সুইজারল্যান্ড বৈঠক বাতিল, অনিশ্চয়তায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার সময়সূচি

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ১৮: ৩৬
লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরান যুদ্ধবিরোধী এক সমাবেশে অংশ নিয়ে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি দুই হাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ধরে আছেন। ফাইল ছবি

সুইজারল্যান্ডে ইরানি ও মার্কিন আলোচনাকারীদের মধ্যে শুক্রবার পূর্বনির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় চার মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে (এমওইউ) একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপান্তরের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই আলোচনার সময়সূচি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা চলমান থাকায় এই আলোচনা জটিলতার মুখে পড়তে পারে। সেখানে হিজবুল্লাহ গেরিলাদের লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীর অন্যতম প্রাণঘাতী হামলায় তাদের চার সেনা নিহত হয়েছেন।

চলতি সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের দ্বারা স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য তোলা রাখা হয়েছে। এর ফলে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে অথবা এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে উভয় পক্ষ ৬০ দিন সময় পাবে।

সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি রিসোর্ট বুর্গেনস্টকে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু করার সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। তবে বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সেখানে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করার কথা জানানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

এর আগে বৃহস্পতিবার, তেহরানের মনোভাব সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানায়, ইরানের প্রধান আলোচনাকারী মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও এই বৈঠকে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না।

এদিকে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুধুমাত্র সবচেয়ে কঠিন ও জটিল বিষয়গুলোই যে অমীমাংসিত রয়ে গেছে তা নয়, বরং লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাতও একটি স্থায়ী চুক্তি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন এই চুক্তি অনুযায়ী— যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

তবে এই আলোচনা থেকে বাইরে থাকা ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা এই চুক্তির কোনো পক্ষ নয়। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে লেবাননে সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমলেও, পরবর্তীতে তা আবার বেড়ে গেছে।

আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা সুইজারল্যান্ডের

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও লেবাননে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত অন্তত ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। যুদ্ধে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল, যদিও চলতি সপ্তাহে তেলের দাম কিছুটা কমেছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছে উজ্জ্বল হয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হতো, যা যুদ্ধের সময় ইরান অবরুদ্ধ করে রেখেছিল।

চলতি সপ্তাহের চুক্তির পর ইরান জানিয়েছে, তারা কারিগরি আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত। এই চুক্তির মাধ্যমে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অন্তত ৬০ দিন বাড়ানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, আলোচনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়া মাত্রই ভ্যান্স এবং মার্কিন প্রতিনিধি দল রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তবে এই আলোচনার লজিস্টিকস বা ব্যবস্থাপনা কখনোই সহজ বা আগে থেকে অনুমান করার মতো ছিল না।’ ইরানের সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এই বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ড এই আলোচনা সহজতর করতে এখনও প্রস্তুত এবং এর প্রাসঙ্গিক প্রস্তুতিমূলক কাজ অব্যাহত রয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা আগে জানিয়েছিলেন যে, তারা সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছিল, উভয় দেশের প্রেসিডেন্ট চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর এমন অনুষ্ঠানের কোনো প্রয়োজন নেই।

লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার অভিযোগ সমালোচকদের

আগামী নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের কাছে অপ্রিয় হয়ে ওঠা এই যুদ্ধ বন্ধ করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছে অনেক বেশি ছাড় দিয়েছেন কি না— তা নিয়ে ওয়াশিংটনে কংগ্রেসে তার রিপাবলিকান মিত্রদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন।

গত মার্চ মাসে ট্রাম্প স্পষ্ট বলেছিলেন যে, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া তিনি এই যুদ্ধ শেষ করবেন না। কিন্তু ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে উলটো দেশটির ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, শত শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করা এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর অবিলম্বে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মওকুফের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প ‘হতাশ ও মরিয়া হয়ে’ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আসন্ন আলোচনা সহজ হবে না— যা ছিল ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরু করার অন্যতম ঘোষিত কারণ। একটি বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমেরিকান পক্ষ যদি খুব বেশি দাবি খাটাতে চায়, তবে আমরা তা মেনে নেব না।’

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ‘অবিশ্বস্ত’ আমেরিকান পক্ষের যেকোনো চুক্তি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সমমানের জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তারা বলেছে, জাতির পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ‘নমনীয়তা’ দেখানো হবে না।

এই চুক্তি অনুযায়ী, আলোচনার টেবিলে থাকা প্রতিনিধিরা যদি মেয়াদ বাড়াতে সম্মত না হন, তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এবং ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল ও অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হতে তারা ৬০ দিন সময় পাবেন।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ওপরও সীমাবদ্ধতা আরোপের চেষ্টা করবে।

এদিকে ইরান যুদ্ধে মার্কিন ক্রমবর্ধমান ব্যয়ও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর আইন প্রণেতাদের বলেছে যে, এই যুদ্ধের খরচ এবং কিছু বিল মেটানোর জন্য তাদের অতিরিক্ত ৮০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।

মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, এই আলোচনা থেকে এখনও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি শক্তিশালী চুক্তি বেরিয়ে আসতে পারে। এর লক্ষ্য হলো ২০১৫ সালে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে হওয়া চুক্তিটির চেয়ে আরও উন্নত কিছু করা, যা ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বাতিল করেছিলেন।

তবে সমালোচকরা বলছেন, ইরান এখন আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। কারণ তারা একটি পরাশক্তির আক্রমণ প্রতিহত করেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করেছে এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মূল্যবান মওকুফ সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

হিজবুল্লাহর হামলায় ইসরায়েলি ব্যাটালিয়ন প্রধানসহ ৪ সেনা নিহত

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের কাফার তিবনিত গ্রামে রাতভর হিজবুল্লাহর হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা পর একই এলাকায় আরও পাঁচ সেনা আহত হয়েছে।

৮ ঘণ্টা আগে

নাইজারের বিমানবন্দরে অস্ত্রধারীদের হামলা, ১১ সেনাসহ নিহত ৩৫

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো বড় হামলার শিকার হলো। আল-কায়েদার আঞ্চলিক শাখা ‘জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন’ (জেএনআইএম) হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে বার্তা দিয়েছে। তবে সরকার এখনো সেই দাবির সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

১১ ঘণ্টা আগে

ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনায় আকুণ্ঠ সমর্থন হিলারির!

নিজের লেখা এক মতামত নিবন্ধে হিলারি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ২০ দফা গাজা পরিকল্পনা নিখুঁত নয়, এতে অনেক বিতর্কিত বিষয় রয়েছে। তারপরও বর্তমানে এটিই একমাত্র কার্যকর কাঠামো, যার মাধ্যমে গাজা সংকট থেকে বের হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিকল্প কোনো কার্যকর পরিকল্পনা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে

১৪ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চালচিত্র— লাভবান ইরান, শঙ্কিত প্রতিদ্বন্দ্বীরা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তিটিকে এর সমর্থকরা ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ (ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি) হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তেহরানের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে— ইসরায়েল থেকে শুরু করে উপসাগরীয় দেশ এবং লেবাননের বিভিন্ন গোষ্ঠী— এটি বরং ‘শতাব্দীর অভিশাপ’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ত

১৫ ঘণ্টা আগে