মোদি সরকারের নীতিই তরুণদের আন্দোলনে ঠেলে দিয়েছে: সোনিয়া গান্ধী

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ২৩: ৪৯
সোনিয়া গান্ধী (বাঁয়ে) এবং নয়া দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের সময় ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকরা পতাকা ও প্ল্যাকার্ড বহন করছেন (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

ভারতে প্রশ্নফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থা এবং সরকারের জবাবদিহির অভাবই দেশটির তরুণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছে বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী। তার অভিযোগ, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় না গিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে এবং তাদের ‘জাতীয় শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত এক কলামে সোনিয়া গান্ধী বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক অধঃপতনের বিরুদ্ধে ভারতের তরুণ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। তাদের দাবি সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু সরকার সেই দাবির জবাবে সহিংসতা ও কঠোর দমননীতির আশ্রয় নিয়েছে।

সোনিয়া গান্ধীর দাবি, ২০ জুলাই দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ চালায়। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হন। এমনকি আন্দোলন শেষে বাড়ি ফেরার সময়ও অনেক শিক্ষার্থী লাঠিপেটার শিকার হন এবং পেলেট গানের ছররায় আহত হন। তার ভাষ্য, এ ধরনের অভিযান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ওই দিনের ভিডিওচিত্র দেশবাসীর বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সরকার ও তাদের সমর্থক গণমাধ্যম শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। তার মতে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ, তাদের সঙ্গে সংলাপের পরিবর্তে সহিংসতা চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সোনিয়া গান্ধী বলেন, ভিন্নমতকে ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া মোদি সরকারের পুরোনো কৌশল। শিক্ষার্থী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একইভাবে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ছড়িয়ে আন্দোলনকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ সরকারের উচিত ছিল এমন নীতিগুলোর দিকে নজর দেওয়া, যেগুলো তরুণদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, মোদি সরকার পাবলিক শিক্ষার ক্ষেত্র থেকে ধীরে ধীরে সরে এসেছে। তার দাবি, সরকার স্কুল শিক্ষার বাজেট ৫০ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষার বাজেট ৩৩ শতাংশ কমিয়েছে। গত ১২ বছরে প্রায় এক লাখ সরকারি স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ৪৩ হাজার বেসরকারি স্কুল চালুর সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যার বড় একটি অংশ পরিচালনা করছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো।

সোনিয়া গান্ধী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুদান কমিয়ে তাদের ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। ফলে ঋণ পরিশোধের জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেশি ফি নিতে হচ্ছে। এতে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী শিক্ষা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং পরিবারগুলোকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

তিনি আরও দাবি করেন, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও বেসরকারীকরণের কারণে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের বহু মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপও বাড়িয়ে তুলছে।

পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন সোনিয়া গান্ধী। তিনি বলেন, ভারতের সরকারি পরীক্ষাব্যবস্থা এখন কেন্দ্রীভূত, বেসরকারীকৃত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। আগে বিভিন্ন রাজ্য ও বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব পরীক্ষা নিলেও এখন ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) অধীনে কেন্দ্রীভূত পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

তার অভিযোগ, এনটিএ কর্মীসংকট ও অব্যবস্থাপনায় ভুগছে এবং পরীক্ষা পরিচালনায় বেসরকারি ঠিকাদারদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও অন্যান্য কাজে দেশের সেরা শিক্ষাবিদদের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের যুক্ত করা হচ্ছে।

দ্য হিন্দু–তে প্রকাশিত ওই কলামে সোনিয়া গান্ধী দাবি করেন, গত ১২ বছরে ভারতে ১৫২টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৯টি ঘটেছে ২০১৭ সালে এনটিএ গঠনের পর। এর ফলে মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষাজীবন শেষ করেও তরুণদের জন্য মানসম্মত চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তার দাবি, গত কয়েক বছরে তরুণ স্নাতকদের বেকারত্বের হার গড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। পাশাপাশি দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সোনিয়া গান্ধীর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ভারতের উচ্চশিক্ষা এখনও পুরোনো কাঠামো ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পাঠ্যক্রমে আটকে রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন না।

তিনি অভিযোগ করেন, কোনো জাতীয় ঐকমত্য বা সংসদীয় আলোচনা ছাড়াই জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একইভাবে এনটিএকেও সংসদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। এমনকি সংসদীয় কমিটির সুপারিশও শিক্ষামন্ত্রী প্রকাশ্যে উপেক্ষা করেছেন বলে তিনি দাবি করেন।

কলামের শেষাংশে সোনিয়া গান্ধী বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, সরকারের দায়বদ্ধতার অভাব এবং অহংকারী মনোভাবই আজকের শিক্ষার্থী আন্দোলনের মূল কারণ। ২০২০ সালের সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন ও নারী কুস্তিগীরদের আন্দোলনের সময়ও একই ধরনের দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, মোদি সরকার শুধু শিক্ষাব্যবস্থাকেই ধ্বংস করেনি, বরং স্বৈরাচারী মনোভাব ও সংবেদনশীলতাহীন আচরণকে শাসনের অংশে পরিণত করেছে। তাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা এখন নৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বার্লিনের জঙ্গলে অস্ত্রের গোপন ভাণ্ডার, রুশ গোয়েন্দা সংযোগের সন্দেহ

ডোব্রিন্ট জানান, ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে— এমন গুরুতর সহিংস কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে’ তদন্ত শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাটি জার্মানির বর্তমান ‘উচ্চ ঝুঁকি’র নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে। এতে বিদেশি কোনো শক্তির সম্পৃক্ততা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

৭ ঘণ্টা আগে

স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ফের কারাগারে ইমরান খান

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইমরান খানকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে আবার রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকেরা পরীক্ষার পর তাকে ‘চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ’ ঘোষণা করেছেন।

১৬ ঘণ্টা আগে

ট্রাম্প কি ইরানের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর বাণিজ্য বন্ধ করতে পারবেন

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো দেশ ইরানকে আর্থিক, ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো সহায়তা দিলে সেই দেশকেও ‘প্রচণ্ড অর্থনৈতিক ক্ষতির’ মুখে পড়তে হবে।

১৯ ঘণ্টা আগে

কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা: নিহত ১৩, আহত ৩৩

রাশিয়ার এই ভয়াবহ হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক সহায়তার জোর আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, "ইউক্রেন যতদিন পর্যাপ্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা না পাবে, ততদিন রাশিয়া শান্তির বিষয়টি বিন্দুমাত্র গু

২ দিন আগে