যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চালচিত্র— লাভবান ইরান, শঙ্কিত প্রতিদ্বন্দ্বীরা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
গত এপ্রিলে তেহরানে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে অংশ নিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন ইরানি নারীরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তিটিকে এর সমর্থকরা ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ (ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি) হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তেহরানের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে— ইসরায়েল থেকে শুরু করে উপসাগরীয় দেশ এবং লেবাননের বিভিন্ন গোষ্ঠী— এটি বরং ‘শতাব্দীর অভিশাপ’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এই চুক্তির ফলে ইরান আরও বেশি নিরাপদ, বৈধ ও শেষ পর্যন্ত আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, প্রায় চার মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে গত বুধবার অনলাইনে এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্ট সরাসরি চুক্তিতে সই করলেন।

ট্রাম্প চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের জন্য জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদকে বেছে নেন— যাকে যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের একটি প্রতীকী পটভূমি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৪ দফার এই চুক্তিটি লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়িয়েছে, যাতে স্থায়ী একটি সমাধানের জন্য আলোচনা চালানো যায় এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়।

লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সারকিস নাওম বলেন, “ওয়াশিংটন এবং তেহরানের জন্য এটি একটি বড় ধরনের বোঝাপড়া— ফিরে আসার পথহীন শতাব্দীর সেরা চুক্তি। এখানে ব্যর্থতার ঝুঁকির চেয়ে সফলতার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ ইরান নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আর অর্থনৈতিক বিপর্যয় সহ্য করার মতো অবস্থায় নেই, আর ট্রাম্পেরও নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করার কোনো আগ্রহ নেই।”

ইসরায়েলের জন্য বড় ধাক্কা

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ এই চুক্তিকে একটি কৌশলগত ‘মহাবিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে দুর্বল বা উৎখাত করার জন্য যেটিকে একটি যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, তা এখন তার দৃষ্টিতে ইরানের প্রতি মার্কিন স্বীকৃতির রূপ নিয়েছে।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ইরান গবেষক সিট্রিনোভিচ বলেন, “আমরা মার্কিন সমর্থনে ইরানের শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে গিয়েছিলাম, আর শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন কার্যকরভাবে সেই একই শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দিল এবং শক্তিশালী করল, যাকে আমরা পতন করতে চেয়েছিলাম।”

তার মতে, এই চুক্তি ইসরায়েলের মূল দাবিগুলোর একটিও পূরণ করেনি: ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা তাদের প্রক্সি (সহযোগী গোষ্ঠী) শক্তির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করারও কোনো স্পষ্ট পথ রাখা হয়নি। এমনকি লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও ইরানের জেদের কারণে আরোপিত যুদ্ধবিরতি কাঠামোর মাধ্যমে সীমিত হয়ে পড়েছে।

এর প্রভাব রাজনৈতিক ও কৌশলগত— উভয় ক্ষেত্রেই পড়েছে মনে মনে করেন গবেষক সিট্রিনোভিচ। তিনি বলেন, এই চুক্তি ইরান নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর এতদিনের বক্তব্যকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং ইসরায়েলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর তার প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে দিয়েছে।

সিট্রিনোভিচ বলেন, ইরান এখন কৌশলগতভাবে চাল চালার বাড়তি সুযোগ পেয়ে গেছে এবং এই চুক্তি ইসরায়েলকে আরও বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি ইরানের অবস্থানকে আরও সুসংহত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। তিনি অকপটে বলেন, “সবকিছুই খারাপ হয়েছে। এবং পরিস্থিতি কেবল আরও খারাপের দিকেই যাবে।”

রয়টার্স বলছে, যদি এই চুক্তি বজায় থাকে, তবে ইরানই সবচেয়ে শক্তিশালী ফলাফল লাভ করছে বলে প্রতীয়মান হয়: যুদ্ধের অবসান, পর্যায়ক্রমে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, পুনরায় তেল রপ্তানি শুরু এবং বিপুল পরিমাণ পুনর্গঠন তহবিল পাওয়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের পরোক্ষ স্বীকৃতি।

বিপরীতে, ওয়াশিংটন তার এবং ইসরায়েলের যৌথ লক্ষ্যগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়েছে— যার মধ্যে ছিল ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো, পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা এবং আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করা। ইরানের অবস্থান পুনর্গঠন করার পরিবর্তে, এই চুক্তি দেশটির আগের অবস্থানকেই ফিরিয়ে এনেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, যার প্রথম দিনগুলোতেই ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্যান্য জেষ্ঠ্য নেতা নিহত হন। পরবর্তীতে এই সংঘাত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যাতে মূলত ইরান ও লেবাননে ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ জ্বালানির বৈশ্বিক মূল্য বাড়িয়ে দেয় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি করে।

লেবাননে সুবিধাজনক অবস্থানে ইরান

লেবাননের জন্য এই চুক্তিটি ক্ষমতার ভারসাম্যকে ইরানের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে। এটি তেহরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং বৈরুত-ইসরায়েল আলোচনাকে একপাশে সরিয়ে লেবাননকে একটি বৃহত্তর মার্কিন-ইন্টারনাল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।

চুক্তিটি লেবাননকে এই ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত করেছে, যার ফলে সব পক্ষ সব ফ্রন্টে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে বাধ্য।

গত সপ্তাহে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সতর্ক করে বলেছিলেন যে যুদ্ধবিরতি এবং দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মতো বিষয়ে লেবাননের পক্ষে ইরান আলোচনা করতে পারে না।

তবে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো উলটো যুক্তি দিচ্ছে। তাদের মতে, মার্কিন এবং ইরানি সমঝোতার এই পথটি লেবাননকে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় উন্নীত করে তার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। তাদের দৃষ্টিতে, তেহরান এবং ওয়াশিংটন এখন তাদের নিজ নিজ মিত্র— হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলকে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর জন্য চাপ দিতে পারবে।

সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে, যেখানে ইরানি হামলা দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা নাড়িয়ে দিয়েছে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এই যুদ্ধের প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে— যারা তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার রূপবদলকারী সিদ্ধান্তের কেবল নীরব দর্শক হয়ে রইল এবং এখন এর ধাক্কা সামলাতে বাধ্য হচ্ছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের সূত্রগুলো বলছে, এই চুক্তি ইতোমধ্যে তাদের কৌশলগত চিন্তাভাবনাকে বদলে দিচ্ছে: মার্কিন সুরক্ষার ওপর আস্থা কমছে, ইরানকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে এবং সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতার দিকে যাওয়ার প্রবণতা ত্বরান্বিত হচ্ছে।

তবে ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো আলেক্স ভাতানকা এই ধরনের আতঙ্ককে নাকচ করে দিয়েছেন। একে আত্মসমর্পণ হিসেবে না দেখে তিনি মনে করেন, বছরের পর বছর ধরে ব্যর্থ জবরদস্তিমূলক নীতির পর এটি ছিল সবচেয়ে কম ক্ষতিকারক ফলাফল।

ভাতানকা বলেন, “তারা সামরিকভাবে ইরানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা পারেনি। এর বিকল্প হতে পারত মারাত্মক বিপর্যয়কারী— একটি বিস্তৃত যুদ্ধ কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলকে ধ্বংস করে দিতে পারত।”

তিনি আরও বলেন, আসল পরীক্ষাটি এখনও সামনে রয়ে গেছে— চুক্তিটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে, অমীমাংসিত পারমাণবিক আলোচনায় এবং এর ফলে আঞ্চলিক যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে তার ওপর। “এটি একটি বড় ঘটনা, তবে এখানেই শেষ নয়। এটি কেবল শুরু মাত্র।”

সমঝোতা ভেস্তে দিতে পারে ইসরায়েল

কিছু বিশ্লেষক ইসরায়েলকে এই চুক্তির প্রধান ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ বা অনিশ্চিত উপাদান হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের নিজস্ব উদ্যোগে শুরু হওয়া একটি প্রক্রিয়াকে ইসরায়েল পুরোপুরি লাইনচ্যুত করতে পারবে না বলে মনে হলেও, বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে— বিশেষ করে লেবানন ফ্রন্টে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইরানি কর্মকর্তা বলেন, “এই যুদ্ধের পর উপসাগরীয় অচল এবং বিশ্ব— উভয় ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ইসরায়েল।”

অন্য একজন ইরানি কর্মকর্তা বলেন, “ইরান যা চেয়েছিল তা পেয়েছে... আমরা আমাদের হিজবুল্লাহর মতো বন্ধুদের ছেড়ে যাইনি, বরং তাদের কারণে আমরা আলোচনার টেবিল থেকে উঠে যেতে এবং পুনরায় যুদ্ধে ফিরে যেতেও প্রস্তুত ছিলাম।”

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মার্কিন হামলার জবাব ইরানের, ফের উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দিনের হামলার জবাব হিসেবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব দেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের ভূখণ্ড ইরানে হামলার জন্য ব্যবহার করা হয়নি।

৭ ঘণ্টা আগে

মাশহাদে চিরনিদ্রায় শায়িত আলি খামেনি, বিদায় জানাতে লাখো মানুষের ঢল

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) মাশহাদের দিকে এগিয়ে যায় খামেনির মরদেহবাহী ট্রাক। রাস্তার দুই পাশে কালো পোশাক পরা লাখো শোকাহত মানুষ ইরানের পতাকা, খামেনির ছবি ও বিপ্লবী স্লোগান লেখা লাল প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ধীরগতিতে এগিয়ে চলা শবযাত্রার সময় পুরো শহরে শোক, ধর্মীয় আবেগ ও প্রতিশোধের আহ্বানের মিশ্র পরিবেশ

১৬ ঘণ্টা আগে

আমিরাতে বিগ টিকেট লটারিতে ১০ লাখ দিরহাম জিতলেন বাংলাদেশি আতিক

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এ খবর দিয়েছে গালফ নিউজ। খবরে বলা হয়েছে, বিগ টিকেট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিজয়ী বাংলাদেশি মোহাম্মদ আতিক হাসানের টিকিট নম্বর ছিল ৩৫৯৬৮৫। তবে তিনি কত দিন ধরে এই ড্রতে অংশ নিচ্ছিলেন বা পুরস্কারের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

১৮ ঘণ্টা আগে

ওয়াশিংটনে কনস্যুলার সেবা নিতে ফি দেওয়া যাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে

দূতাবাস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সারচার্জ বা প্রসেসিং ফি প্রযোজ্য হবে, যা সেবাগ্রহীতাকে বহন করতে হবে। প্রযোজ্য সারচার্জের হার ব্যবহৃত পেমেন্ট পদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

১৮ ঘণ্টা আগে