অভ্যন্তরীণ বিভেদ আড়ালে ইরানের ব্যাপক প্রোপাগান্ডা, লক্ষ্য ‘জাতীয় ঐক্য’ প্রদর্শন

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
১৮ মে তেহরানে সামরিক যানে চড়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত গণবিয়েতে এসেছে এক ইরানি নবদম্পতি। ছবি: রয়টার্স

মাত্র কয়েক মাস আগেই ‘গণহত্যাকাণ্ডে’র মাধ্যমে তীব্র গণবিক্ষোভ দমন করেছে ইরান সরকার। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক কষ্ট যখন চরমে, ঠিক তখনই দেশটির শাসকগোষ্ঠী তেহরান জুড়ে রাষ্ট্রীয় প্রচারণার (প্রোপাগান্ডা) বিশাল সব পোস্টার সাঁটিয়েছেন। এসব পোস্টারে জাতীয় ঐক্য এবং বিশ্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিজয়ের বড় বড় দাবি করা হচ্ছে।

শুক্রবার (২২ মে) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সদস্য এবং অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালির ছবির পাশাপাশি কর্তৃপক্ষ এখন মসজিদগুলোতে সামরিক ধাঁচের গণবিয়ে এবং জনসাধারণের জন্য অস্ত্র প্রশিক্ষণ সেশনের আয়োজন করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো জনগণের মধ্যে একটি ‘জাতীয় প্রতিরোধ’ বা যুদ্ধের মানসিকতা ফুটিয়ে তোলা।

রয়টার্স বলছে, অতীতের কট্টর ধর্মীয় বা বিপ্লবী বার্তাগুলোর চেয়ে বর্তমানের এই প্রচারণায় ‘জাতীয়তাবাদী’ বিষয়ের ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে কেবল কট্টরপন্থি সমর্থক গোষ্ঠীই নয়, বরং সাধারণ জনগণকেও আকৃষ্ট করা যায়।

আন্তর্জাতিক সংকটের ওপর নজর রাখা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপে’র ইরান বিষয়ক পরিচালক আলী ওয়ায়েজ বলেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পুরনো আদর্শিক চিন্তাভাবনা সমাজের বড় একটি অংশের কাছে এখন আর আগের মতো গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে সাধারণ মানুষকে একত্র বা উদ্বুদ্ধ করতে ইরানি পরিচয়ের অন্যান্য উপাদান বা জাতীয়তাবাদকে সামনে আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।’

তবে গভীরভাবে আশাহত এবং বিক্ষুব্ধ এক জনগোষ্ঠীর কাছে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নিয়ে আলী ওয়ায়েজ এবং অন্যান্য বিশ্লেষকদের মনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

বৈশ্বিক তেল সরবরাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে ইরান মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা মোকাবিলা করতে পেরেছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে। তবে বাইরে সামরিক সাফল্য দেখালেও, দেশের অভ্যন্তরে ইরান এখন এক চরম সংকটের মুখোমুখি।

যুদ্ধের আগে থেকেই দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল, যা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে, নতুন করে যাতে কোনো অভ্যন্তরীণ ‘গণঅসন্তোষ’ তৈরি না হয়, সে জন্য প্রশাসনের দমনপীড়নের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে— যা মূলত কর্তৃপক্ষের ভেতরের ভয়কেই স্পষ্ট করে।

এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মাঝেই ইরান সরকার তাদের পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত প্রচারণামূলক কৌশল অর্থাৎ ‘জাতীয় প্রতিরোধ’ এবং ‘পশ্চিমা খলনায়ক’ তত্ত্ব ব্যবহার করে চলেছে। তবে এবার তারা পুরনো কিছু বিপ্লবী প্রতীক বাদ দিচ্ছে বা এড়িয়ে যাচ্ছে।

বিগত কয়েক দশক ধরে ইরানি প্রচারণার মূল ভিত্তি ছিল শিয়া মুসলিম সংস্কৃতির ‘শাহাদাত বা আত্মত্যাগে’র প্রতীকসমূহ। কিন্তু বর্তমানে সেগুলোর জায়গা দখল করছে প্রাচীন পারস্যের জাতীয় এবং ঐতিহাসিক প্রতীকগুলো, যা একসময় রাজতন্ত্রের আমলের মনে করে ইসলামী প্রজাতন্ত্রে চরম অবজ্ঞা করা হতো।

একই সঙ্গে, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সম্প্রচারে এখন সরকারের পক্ষ থেকে আয়োজিত বিভিন্ন র‍্যালি বা সমাবেশে অংশ নেওয়া অনেক নারীদের সাক্ষাৎকার দেখানো হচ্ছে, যাদের মাথায় হিজাব নেই। ইরানি গণমাধ্যমে এতদিন তা দেখানো নিষিদ্ধ ছিল।

স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট অ্যান্ড্রুজের আধুনিক ইতিহাসের অধ্যাপক আলী আনসারি বলেন, ‘এটি আসলে বিশ্বকে এবং দেশের মানুষকে দেখানোর একটি চেষ্টা যে— ইরানে সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং আমরা আমাদের নিজেদের মানুষকে হত্যা করি না। এটি দ্বিধান্বিত কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা কাজ করবে, তবে বেশিরভাগ ইরানিই এটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে না।’

হরমুজ প্রণালি ও প্রচারণার হাতিয়ার

হরমুজ প্রণালি সফলভাবে বন্ধ করতে পারাটাই ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রচারণার মূল হাতিয়ার, যার মাধ্যমে অনলাইনে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ‘মিম’ তৈরি করা হচ্ছে। একই সাথে দেশের ভেতরেও এই সাফল্যকে বড় করে প্রচার করা হচ্ছে।

তেহরানের একটি পোস্টারে দেখা যাচ্ছে— বিপ্লবী গার্ডের সদস্যরা একটি বড় মাছ ধরার জাল ধরে আছেন, যাতে আমেরিকার যুদ্ধজাহাজ এবং যুদ্ধবিমান আটকে পড়েছে। অন্য একটি পোস্টারে দেখা যায়, ট্রাম্পের মুখের ওপর হরমুজ প্রণালির অবয়ব সংবলিত একটি কাপড় সেলাই বা স্ট্যাপল করে দেওয়া হয়েছে। এই ছবিগুলো মূলত ইরানি বীরত্বগাথা ফুটিয়ে তোলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করার দীর্ঘ ঐতিহ্যেরই অংশ।

তবে অতীত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে তেহরানের আরেকটি বিশাল পোস্টারে দেখা যাচ্ছে— শত বছর আগে ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে ব্রিটিশ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করা গেরিলা নেতা রইস আলী দেলভারি একজন ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কমান্ডারের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তারা দুজনে হাত উঁচিয়ে হরমুজ প্রণালি আগলে রেখেছেন।

ইরানের শিরাজ শহরের ৬৭ বছর বয়সী একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নার্গিস (ছদ্মনাম) নিজের পারিবারিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জাতীয় বীরদের দেখানোর এই ব্যানারগুলো কেবল যুদ্ধকালীন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই যুদ্ধ শেষ হলেই তারা আবার আমাদের ওপর চড়াও হবে এবং নতুন করে দমনপীড়ন শুরু করবে।’

ইরানি কয়েকটি রাজনৈতিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধের সময়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ধর্মীয় আলেম সমাজের হাত থেকে নাটকীয়ভাবে বিপ্লবী গার্ড কমান্ডারদের হাতে চলে গেছে। এটি মূলত গত কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা একটি ধীর পরিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ।

আলী ওয়ায়েজ বলেন, ‘শাসনব্যবস্থা বা সরকার বর্তমানে যেসব ন্যারেটিভ বা প্রচারণামূলক গল্প তৈরি করছে, তা থেকেই স্পষ্ট যে এই ব্যবস্থার মধ্যে একটি বড় রূপান্তর ঘটছে। এটি মূলত একটি থিওক্র্যাটিক বা ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে সামরিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে।’

ইরানি জাতীয় ফুটবল দলের স্যালুট দেওয়ার ছবি কিংবা ইরানের বিশাল জাতীয় পতাকার সাথে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি— সবই এই দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদী প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রোপাগান্ডা নিয়ে সংশয় ও সন্দেহ

আলী ওয়ায়েজ মনে করেন, ইরানের বিভিন্ন অবকাঠামোতে বিমান হামলা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে দেশটির ‘সভ্যতা মুছে দেওয়ার’ হুমকির মতো বিষয়গুলো ইরানের এই নতুন কৌশলকে কিছুটা সফল করতে সাহায্য করেছে।

তিনি বলেন, ‘এই হুমকিগুলো ইরান সরকারকে এটি প্রচার করতে সাহায্য করেছে যে এই যুদ্ধটি কেবল ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে ইরান রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।’

রাস্তায় নিজেদের জনসমর্থন ধরে রাখার জন্য কর্তৃপক্ষ যুদ্ধের সময় প্রায় প্রতি রাতেই সমাবেশের আয়োজন করছে। তবে এই ব্যবস্থার সমর্থক এবং বিরোধী— উভয় পক্ষই এর ফলাফল নিয়ে চরম সন্দিহান।

ইয়াজদ শহরের বাসিন্দা ফরাসি ভাষায় সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা আরশিয়া বলেন, ‘এগুলো সবই একটা নাটক বা অভিনয়, যার উদ্দেশ্য বিশ্বকে দেখানো যে মানুষ সরকারের সাথে আছে। এসব লোকদেখানো প্রদর্শনী না করে তাদের উচিত দেশের ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক করা।’

অন্যদিকে তাবরিজের ২৬ বছর বয়সী কট্টরপন্থি ছাত্র মোহাম্মদের কাছে এই দেশপ্রেমের প্রচারণা বাস্তব মনে হলেও তিনি ক্ষুব্ধ। সমাবেশে পরপুরুষের সাথে হিজাবহীন নারীদের অবাধ মেলামেশা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের দৃশ্য দেখার জন্য তো আর দেশে ইসলামী বিপ্লব হয়নি।’

চলতি সপ্তাহে আয়োজিত একটি গণবিয়েতে দেখা গেছে, নতুন দম্পতিদের বিপ্লবী গার্ডের গাড়িতে করে ঘোরানো হচ্ছে, যে গাড়িগুলো বেলুন এবং মেশিনগান দিয়ে সাজানো। পাশেই রাখা ছিল ব্যালিস্টিক মিসাইলের কিছু ডামি বা মডেল, যেগুলো গোলাপি (ফ্ল্যামিঙ্গো পিঙ্ক) রঙে সজ্জিত।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে মসজিদের ভেতরে অস্ত্র প্রশিক্ষণ সেশন, যেখানে সামরিক প্রসিক্ষরা একই সঙ্গে পুরুষ ও নারীদের অ্যাসাল্ট রাইফেল খোলা এবং গুলি করার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

ইতিহাসবিদ আলী আনসারি মনে করেন, এই ধরনের সামরিক প্রদর্শনী বা ছবি দেখানোর পেছনে একটি দ্বিমুখী উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এটি একদিকে যেমন দেশপ্রেমের জোয়ার তৈরি করছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরের ভিন্নমতাবলম্বীদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে কর্তৃপক্ষের পেছনে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত বড় একটি বাহিনী রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এটি আসলে এই সত্যকেই সামনে আনে যে সরকার নিজেকে যতটা নিরাপদ ও শক্তিশালী দাবি করছে, বাস্তবে তারা ততটা সুরক্ষিত নয়। তারা নিজেদের জনগণের সামনে কেবল এটিই প্রমাণ করতে চাইছে এই সরকার অত্যন্ত কঠোর এবং শক্তিশালী।’

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ভারতে তৃতীয় দফায় বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পরও দীর্ঘদিন খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি না করলেও, শেষ পর্যন্ত ভর্তুকির চাপ সামলাতে না পেরে টানা তিন দফায় লিটারপ্রতি প্রায় ৫ রুপি পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হলো ভারত সরকার।

৫ ঘণ্টা আগে

গ্রিন কার্ডের আবেদনে নতুন নিয়ম, বিপাকে লাখো মার্কিন অভিবাসী

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রক্রিয়াতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যারা গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করছেন, তাদের আবেদনের পুরো প্রক্রিয়াকালীন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকতে হবে।

৫ ঘণ্টা আগে

চীনের কয়লাখনিতে গ্যাস বিস্ফোরণ, ৮ জনের মৃত্যু

শানসি প্রদেশকে চীনের কয়লা খনির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। যদিও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে খনির নিরাপত্তা কিছুটা উন্নত হয়েছে, তবুও নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা না হওয়ায় দেশটিতে এখনও প্রায়ই খনি দুর্ঘটনা ঘটে।

৫ ঘণ্টা আগে

কাতার-পাকিস্তানের মধ্যস্থতা, তবুও ইরানের ওপর হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি সিবিএস নিউজকে বলেন, "ট্রাম্প তার সীমারেখা খুব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছেন: ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না এবং তারা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও রাখতে পারবে না।"

৫ ঘণ্টা আগে