ট্রাম্পের ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক অবৈধ: আদালত

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৮ মে ২০২৬, ১০: ২১
আদালত ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করেছেন। গ্রাফিক্স: এক্সিওস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঢালাওভাবে আরোপ করা সবশেষ ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছেন দেশটির আদালত। রায়ে বলা হয়েছে, গত শতকের সত্তরের দশকের বাণিজ্য আইন ব্যবহার করে আরোপিত এই শুল্ক অযৌক্তিক। কংগ্রেসের সরাসরি অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যযুদ্ধ চালাতে গিয়ে ট্রাম্প আইন লঙ্ঘন করেছেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৮ মে) যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত এ বিভক্ত রায় ঘোষণা করেন। দুজন বিচারক ট্রাম্পের এ শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করলেও একজন এতে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন।

বিভক্ত রায়ে আদালত বলেন, ট্রাম্প ফেব্রুয়ারি থেকে যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা করতে তিনি কয়েক দশক পুরোনো একটি বাণিজ্য আইন ভুলভাবে ব্যবহার করেছেন। এর আগে তার আরোপ করা আগের দফার কঠোর শুল্ক মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছিল।

এই রায় আপাতত ট্রাম্পের বাণিজ্যিক ক্ষমতার ওপর নতুন সীমা আরোপ করল বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প তার মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনর্গঠন, রাজস্ব বৃদ্ধি ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনতে ‘শুল্ক আগ্রাসন’ চালিয়ে আসছিলেন, যা রীতিমতো শুল্কযুদ্ধে রূপ নেয়।

এদিকে আদালত ট্রাম্পের শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করলেও সরাসরি শুধু সেই ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অঙ্গরাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে শুল্ক আদায় বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, যারা এই শুল্কের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছিল। হোয়াইট হাউজ কীভাবে এ রায় ব্যাখ্যা করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে প্রশাসন যে আপিল করবে, তা প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে।

চীন সফরের আগেই বড় ধাক্কা

আগামী সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ইস্যুতে বৈঠকের জন্য ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। এর আগে এ রায়কে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কারণ জিনপিং-ট্রাম্প বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে শুল্ক, আর আদালতের এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল করতে পারে।

এ ছাড়া এ রায়ের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে আবারও অবৈধভাবে আদায় করা শুল্ক ফেরত দিতে হতে পারে। এরই মধ্যে ট্রাম্পের আগের বিস্তৃত শুল্কনীতির আওতায় আদায় হওয়া প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলার ফেরতের প্রক্রিয়া চলছে।

রায়ের পর হোয়াইট হাউজ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে পরে ট্রাম্প বিচারকদের সমালোচনা করে বলেন, তার প্রশাসন বাণিজ্যযুদ্ধের পরিকল্পনা থেকে সরে আসবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় অন্য পথ খুঁজে নিই। একটি রায় আসে, আর আমরা ভিন্নভাবে কাজ করি।’

‘সেকশন ১২২’ ঘিরে আইনি লড়াই

শুরু থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন এই সার্বিক শুল্ককে সাময়িক সমাধান হিসেবে দেখছিল, যেন অন্য আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ শুল্ক আরোপের সময় পাওয়া যায়। সেই প্রক্রিয়া এখনো চলছে এবং তা গত বছর ঘোষিত জরুরি অর্থনৈতিক আইনের শুল্কহারগুলোর কাছাকাছি নতুন হার আনতে পারে।

ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট আগের শুল্ক বাতিল করার পর হোয়াইট হাউজ দ্রুত ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ‘সেকশন ১২২’ ব্যবহার করে নতুন শুল্ক আরোপ করে। এর আগে কখনো এ ধারাটি ব্যবহার করা হয়নি। এই ধারায় ‘যুক্তরাষ্ট্রের বড় ও গুরুতর পরিশোধ ভারসাম্য ঘাটতি’ বা ‘আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের মৌলিক সংকট’ দেখা দিলে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

এ বিধান তৈরি হয়েছিল এমন একসময়ে, যখন মার্কিন ডলারের মূল্যমান সোনার দামের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এখন ডলার আর সোনার সঙ্গে সংযুক্ত নয়।

এ কারণেই কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চলতি বসন্তে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় তারা দাবি করেন— ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের জন্য আইনে নির্ধারিত শর্ত ট্রাম্প পূরণ করতে পারেননি।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

গত মাসে প্রায় তিন ঘণ্টার উত্তপ্ত ও অত্যন্ত কারিগরি শুনানিতে আদালতের বিচারকরা ১৯৭৪ সালে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্য ও অর্ধশতাব্দী পর ট্রাম্প কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

৫৩ পৃষ্ঠার রায়ে তিন বিচারকের মধ্যে দুজন শেষ পর্যন্ত মত দেন, সেকশন ১২২ প্রয়োগের জন্য আইনে নির্ধারিত শর্ত ট্রাম্প পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিচারকরা বলেন, আইনটির ইতিহাস দেখায় যে আইনপ্রণেতারা প্রেসিডেন্টের বাণিজ্যিক ক্ষমতা ‘সতর্কভাবে সীমাবদ্ধ’ রাখতে চেয়েছিলেন।

ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী লিবার্টি জাস্টিস সেন্টারের লিটিগেশন পরিচালক জেফ্রি সোয়াব বলেন, সেকশন ১২২ একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সংকট মোকাবিলার জন্য তৈরি হয়েছিল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ও সোনার রিজার্ভ কমে যাচ্ছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সেটি নয়।

এটি ছিল লিবার্টি জাস্টিস সেন্টারের দ্বিতীয় বড় জয়। এর আগেও তারা ট্রাম্পবিরোধী একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্টে জয় পেয়েছিল। যদিও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যও মামলায় যুক্ত হয়েছিল। শুক্রবার আদালত বলেছেন, সেকশন ১২২ ব্যবহারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাতে অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যের আইনগত অবস্থান ছিল না।

ড্যান রেফিল্ড এক বিবৃতিতে বলেন, যতদিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবৈধভাবে ওরেগনের জনগণের ওপর কর চাপানোর চেষ্টা করবেন, আমরা তা ঠেকাতে আদালতে যাব।

‘প্ল্যান সি’ নিয়ে এগোচ্ছে প্রশাসন

কিং অ্যান্ড স্পল্ডিংয়ের অংশীদার রায়ান ম্যাজেরাস বলেন, আদালতের সেকশন ১২২ ধারার বিস্তৃত ব্যাখ্যা নিয়ে স্পষ্ট উদ্বেগ ছিল। তার ধারণা, শুল্ক ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হলে তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে।

এদিকে প্রশাসন এরই মধ্যে নতুন শুল্ক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যদিও তা তাৎক্ষণিক কার্যকর করা সম্ভব নয়। তারা ‘সেকশন ৩০১’ নামে আরেক আইনি ধারার অধীনে দুটি বাণিজ্য তদন্ত শুরু করেছে, যেখানে একটি জোর করে শ্রমে তৈরি পণ্যের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক আইনের বিষয়ে, অন্যটি বিদেশি উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে।

ওয়াশিংটনে এ নিয়ে গত ও চলতি সপ্তাহে শুনানি হয়েছে। তবে প্রশাসন আশা করেছিল, সেকশন ১২২-এর শুল্ক জুলাই পর্যন্ত বহাল থাকবে। বিকল্প শুল্ক কার্যকর হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

ওয়াইলি রেইনের আইনজীবী টিমোথি সি ব্রাইটবিল বলেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত সেকশন ১২২ শুল্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান। তবে তিনি যোগ করেন, প্রশাসন অবশ্যই এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবে। একই সঙ্গে ‘প্ল্যান সি’ও প্রস্তুত রয়েছে— চলমান সেকশন ৩০১ তদন্ত, যা সম্ভবত জুলাইয়ে নতুন শুল্ক ঘোষণার পথ তৈরি করবে।

বৃহস্পতিবার ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এ রায় দেন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত। এসব প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। এর আগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয় এই শুল্ক। তিন বিচারকের বেঞ্চে ২-১ ভোটে হয় এ রায়।

শুনানিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তি দেয়, নতুন এই শুল্ক আরোপের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়কে উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ওই রায়ে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে আরোপ করা ট্রাম্পের শুল্ক বাতিল করে আদালত।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া শুল্ক আদেশে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারা ব্যবহার করেন ট্রাম্প। এই ধারায় গুরুতর লেনদেনের ভারসাম্য ঘাটতি মোকাবিলায় বা ডলারের আসন্ন অবমূল্যায়ন ঠেকাতে সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য শুল্ক আরোপের সুযোগ রয়েছে।

তবে গতকালের রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, ট্রাম্প তার আদেশে যে ধরনের বাণিজ্য ঘাটতির কথা বলেছেন, সেসব ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ উপযুক্ত ছিল না।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বার্লিনের জঙ্গলে অস্ত্রের গোপন ভাণ্ডার, রুশ গোয়েন্দা সংযোগের সন্দেহ

ডোব্রিন্ট জানান, ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে— এমন গুরুতর সহিংস কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে’ তদন্ত শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাটি জার্মানির বর্তমান ‘উচ্চ ঝুঁকি’র নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে। এতে বিদেশি কোনো শক্তির সম্পৃক্ততা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

৯ ঘণ্টা আগে

স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ফের কারাগারে ইমরান খান

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইমরান খানকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে আবার রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকেরা পরীক্ষার পর তাকে ‘চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ’ ঘোষণা করেছেন।

১৮ ঘণ্টা আগে

ট্রাম্প কি ইরানের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর বাণিজ্য বন্ধ করতে পারবেন

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো দেশ ইরানকে আর্থিক, ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো সহায়তা দিলে সেই দেশকেও ‘প্রচণ্ড অর্থনৈতিক ক্ষতির’ মুখে পড়তে হবে।

২১ ঘণ্টা আগে

কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা: নিহত ১৩, আহত ৩৩

রাশিয়ার এই ভয়াবহ হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক সহায়তার জোর আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, "ইউক্রেন যতদিন পর্যাপ্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা না পাবে, ততদিন রাশিয়া শান্তির বিষয়টি বিন্দুমাত্র গু

২ দিন আগে