয়ের ব্যাপারে কথা বলি— আমি তো আসলে এখানে বই বিক্রি করতেই এসেছি।’

সুইজারল্যান্ডে ইরানি ও মার্কিন আলোচনাকারীদের মধ্যে শুক্রবার পূর্বনির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় চার মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে (এমওইউ) একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপান্তরের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই আলোচনার সময়সূচি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছ
১৮ ঘণ্টা আগে
আইসিপির তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বেশ কিছু ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় অনেক বিদেশি নাগরিক নির্ধারিত সময়ে নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। মানবিক বিবেচনায় তাদের ওপর আরোপিত ওভারস্টে জরিমানা সাময়িকভাবে মওকুফ করা হয়েছিল।
১৯ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান চূড়ান্ত এবং অপরিবর্তনীয়। কোনো পরিস্থিতিতেই সেই অবস্থানের পরিবর্তন ঘটবে না।
১৯ ঘণ্টা আগে
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের কাফার তিবনিত গ্রামে রাতভর হিজবুল্লাহর হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা পর একই এলাকায় আরও পাঁচ সেনা আহত হয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে