দিল্লিতে মহাসমাবেশ: কৃষকদের ঠেকাতে শম্ভু সীমান্ত বন্ধ, নেতাদের আটক

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মহাসমাবেশে যোগ দিতে দিল্লি অভিমুখে যাত্রা করেছেন ভারতের হাজারও কৃষক। ছবি: সংগৃহীত

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতায় নয়াদিল্লির কিষাণ ঘাটে কৃষক সংগঠনগুলোর ডাকা মহাসমাবেশ ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। মঙ্গলবার হরিয়ানার আম্বালা জেলার শম্ভু এলাকায় হরিয়ানা-পাঞ্জাব সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সীমান্তে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি একাধিক ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। মহাসমাবেশের আগে হরিয়ানার বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েকজন কৃষক নেতাকেও আটক করেছে পুলিশ। কৃষক নেতাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাধা দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে দিল্লিতে এরই মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে তরুণদের আন্দোলন চলমান থাকায় রাজধানীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই কৃষকদের নতুন কর্মসূচিকে ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়, হরিয়ানা পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শম্ভু সীমান্তে আধাসামরিক বাহিনীসহ প্রায় ১৫ কোম্পানি নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, মহাপঞ্চায়েতে অংশ নিতে দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রার পরিকল্পনা নিয়ে শত শত কৃষক ইতোমধ্যে সীমান্ত এলাকায় জড়ো হয়েছেন।

বিক্ষোভকারীদের রাজধানীমুখী অগ্রযাত্রা ঠেকাতে শম্ভুতে ঘগ্গর নদীর ওপর সেতুতে একাধিক ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। সেখানে বড় বড় সিমেন্টের ব্লক স্থাপন করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের মধ্যে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রীদের জন্য বিকল্প রুটের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

কৃষক নেতাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার ও হরিয়ানার বিজেপি সরকার তাদের শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তাদের দাবি, মহাপঞ্চায়েত শুরুর আগেই হরিয়ানার বিভিন্ন এলাকা থেকে একাধিক কৃষক নেতা ও আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।

‘দিল্লি চলো-২’ আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি

শম্ভু সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকের কাছেই ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির ‘দিল্লি চলো-২’ আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখনও কৃষকদের দিল্লিতে প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তজুড়ে বহুস্তরের ব্যারিকেড, সিমেন্টের ব্লক ও লোহার পেরেক বসিয়ে কার্যত দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল শম্ভু সীমান্তকে।

এবারও প্রায় একই ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সীমান্ত পার হয়ে কৃষকরা যাতে দিল্লিতে প্রবেশ করতে না পারেন, সে জন্য কড়া নজরদারির পাশাপাশি অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে।

কেন এই আন্দোলন?

পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষক সংগঠনগুলো গত কয়েক মাস ধরে ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।

ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়নের (চাডুনি) সভাপতি গুরনাম সিং চাডুনি এর আগে বলেন, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, তরুণ, নারী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতিক্রমে এই চুক্তির বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, প্রস্তাবিত চুক্তি কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তরুণ এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থি।

চাডুনির ভাষ্য, এই বাণিজ্য চুক্তি দেশের কৃষি, কর্মসংস্থান এবং আত্মনির্ভরশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, বিষয়টিকে শুধু কৃষকদের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি পুরো দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। তাই এই আন্দোলনে বৃহত্তর জনগণের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

সীমান্তেই প্রতিবাদ মঞ্চ

দিল্লিতে প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা শম্ভু সীমান্তকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিবাদের কেন্দ্র বানিয়ে অবস্থান শুরু করেছেন। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা—উভয় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা দমনের অভিযোগ তুলেছেন তারা।

বিকেইউ (শহীদ ভগৎ সিং) নেতা তেজবীর সিং অভিযোগ করেন, হরিয়ানা পুলিশ অন্যায়ভাবে পাঞ্জাবের ভূখণ্ডের ভেতরে প্রবেশ করে ব্যারিকেড তৈরি করেছে। অন্যদিকে পাঞ্জাব সরকারও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এবং নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

তবে পাঞ্জাবের কৃষকদের অগ্রযাত্রা আটকে দেওয়া হলেও হরিয়ানার আম্বালা, কুরুক্ষেত্র এবং আশপাশের এলাকার কৃষকেরা দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।

‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে আন্দোলন

পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের একাধিক কৃষক সংগঠন ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।

কিষাণ মজদুর সংঘর্ষ কমিটির (কেএমএসসি) নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ২০২৬ সালের শরতের মধ্যেই প্রথম ধাপের বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করা হবে।

কৃষক নেতাদের দাবি, এটি শুধু একটি সাধারণ বাণিজ্য চুক্তি নয়। এতে ভারতের কৃষি, ডেইরি বা দুগ্ধশিল্প, শিল্প খাত, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব এবং পরিষেবা খাতের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ক্ষুদ্র কৃষকদের উদ্বেগ

কৃষক সংগঠনগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বাজারে মার্কিন সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা, আপেল, বাদাম, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হাঁস-মুরগির মাংসের ওপর শুল্ক কমানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছে।

তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি ও ডেইরি খাতে বিপুল ভর্তুকি দেওয়া হয়। ফলে কম দামে উৎপাদিত মার্কিন কৃষিপণ্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করলে দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন এবং অনেকেই টিকে থাকতে পারবেন না।

এ ছাড়া ভারতের দুগ্ধ খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮ কোটি গ্রামীণ পরিবার নির্ভরশীল। কৃষক সংগঠনগুলোর মতে, এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু দুগ্ধশিল্প নয়, পুরো গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

নথি প্রকাশের দাবি

চুক্তি সংক্রান্ত নথিপত্র গোপন রাখা হচ্ছে অভিযোগ তুলে ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অবিলম্বে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির সব নথি জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।

একই সঙ্গে কৃষক, দুগ্ধ উৎপাদক, শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ও তাদের সম্মতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তিতে সই না করার আহ্বান জানিয়েছে কিষাণ মোর্চা।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

দিল্লিতে এবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে প্রতিবাদে শামিল রাহুল-প্রিয়াঙ্কা

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন কেরালার ওয়ানাড়ের সাংসদ ও বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা এবং কংগ্রেসের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা।

৬ ঘণ্টা আগে

নেতানিয়াহুকে ঘিরে রাজনৈতিক লড়াইয়ে মুখোমুখি ট্রাম্প-মামদানি

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ট্রুথ সোশ্যালকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক উসকে দেওয়ার অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। তার সর্বশেষ মন্তব্য শুধু নেতানিয়াহুকে ঘিরে অবস্থান স্পষ্ট করেনি; বরং নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনের সঙ্গে ফেডারেল সরকারের সম্ভাব্য ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইঙ্গিতও দিয়েছে।

৭ ঘণ্টা আগে

পুলিশি হামলার জেরে আর মিছিল নয়, তবে আন্দোলন চলবে: সিজেপি

ভারতের তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) জানিয়েছে, তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে, তবে আর কোনো মিছিল করবে না। গতকাল সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু সমর্থক আহত হওয়ার পর আজ মঙ্গলবার এ ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনের নেতারা।

১১ ঘণ্টা আগে

মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা: রাডার ও স্যাটেলাইট ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি

আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত আইআরজিসির প্রথম বিবৃতি অনুযায়ী, কুয়েতে মার্কিন বাহিনীর একটি দূরপাল্লার রাডার কেন্দ্র, একটি টেলিযোগাযোগ কেন্দ্র, স্যাটেলাইট সিগন্যাল গ্রহণ ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডারে সফল হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে 'আলি আল-সালেম' বিমানঘাঁটিতে অ

১১ ঘণ্টা আগে