সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের জন্য নাটকীয় দিন, ৪ রায়ের ৩টিতেই ধাক্কা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ২১: ২৬
ডোনাল্ড ট্রাম্প। এএফপি ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য গতকাল সোমবার ছিল সুপ্রিম কোর্টে এক নাটকীয় দিন। এক দিনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় প্রকাশ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। এর মধ্যে একটি রায়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও বাকি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদালত তার অবস্থানের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে একই দিনে বড় একটি আইনি সাফল্যের পাশাপাশি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাক্কার মুখে পড়েছেন তিনি।

বিবিসির খবরে বলা হয়, সোমবার (২৯ জুন) আদালতের সিদ্ধান্তগুলো দেখিয়েছে যে রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ সুপ্রিম কোর্ট সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না। কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তিন উদারপন্থি বিচারপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস এবং ট্রাম্প মনোনীত বিচারপতিরাও একমত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের জন্য ঘটনাবহুল সোমবার সকালে দেওয়া রায়গুলো থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো—

১. ‘স্বাধীন’ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ওপর প্রেসিডেন্টের ব্যাপক ক্ষমতা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায়টি ছিল স্বাধীন ফেডারেল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের অপসারণে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিয়ে। প্রায় ৯০ বছর আগে দেওয়া একটি ঐতিহাসিক নজিরে বলা হয়েছিল, কংগ্রেসের গঠিত স্বাধীন সংস্থার কমিশনারদের প্রেসিডেন্ট ইচ্ছামতো বরখাস্ত করতে পারবেন না।

ট্রাম্প প্রশাসনের চ্যালেঞ্জের পর সুপ্রিম কোর্ট সেই দীর্ঘদিনের নজির বাতিল করে দেন। নয় বিচারপতির মধ্যে ছয়জনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, ‘যারা প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তারা প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে অপসারণযোগ্য হওয়া উচিত। এতে তারা প্রেসিডেন্টের কাছে এবং প্রেসিডেন্ট জনগণের কাছে জবাবদিহির মধ্যে থাকবেন।’

এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা পরিচিত বিভাজনেই অবস্থান নেন। ট্রাম্প মনোনীত তিনজনসহ ছয়জন রক্ষণশীল বিচারপতি প্রেসিডেন্টের পক্ষে রায় দেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের নিয়োগ দেওয়া তিনজন উদারপন্থি বিচারপতি ভিন্নমত পোষণ করেন।

এই রায়ের ফলে শুধু বর্তমান প্রেসিডেন্টই নন, ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টরাও ফেডারেল ট্রেড কমিশনসহ বিভিন্ন স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের অপসারণ ও নতুন নিয়োগে আগের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতা পাবেন। এ ছাড়া আদালত যে নজির স্থাপন করল, তা নির্বাচন আইন ব্যাখ্যা করা, যোগাযোগনীতি নির্ধারণ, শ্রমবিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আর্থিক ও পরিবেশগত বিধিমালা প্রণয়নকারী বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এমন পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত, যেখানে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এলে নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে— বারাক ওবামা থেকে ট্রাম্প, ট্রাম্প থেকে জো বাইডেন এবং আবার ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরা তার উদাহরণ। আদালতের এই সিদ্ধান্ত সেই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

রায়ের পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘৯০ বছরের নজির সম্পূর্ণ এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে বাতিল করা হয়েছে। এমন এক সময়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা অনেক বাড়ানো হয়েছে, যখন সেটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল!’

২. উদারপন্থি বিচারপতিদের সঙ্গে রক্ষণশীলদের অপ্রত্যাশিত ঐক্য

সোমবার সুপ্রিম কোর্ট একদিকে প্রেসিডেন্টকে তথাকথিত স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ওপর ব্যাপক ক্ষমতা দিলেও, অন্য একটি মামলায় ট্রাম্প যখন শক্তিশালী ফেডারেল রিজার্ভের পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যকে অপসারণের চেষ্টা করেন, তখন বিচারপতিদের ভিন্ন একটি জোট সেখানে সীমারেখা টেনে দেয়।

ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর বোর্ডের সদস্য লিসা কুককে অপসারণের প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেন সুপ্রিম কোর্ট। পাঁচ-চার ভোটের রায়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস, রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ এবং তিন উদারপন্থি বিচারপতি একমত হয়ে ট্রাম্পের লিসা কুককে অপসারণের চেষ্টা আটকে দেন।

ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, লিসা কুক বন্ধকী ঋণসংক্রান্ত জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। তবে আদালত বলেছেন, তাকে অপসারণের আগে অভিযোগের যথাযথ প্রমাণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে বিচারপতি রবার্টস বলেন, কুককে তার অপসারণের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর এবং ট্রাম্পের অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ট্রাম্পের অভিযোগের পক্ষে আরও শক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। প্রেসিডেন্টরা যদি নিজেদের ইচ্ছা ফেডারেল রিজার্ভের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন, তাহলে যে ‘বিপর্যয়কর পরিস্থিতি’ সৃষ্টি হতে পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।

নির্বাচনি ব্যবস্থা-সংক্রান্ত আরেকটি মামলাতেও ট্রাম্প পরাজিত হন। ডাকযোগে পাঠানো ভোট নির্বাচন দিনের ডাকমোহর থাকলে পরে পৌঁছালেও তা গণনা করা যাবে কি না, এ প্রশ্নে আদালত ট্রাম্পের আপত্তি খারিজ করে দেন। এই মামলার তিনজন উদারপন্থি বিচারপতির সঙ্গে যোগ দেন প্রধান বিচারপতি রবার্টস এবং ট্রাম্প মনোনীত বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লেখেন ট্রাম্প মনোনীত বিচারপতি ব্যারেট। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যারেট লেখেন, কংগ্রেসের নির্বাচন আয়োজনের ‘সময়, স্থান ও পদ্ধতি’ নির্ধারণে অঙ্গরাজ্যগুলোর ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। ডাকযোগে ভোটে জালিয়াতির ঝুঁকি রয়েছে— ট্রাম্পের এমন অভিযোগও তিনি নাকচ করে দেন। তার মতে, এ ধরনের বিষয় ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’র মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত।

রায়ের পর ট্রাম্প কংগ্রেসকে তার নির্বাচনি সংস্কার প্রস্তাব পাস করার আহ্বান জানান। ওই প্রস্তাবে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হলেও ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকানও সিনেটে এ বিষয়ে ভোটাভুটি ঠেকিয়ে রেখেছেন।

অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যাপক নতুন ক্ষমতা পেলেও, তার দুটি বড় নীতিগত লক্ষ্য— সুদের হার কমানো এবং নির্বাচন সংস্কার— এই দুই ক্ষেত্রেই সোমবার সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা তার পক্ষে ছিলেন না।

৩. ট্রাম্পের মানহানি মামলার আপিল খারিজ

দিনের আরেকটি বড় ধাক্কা আসে লেখক ই. জিন ক্যারলের করা মানহানি মামলায়। সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আপিল শুনতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে ২০২৩ সালে জুরির দেওয়া ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের রায় বহাল থাকে।

ই. জিন ক্যারল অভিযোগ করেছিলেন, ১৯৯০-এর দশকে নিউইয়র্কের একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরের পোশাক পরিবর্তনের কক্ষে ট্রাম্প তাকে যৌন নিপীড়ন করেছিলেন। পরে ওই অভিযোগ অস্বীকার করে তাকে নিয়ে মানহানিকর মন্তব্য করায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দেওয়ানি আদালত ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

সুপ্রিম কোর্ট কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন নাকচ করে দেন। এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা ও আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। তিনি মানহানির অভিযোগকে ‘হাস্যকর’ বলেও মন্তব্য করেন।

এতে ৫০ লাখ ডলারের ওই রায়ের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আইনি লড়াই কার্যত শেষ হয়ে গেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। যদিও ক্যারলের পক্ষে দেওয়া পৃথক ৮ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের আরেকটি ক্ষতিপূরণের রায়ের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আপিল প্রক্রিয়া এখনো চলমান।

সোমবারের রায়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছে। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের পক্ষে অবস্থান নিলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, নির্বাচনি বিধান এবং বিচারিক রায়ের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদালত নির্বাহী ক্ষমতার সীমা টেনে দিয়েছেন।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

লেবানন ছাড়ার শর্ত জানালেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত নথিতে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী লেবানন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করবে এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ভেঙে ফেলে দেশের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে। এর ফলে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পথ উন্মুক্ত হবে।

১৩ ঘণ্টা আগে

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহত ১৭০০ ছাড়াল

দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এটিকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে অভিহিত করেছেন। বার্তাসংস্থা এএফপির জানিয়েছে, ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

১৪ ঘণ্টা আগে

ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে কি থেমে যাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার?

ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের সদ্য সই হওয়া ১৪ দফার কাঠামোগত চুক্তি (ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট) দেশটিতে চলমান সংঘাত প্রশমনের আশা তৈরি করলেও, এর একটি ধারা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা।

১ দিন আগে

জার্মানিতে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত ৫, আটক ২

সোমবার (২৯ জুন) স্টাডে শহরের ডানকার্শট্রাসে এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলার পরপরই বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে দুই সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে একজনকে মূল হামলাকারী বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

১ দিন আগে