ইউক্রেনের সুরক্ষায় ‘কোয়ালিশন অব উইলিং’ গঠনের ঘোষণা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর

ইউক্রেনকে সুরক্ষা ও সমর্থন দিতে ‘কোয়ালিশন অব উইলিং’ নামে জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ অন্য দেশগুলোকে নিয়ে এই জোট গঠনের কথা জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (২ মার্চ) ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিসহ ইউরোপের ১৮ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রধানের সঙ্গে বৈঠকের পর স্টারমার এ ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ও রাশিয়ার হাত থেকে ইউক্রেনকে রক্ষায় চার দফা কর্মপরিকল্পনাও তিনি ঘোষণা করেন।
বিবিসির খবরে বলা হয়, ‘ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে’ অবস্থান করছেন উল্লেখ করে স্টারমার চারটি বিষয়ে সবার একমত হওয়ার তথ্য দেন। এগুলো হলো—
- ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখা ও রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো;
- যেকোনো শান্তি চুক্তিতে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা ও যেকোনো আলোচনায় ইউক্রেনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
- শান্তি চুক্তিতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য বাড়ানো যেন ভবিষ্যতে যেকোনো আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে পারে;
- এবং ইউক্রেনের নিরাপত্তায় জোট গঠন ও এর পরবর্তী শান্তি নিশ্চিত করা।
এ বৈঠকের পর জেলেনস্কি বলেন, তিনি শক্তিশালী সমর্থন অনুভব করছেন এবং এই সম্মেলনে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইউরোপীয় ঐক্য দেখা গেছে, যা অনেক দিন ধরে দেখা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট হাউজে জেলেনস্কির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাগ্বিতণ্ডার ঘটনার দুদিন পর ইউরোপীয় নেতারা এ সম্মেলনে মিলিত হলেন। পরে জেলেনস্কি আরও বলেন, একটি সত্যিকার শান্তি ও নিশ্চিত নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তি খুঁজতে আমরা ইউরোপে সবাই একযোগে কাজ করে যাচ্ছি।
বৈঠকের পর কিয়ের স্টারমার একই সঙ্গে পাঁচ হাজার আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য অতিরিক্ত দুই বিলিয়ন ডলারের সহায়তাও ঘোষণা করেন। এর আগে রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদের মুনাফা থেকে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন পাউন্ডের সামরিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাজ্য।
স্টারমার বলেন, আমাদের অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমরা এমন কোনো দুর্বল চুক্তি গ্রহণ করতে পারি না, যা রাশিয়া সহজেই লঙ্ঘন করতে পারে। বরং চুক্তি হতে হবে শক্তিশালী।
ইউক্রেনের সুরক্ষায় প্রস্তাবিত জোট বা ‘কোয়ালিশন অব উইলিং’য়ে কোন কোন দেশ যোগ দিতে সম্মত হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাননি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন, যারা অঙ্গীকার করেছেন তারা জরুরিভিত্তিতে কাজ করবে। যুক্তরাজ্যও তার অঙ্গীকার রক্ষা করবে।
স্টারমার আরেও বলেন, এ সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন হবে এবং রাশিয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে মস্কোকে কোনো শর্ত নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হবে না।
ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগী হিসেবে অবিশ্বস্ত কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত শুক্রবার যা ঘটেছে সেটি কেউ দেখতে চায়নি। কিন্তু আমি মনে করি না যুক্তরাষ্ট্র সহযোগী হিসেবে অবিশ্বস্ত।
সম্মেলনে যেসব দেশ যোগ দিয়েছে তারা হলো— ফ্রান্স, পোল্যান্ড, সুইডেন, তুরস্ক, নরওয়ে, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া, ফিনল্যান্ড, ইটালি, স্পেন ও কানাডা।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েন বলেন, ইউরোপকে পুনরায় অস্ত্রে সজ্জিত করার জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
একই ধরনের মত দিয়েছেন ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুত্তে। তিনি বলেন, বৈঠকে ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনের যত দিন দরকার তত দিন লড়াই অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে অগ্রসর হয়েছে বলে মনে হয়েছে।
সম্মেলনের পর ভলোদিমির জেলেনস্কি রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খনিজ চুক্তি সই করতে প্রস্তুত ছিলেন।
জেলেনস্কির ওয়াশিংটন সফরের সময় ইউক্রেন ওই চুক্তিতে সই করবে বলে আশা করা হচ্ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেনের বিরল খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকারের সুযোগ করে দেবে। কিন্তু ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দল সেখান থেকে বেরিয়ে আসে।
এর আগে রোববার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেনের খনিজ চুক্তি সই হতে পারে না। ইউরোপ সম্মেলন আসা জেলেনস্কিকে ওই চুক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তারা এটি সই করতে প্রস্তুত ছিলেন।
রোববারের সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার একটি সপ্তাহ শেষ হলো। এ সপ্তাহেই ওয়াশিংটন সফরে গেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, কিয়ের স্টারমার ও ভলোদিমির জেলেনস্কি। এর মধ্যে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলা’র অভিযোগ করেন।
ট্রাম্প বলেন, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি তার আস্থা প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র এর মধ্যে ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনাও শুরু করেছে। এক পর্যায়ে ট্রাম্প ইউক্রেনকেই যুদ্ধ শুরুর দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।