চেকপোস্ট, কূটনৈতিক চুক্তি ও ফি— হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার ইরানের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
এপ্রিলের শেষের দিকে ইরাকের বসরা থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে ভিয়েতনামের পথে রওয়ানা হয় ‘আজিওস ফানুরিওস-১’। ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ইরানের সঙ্গে বিশেষ চুক্তির পরই সেটি গত ১০ মে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। ছবি: রয়টার্স

ট্যাংকারের নাবিকরা সাহস করে ইরানের নির্দেশিত রুট ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছিলেন। উপকূল ঘেঁষে ও দ্বীপভিত্তিক চেকপোস্টগুলোর মাঝখান দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত কৌশলে তারা তাদের বিশাল জাহাজটিকে হরমুজ প্রণালির দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ৩৩০ মিটার দীর্ঘ ‘আজিওস ফানুরিওস-১’ নামের এই ট্যাংকারটি ইরাকি অপরিশোধিত তেল নিয়ে ভিয়েতনামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিল, যা গত এপ্রিলের শেষ দিক থেকে দুবাই উপকূলে আটকা পড়ে ছিল। গত ১০ মে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির পর জাহাজটি হরমুজের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রুট দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার জন্য ইরান যে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, ওই ট্যাংকারটিকে দেওয়া নির্দেশ ছিল তারই অংশ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের ‘ডি ফ্যাক্টো’ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হওয়ায় এ ব্যবস্থার মধ্যে এখন সরকারের সঙ্গে সরকারের (দ্বিপাক্ষিক জি-টু-জি) চুক্তি, ইরান সরকারের কঠোর নিরীক্ষা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরাপদ যাতায়াতের বিনিময়ে বিশেষ ‘ফি’ বা মাশুল দেওয়ার বিষয়গুলো যুক্ত।

ভিয়েতনাম, ইরাক, গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জাহাজটির গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল, যাদের মধ্যে রয়টার্স দুজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। যাত্রাপথে মাঝে মাঝেই জাহাজটির ট্রান্সপন্ডার (অবস্থান নির্ণয়কারী যন্ত্র) বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ‘আজিওস ফানুরিওস-১’ যাত্রা বজায় রাখে। একটি ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঠিক একই দিনে কাছাকাছি আরেকটি জাহাজে প্রজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র বা দূরপাল্লার গোলা) আঘাত হানলে সেটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

গত ১০ মে শেষ রাতের দিকে আবারও ‘আজিওস ফানুরিওস-১’-এর অবস্থান ধরা পড়ে। কিন্তু এক ইরানি কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য বলছে, ট্যাংকারটি যখন হরমুজ অতিক্রম করছিল, তখন ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) স্পিডবোটগুলো সেটিকে থামিয়ে দেয়। প্রণালিতে টহলরত আইআরজিসি সেনাদের যারা শুরুতে জাহাজটিকে যেতে দিয়েছিলেন, তারা এবার জাহাজটিকে নোঙর করার নির্দেশ দেন।

ওই ইরানি কর্মকর্তা জানান, জাহাজটিতে চোরাচালানের পণ্য রয়েছে— এমন সন্দেহে তারা তল্লাশি করতে চেয়েছিলেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর জাহাজটি পুনরায় যাত্রার অনুমতি পায়। এর ফলে সাধারণত যে প্রণালি পার হতে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে জাহাজটিকে দুই দিন চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটাতে হয়।

জাহাজটির ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান ‘ইস্টার্ন মেডিটেরেনিয়ান শিপিং’ এবং এ যাত্রার বিষয়ে অবগত ছয়টি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, এর জন্য কোনো অর্থ বা মাশুল দিতে হয়নি। ইস্টার্ন মেডিটেরেনিয়ানের অপারেশনস ম্যানেজার কনস্টান্টিনোস সাকোলারিডিস রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আমাদের কাছে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে ইরাক ও ভিয়েতনামের চাপের পর ইরান ‘আজিওস ফানুরিওস-১’ পার হওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়েছে বা এড়িয়ে গেছে।”

ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে নৌ রুটে পরিবাহিত হতো, সেই হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় সংকটে ফেলেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান কীভাবে এই কৌশলগত চোকপয়েন্টের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে, তা উন্মোচন করতে রয়টার্স ২০ জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের মধ্যে এশীয় ও ইউরোপীয় শিপিং খাতের সূত্র ছাড়াও রয়েছেন ইরানি ও ইরাকি কর্মকর্তারা। সব সূত্রই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছে।

রয়টার্স একই সঙ্গে ইরানের স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার নথি ও জাহাজগুলোর গতিবিধি বিশ্লেষণ করেছে। এসব তথ্য সম্মিলিতভাবে ইরানের এ কৌশলের একটি বিরল চিত্র তুলে ধরে, যেখানে শক্তিশালী আইআরজিসি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শুরুর দিকে প্রায় দেড় হাজার জাহাজ ও সাড়ে ২২ হাজার নাবিক এই উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা পড়েছিলেন। উপকূল থেকে প্রণালিতে থাকা জাহাজে আঘাত হানার সক্ষমতা থাকার কারণেই ইরান এ অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে। তাদের এই শক্ত অবস্থান বর্তমান পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যাকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ‘বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। জবাবে মার্কিন নৌ বাহিনী প্রণালির বাইরে ইরানি জাহাজ ও কার্গোর ওপর নিজেদের মতো করে অবরোধ আরোপ করেছে।

আজিওস ফানুরিওস-১ ট্যাংকারের সম্ভাব্য গতিপথ। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকায় প্রকৃত গতিপথটি শতভাগ এমন নাও হতে পারে। ছবি: রয়টার্স
আজিওস ফানুরিওস-১ ট্যাংকারের সম্ভাব্য গতিপথ। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকায় প্রকৃত গতিপথটি শতভাগ এমন নাও হতে পারে। ছবি: রয়টার্স

বর্তমানে এই জলপথ দিয়ে খুবই অল্পসংখ্যক জাহাজ যাতায়াত করতে পারছে। মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘সিনম্যাক্স ইন্টেলিজেন্সে’র একটি অপ্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ১৮ এপ্রিল থেকে ৬ মের মধ্যে ৬০টিরও কম জাহাজ হরমুজ পার হতে পেরেছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই রুট দিয়ে যাতায়াত করত, যার অর্ধেকই ছিল তেলবাহী ট্যাংকার।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ইরান সরকারের সঙ্গে যেকোনো ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ। এর বাইরেও অনেক পশ্চিমা দেশেরই ইরানের ওপর নিজস্ব নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ গত ১ মে এক বিবৃতিতে ‘নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ইরান সরকারকে অর্থ প্রদান বা তাদের কাছ থেকে গ্যারান্টি নেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি’ সম্পর্কে সতর্ক করেছে।

রয়টার্স জানতে পেরেছে, ইরানের নতুন এই ব্যবস্থার মধ্যে একটি স্তরভিত্তিক পদ্ধতি রয়েছে, যেখানে তাদের মিত্র রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত জাহাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এরপর রয়েছে ভারতের মতো তেহরানের ঘনিষ্ঠ দেশগুলো এবং সবশেষে রয়েছে সরকার-টু-সরকার চুক্তি, যার মাধ্যমে ‘আজিওস ফানুরিওস-১’-এর মতো জাহাজগুলো পার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, যেকোনো বিদেশি কোম্পানি যদি ইরানের অবৈধ বাণিজ্যকে সহায়তা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এই বিভাগ প্রস্তুত।

তবে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে এ পর্যন্ত কতটি জাহাজ পার হয়েছে, তা রয়টার্স স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি। অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না।

ইউরোপের শিপিং খাতের দুটি সূত্র জানিয়েছে, যেসব জাহাজ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় নেই, তারা হরমুজ দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ইরানি কর্তৃপক্ষকে দেড় লাখ মার্কিন ডলার বা তারও বেশি অর্থ দিচ্ছে। ইরানের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন, জাহাজগুলোর কাছ থেকে নিরাপত্তা ও নেভিগেশন ফি নেওয়া হচ্ছে, যা কার্গোর ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হয়। তবে তারা নির্দিষ্ট কোনো অঙ্কের কথা উল্লেখ না করে বলেছেন, ‘সব দেশকে এই ফি দিতে হয় না।’

হরমুজে ‘নতুন নিয়ম’

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য কোনো দেশের কাছ থেকে ফি আদায় করতে পারে না। তবে নিরাপত্তা বা সেবামূলক কাজের জন্য ফি নেওয়া যেতে পারে, যদি সব দেশের জাহাজের ক্ষেত্রে সমান নিয়ম প্রযোজ্য হয়। এই অর্থপ্রদান এবং যেসব জাহাজ মালিকরা তাদের জাহাজ খালাস করতে ইরানি কর্তৃপক্ষকে অর্থ দিয়েছেন, তাদের নাম অত্যন্ত গোপন রাখা হচ্ছে। কারণ এই লেনদেন মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

এ অর্থ কীভাবে বিনিময় হয়েছে বা ইরানের কোন সংস্থায় গেছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। এ ছাড়া দুটি সামুদ্রিক বিমা বিশেষজ্ঞ সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের অর্থ আইআরজিসির তহবিলে যেতে পারে— এমন আশঙ্কায় বীমা কোম্পানিগুলো ওই সব জাহাজের বীমা কভারেজ বাতিল করতে পারে।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরানবিষয়ক গবেষক ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, এত ঝুঁকি সত্ত্বেও জাহাজ মালিকদের ইরানের সঙ্গে সরাসরি লেনদেনের আগ্রহ প্রমাণ করে, প্রণালিটি এখন সম্পূর্ণভাবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ নৌ পথে। পারস্য উপসাগরে তাই আটকে রয়েছে হাজারও জাহাজ। ছবি: রয়টার্স
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ নৌ পথে। পারস্য উপসাগরে তাই আটকে রয়েছে হাজারও জাহাজ। ছবি: রয়টার্স

সিট্রিনোভিচ বলেন, এই প্রণালি বন্ধ থাকবে নাকি খোলা হবে, তা এখন সম্পূর্ণ ইরানি সরকারের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। কেউ রাজনৈতিক মিত্রতার কারণে পার পাবে, কাউকে অর্থ দিতে হবে, আবার কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এটাই এখন নতুন নিয়ম।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিষয়ে রয়টার্সের অনুসন্ধানের জবাবে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছে এবং ‘প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এ ধরনের ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক আইন ও রীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া উচিত এবং উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আইনি দাবিগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।’

সম্পৃক্ততা যাচাই

ইরানের তিনটি সূত্র ও ইউরোপের শিপিং খাতের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি চুক্তির বাইরে ইরানের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়াটির মধ্যে আইআরজিসির একটি বিস্তারিত যাচাই-বাছাই বা ভেটিং পদ্ধতি জড়িত রয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, আইআরজিসি কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে জমা দেওয়া জাহাজ মালিক বা অপারেটরের ‘অ্যাফিলিয়েশন ডকুমেন্ট’ বা সম্পৃক্ততার নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে।

ইউরোপীয় শিপিং সূত্রটি জানায়, এই যাচাইকরণের মূল উদ্দেশ্য জাহাজটির সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো সংযোগ আছে কি না, তা নিশ্চিত করা।

এ পর্যালোচনায় প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে এবং প্রক্রিয়া চলাকালীন নিরাপত্তাকর্মীরা জাহাজটি শারীরিকভাবে পরিদর্শন করতে চাইতে পারেন। ইরানের ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ কর্তৃক শিপিং খাতে পাঠানো নথি অনুযায়ী, আইআরজিসি জাহাজ মালিকদের কাছ থেকে জাহাজের কার্গোর মূল্য, পতাকা, উৎপত্তিস্থল ও গন্তব্য, নিবন্ধিত মালিক ও ব্যবস্থাপক এবং নাবিকদের জাতীয়তার মতো বিস্তারিত তথ্য দাবি করে।

তিনজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার সঙ্গে পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম অরগানাইজেশন, শিল্প-খনি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিপিং সংস্থা এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নিরাপত্তা তদারককারী দলসহ ইরানের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যুক্ত।

দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো অনুমতির জন্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি এই অনুরোধগুলো সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে পাঠান, যেখানে আইআরজিসি ও সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতিনিধিরা রয়েছেন। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা আইআরজিসিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর আইআরজিসি নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে।’

‘আজিওস ফানুরিওস-১’ জাহাজের ক্ষেত্রে ইরাক সরকার ও তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থা ‘সোমো’ তৎকালীন ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির তত্ত্বাবধানে ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি চূড়ান্ত করেছিল। ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তা জানান, তারা জাহাজটির হরমুজ পার হওয়ার আগেই সেটির পণ্য তালিকা এবং ক্রুদের তথ্য ইরানিদের কাছে পাঠিয়েছিলেন।

অন্যান্য দেশ ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে এ সমস্যার সমাধান করছে। এর মধ্যে ভারত অন্যতম, যারা তাদের প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ ও গ্যাসের ৫০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই হরমুজ দিয়ে আসে। ভারতের শিপিং মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নয়া দিল্লি তেহরানে তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে আইআরজিসি ও ইরানি নৌ বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। সবকিছু যাচাই করার পর জাহাজের ক্যাপ্টেনকে একটি নির্দিষ্ট রুট দেওয়া হয় এবং ইরানি নৌ বাহিনীর নির্দেশনায় জাহাজটি এলাকা ত্যাগ করে। ক্যাপ্টেনদের কঠোরভাবে সেই রুট অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তাদের লোকেশন ট্রান্সপন্ডার ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ বন্ধ রাখতে বলা হয়।

ভারতের শিপিং খাতের একটি সূত্র বলেছে, ‘ভারতীয় নৌ বাহিনী আমাদের স্পষ্ট বলে দিয়েছে, যদি ইরানিরা থামতে বলে তবে থামবে, আর যদি যেতে বলে তবে যাবে। আমরা সেই নির্দেশই মেনে চলছি।’

দেশটির বন্দর, জাহাজ ও জলপথ মন্ত্রণালয় গত ১৪ মে জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ভারতের পতাকাবাহী ১৩টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে এবং ১৩টি জাহাজ এখনো জলপথের পশ্চিমে আটকে আছে।

‘ঝুঁকিপূর্ণ’ জলপথ

শিপিং খাতের দুটি সূত্র ও তিনজন ইরানি নাগরিকের মতে, উপসাগর থেকে বের হওয়ার এই রুটে জাহাজগুলোকে একাধিক ইরানি পয়েন্ট অতিক্রম করতে হয়, যেখানে প্রায়শই সশস্ত্র কর্মীরা মোতায়েন থাকেন। ‘আজিওস ফানুরিওস-১’ জাহাজটি আবু মুসা, গ্রেটার টান্ব ও লারেকে অবস্থিত ইরানি সামরিক চেকপোস্টগুলো পার হয়ে এগিয়ে যায়। হরমুজের কাছাকাছি পৌঁছালে আইআরজিসির স্পিডবোট জাহাজটিকে কিছুক্ষণের জন্য থামায়। তবে তল্লাশির পর চোরাচালানের তথ্যটি ভুল প্রমাণিত হলে জাহাজটি আবার যাত্রা শুরু করে।

গত মাসে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টার সময় ভারতের পতাকাবাহী দুটি জাহাজে হামলার পেছনেও এ ধরনের বিশৃঙ্খল যোগাযোগই প্রধান কারণ ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনাগুলো উপসাগরে আটকে থাকা ভারতীয় নাবিকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে।

ভারতের শিপিং সূত্রটি বলেছে, ‘এই জাহাজগুলোর কোনো আর্মার (বুলেটপ্রুফ বর্ম) থাকে না। ফলে গুলি সরাসরি ভেতরে ঢুকে যায়।’ বন্দুকধারীদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে নাবিকদের থাকার জায়গা, কারণ তারা তেলের ট্যাংকে গুলি করতে পারে না, সেখানে দাহ্য তরল থাকে।

একটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজে করে হরমুজ প্রণালি পার হওয়া এক ভারতীয় নাবিক জানান, তাদের শিপিং কোম্পানি আইআরজিসি থেকে অনুমতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত জাহাজটিকে উপসাগরে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এরপর লারেক দ্বীপের কাছে পৌঁছালে ইরানি নৌ বাহিনী যোগাযোগ করে এবং ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে জাহাজের সব তথ্য নেয়। নাবিকদের জাতীয়তা নিয়ে তারা বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করে।

ওই নাবিক বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টা পর ক্যাপ্টেন আইআরজিসি থেকে একটি রুট পান। ছোট ইরানি নৌকার পাহারায় সমুদ্রের মাইন এড়িয়ে আমাদের সতর্কতার সঙ্গে চলতে হয়েছিল। এটি ছিল এক ভয়ানক দৃশ্য। যুদ্ধের সময় আর কখনো সমুদ্রে যাওয়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না।’

তবে হরমুজ প্রণালি পার হলেই যে বিপদের অবসান ঘটে, তা কিন্তু নয়। ইরানি জলসীমা থেকে বের হওয়ার ঠিক একদিন পরই ‘আজিওস ফানুরিওস-১’ মার্কিন নৌ বাহিনীর অবরোধের মুখে পড়ে। মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের নথিপত্র যাচাই করার সময় ট্যাংকারটি টানা ছয় দিন একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে ঘুরপাক খেতে বাধ্য হয়। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, ‘চলমান অবরোধের অংশ হিসেবে মার্কিন বাহিনী মাল্টার পতাকাবাহী ওই জাহাজটিকে ঘুরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।’

গ্রিসের শিপিং কোম্পানি ‘ইস্টার্ন মেডিটেরেনিয়ানে’র অপারেশনস ম্যানেজার সাকোলারিডিস জানান, পরে ভিয়েতনাম জাহাজটিকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাহাজটির সঙ্গে ইরানের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকায় শুরুতে এটিকে আটকে রাখার কোনো যৌক্তিকতাই ছিল না।

অবশেষে গত ১৬ মে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ‘আজিওস ফানুরিওস-১’ জাহাজটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে এটি ভিয়েতনামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে। আর ​গত ১৩ এপ্রিল নৌ অবরোধ জারি করার পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী আর কতটি জাহাজ এভাবে অবরুদ্ধ করেছে, তা স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

কিউবার রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র

মিয়ামির ফ্রিডম টাওয়ারে বক্তব্য দেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চে ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে বিমান ধ্বংস এবং আরমান্দো আলেহান্দ্রে জুনিয়র, কার্লোস আলবার্তো কস্তা, মারিও মানুয়েল দে লা পেনিয়া ও পাবলো মোরালেসের মৃত্যুর ঘটনায় পৃথক চারটি হত্যার অভিযোগও আ

৮ ঘণ্টা আগে

শর্ত না মানলে ইরানে কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতে, ইরান যদি শেষ পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় আসতে রাজি হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ সময়, শক্তি এবং সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হবে। এই চুক্তিটি অত্যন্ত দ্রুত, এমনকি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেও সম্পন্ন হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

১০ ঘণ্টা আগে

‘অনুপ্রবেশকারী’ বাংলাদেশিদের বের করে দেবে পশ্চিমবঙ্গ, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী

এরপরই অনুপ্রবেশ নিয়ে মুখ খোলেন শুভেন্দু অধিকারী। বলেন, বিএসএফের সঙ্গে সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি করে আমরা রাজ্য ও দেশকে সুরক্ষিত করব। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ১৪ মে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল। আমাদের আগের সরকার একদিকে শরণার্থীদের সি

২১ ঘণ্টা আগে

ট্রাম্পের পরেই পুতিনের সফর— দুই ভিন্ন রাজনীতিতে চীনের ভারসাম্য রক্ষার কূটনীতি

চীনের জন্য এই সফর দুটি প্রমাণ করে যে, দেশটির বিশাল অর্থনীতি এবং নতুন কূটনৈতিক প্রভাবের কারণে এখন সব পথই বেইজিংয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দুই সফরের বাহ্যিক দৃশ্যপট প্রায় একই রকম ছিল— স্বাগতিক হিসেবে শি জিনপিং বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তবে ট্রাম্পের সফরের সঙ্গে পুতিনের সফরের পেছনের রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

১ দিন আগে