ইউক্রেন যুদ্ধে প্রায় ৫ লাখ রুশ সেনা নিহত: ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইউক্রেনের অজ্ঞাত একটি স্থানে কৌশলগত চিকিৎসা প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন রুশ সেনারা। ছবি: রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়/এপি

২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রায় ৫ লাখ সৈন্য নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম গোয়েন্দা সংস্থা 'গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশনস হেডকোয়ার্টার্স' (জিসিএইচকিউ)।

বুধবার (২৭ মে) বিবিসির খবরে বলা হয়, জিসিএইচকিউ পরিচালক অ্যান কিস্ট-বাটলার তার প্রথম জনসমক্ষে দেওয়া বক্তৃতায় এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যের জন্য বর্তমান নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের রূপরেখা ব্যাখ্যা করেন।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউর পরিচালক অ্যান কিস্ট-বাটলার প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে বক্তৃতা দিচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত
ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউর পরিচালক অ্যান কিস্ট-বাটলার প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে বক্তৃতা দিচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্য একটি 'সংকটময় মুহূর্ত' পার করছে উল্লেখ করে বাটলার দেশের অভ্যন্তরে একের পর এক গুপ্তচরবৃত্তির চক্রান্তের জন্য ক্রেমলিনকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি মস্কো যুক্তরাজ্য এবং ন্যাটোভুক্ত অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে এক অলিখিত 'হাইব্রিড যুদ্ধ' শুরু করেছে। তবে ক্রেমলিন অবশ্য বরাবরের মতোই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিয়ে ধোঁয়াশা

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কিয়েভ ও মস্কো নিয়মিতভাবে প্রতিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতির বড় বড় হিসাব প্রকাশ করে আসলেও, নিজেদের সেনা নিহতের প্রকৃত সংখ্যা জানাতে সবসময়ই অনীহা প্রকাশ করেছে। তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত তাদের ৫৫ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বিবিসি রাশিয়া, রুশ সংবাদমাধ্যম মিডিয়াজোনা এবং একদল স্বেচ্ছাসেবককে সঙ্গে নিয়ে রুশ সেনাদের মৃত্যুর সংখ্যা গণনা করে আসছে। সরকারি প্রতিবেদন, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভের তথ্য যাচাই করে কেবল যাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাদের একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

বিবিসি এখন পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ২ লাখ ২৩ হাজার ৫৩৯ জন রুশ সেনা ও কর্মকর্তার নাম নিশ্চিত করতে পেরেছে। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। তারা বলছেন, সমাধি, যুদ্ধস্মারক ও শোকবার্তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা এই তালিকাটি আসলে মোট নিহতের মাত্র ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে।

মহাকাশ ও সাইবার যুদ্ধ

বক্তৃতায় জিসিএইচকিউ পরিচালক কিস্ট-বাটলার সতর্ক করে বলেন, রাশিয়া এবং চীন উভয় দেশই এখন শান্তিপূর্ণ ও সামরিক— উভয় উদ্দেশ্যেই মহাকাশ প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। ক্রেমলিনের নানা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও গুপ্তহত্যার চেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'এমন আগ্রাসন ও বিশৃঙ্খলার মুখে জিসিএইচকিউ রুশ হুমকি নস্যাৎ ও হ্রাস করতে গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারদের সাথে অক্লান্তভাবে কাজ করে যাচ্ছে।'

যুক্তরাজ্যের মাটিতে রাশিয়ার এমন বৈরী আচরণের ইতিহাস বেশ পুরনো। ২০০৬ সালে লন্ডনের একটি হোটেলে সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা আলেকজান্ডার লিটভিনেঙ্কোর চায়ে তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম মিশিয়ে হত্যা এবং ২০১৮ সালে স্যালিসবারিতে সাবেক রুশ সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সের্গেই স্ক্রিপালের দরজার হ্যান্ডেলে মারাত্মক নার্ভ এজেন্ট 'নভিচক' (স্নায়ুকে বিকল করে দেওয়ার বিষাক্ত রাসায়নিক) মাখিয়ে হত্যার চেষ্টার পেছনেও মস্কোকে দায়ী করা হয়।

ইউক্রেন যুদ্ধে ব্রিটেনের টানা সমর্থনের কারণে এই বৈরিতা আরও বেড়েছে। জিসিএইচকিউ প্রধান বলেন, 'আমরা ইউক্রেনের পাশে যেভাবে অবিচল আছি, তাতে যুদ্ধক্ষেত্রে পুতিন দিন দিন আরও পিছিয়ে পড়ছেন।' পাশাপাশি চীনকে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরাশক্তি হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, তাদের গোয়েন্দা, সাইবার ও সামরিক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা এখন অত্যন্ত পরিশীলিত।

এআই প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা

বিশ্ব জুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির দিকে ইঙ্গিত করে কিস্ট-বাটলার সতর্ক করেন, যুক্তরাজ্য ও তার মিত্রদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে থাকার সুযোগ দিন দিন কমে আসছে। তিনি বলেন, 'আমাদের পায়ের নিচের মাটি খুব দ্রুত সরে যাচ্ছে।'

তিনি দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবিলম্বে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার তাগিদ দিয়ে বলেন, 'সাইবার নিরাপত্তা এখন সব ব্যবসার জন্য একটি অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এটি কেবল ব্যবসা বা গ্রাহকদের সুরক্ষার জন্যই নয়, বরং আমাদের দেশ ও অর্থনীতিকে ফ্রন্টলাইনে থেকে রক্ষা করার জন্যও জরুরি।'

জিসিএইচকিউর একটি বড় সময় ব্যয় হয় আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলোর সাইবার হামলা ও র‍্যানসমওয়্যার (টাকা দাবি করার সফটওয়্যার) মোকাবিলা করতে, যারা প্রায়ই ব্রিটেনের প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। এই হুমকি থেকে বাঁচতে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষসহ সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। সবাইকে সাধারণ পাসওয়ার্ড বদলে 'পাসকি' ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সাইবার নিরাপত্তাকে এখন ১০ গুণ বেশি জরুরি হিসেবে দেখতে হবে।

কী এই জিসিএইচকিউ?

গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশনস হেডকোয়ার্টার্স (জিসিএইচকিউ) হলো যুক্তরাজ্যের তিনটি প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে বড়। বাকি দুটি হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক 'এমআই-ফাইভ' (MI5) এবং বিদেশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা 'এমআই-সিক্স' (MI6)।

জিসিএইচকিউর সদর দপ্তর গ্লুচেস্টারশায়ারের চেল্টেনহ্যাম শহরে অবস্থিত একটি বিশাল গোলাকৃতির ভবনে, যা স্থানীয়ভাবে 'দ্য ডোনাট' নামে পরিচিত। এই গোয়েন্দা সংস্থাটি মূলত সাইবার নিরাপত্তা এবং সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের (যোগাযোগ বার্তা) ওপর নজরদারির কাজ করে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও গবেষণার কারণে দেশের জাতীয় গোয়েন্দা বাজেটের সিংহভাগই এই সংস্থার পেছনে ব্যয় করা হয়।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরাক থেকে ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ

শুক্রবার ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা কৌশলগত উপকূলীয় শহর মোকায় হুথি যোদ্ধাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এর এক দিন আগে হুথিরা লোহিত সাগরের পুরো উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছিল।

১৭ ঘণ্টা আগে

সৌদির সামরিক ঘাঁটিতে হুথিদের ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

সংগঠনটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, সৌদি আরবের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিটি ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। সেখানে থাকা প্রধান অস্ত্রের গুদাম এবং ‘কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার’ লক্ষ্য করে এই হামলা পরিচালিত হয়।

১৮ ঘণ্টা আগে

ইরান যুদ্ধের পরিণতি কি আফগানিস্তান-ইরাকের মতো হবে?

ইরানের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও বড়। কারণ এটি ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দুর্বল রাষ্ট্র নয়। প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশটির রয়েছে শক্তিশালী সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো, বিশাল ভূখণ্ড, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক এবং নিজস্ব জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিচয়। ফলে তেহরানে সরকার পতন ঘটানো গেলেও

১৯ ঘণ্টা আগে

ব্রিকসে ইরান-আমিরাত বরফ গলার আভাস

ভারতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাবেক রাষ্ট্রদূত সুনজয় সুধীর রয়টার্সকে বলেন, যুদ্ধ শেষ করার চাবিকাঠি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে। তার মতে, ভারত কঠিন আলোচনাগুলো চালু রাখার সুযোগ তৈরি করেছে, যাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো একই টেবিলে বসতে পারে, কূটনৈতিকভাবে আলোচনা করতে পারে এবং যেসব বিষয়ে তাদের স্বার্থের মিল রয়েছ

১ দিন আগে
Advertisement