মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের, আলোচনায় ফিরতে চায় ওয়াশিংটন

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে। প্রতীকী ছবি

ইরানের অর্থনীতি আরও বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জবাবে পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে ইরানের দাবি, ওয়াশিংটন একদিকে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ালেও অন্যদিকে আবারও কূটনৈতিক আলোচনার পথ খুলতে চাইছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে সোমবার (২৪ আগস্ট) নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। এর আওতায় কেবল ইরান নয়, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সবাইকেই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রত্যাশিত সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপগুলো এখনই নেয়নি ওয়াশিংটন।

নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে ইরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তা করার অভিযোগে থাকা চীনা বড় কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তালিকায় রাখা হয়নি।

বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা দেশগুলোকে মার্কিন ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি নিতে হবে। তবে কোন কোন দেশকে কখন এই শাস্তির আওতায় আনা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি তিনি। বরং নতুন নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে কিছু সময় দেওয়া হবে বলে জানান।

চীনা ব্যাংকগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসতে পারে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, ‘কেউই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে নয়।’ তবে কেন আরও কঠোর পদক্ষেপ এখনই নেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে তিনি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরির ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন।

চীনের দিকে নজর ওয়াশিংটনের

ইরানের তেল কেনার ক্ষেত্রে চীন বহু বছর ধরে সবচেয়ে বড় ক্রেতা। যদিও জুলাইয়ের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোকে ঘিরে অবরোধ পুনরায় জোরদার করার পর চীনে ইরানের তেল প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনা ব্যাংকগুলোকে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে সতর্ক ওয়াশিংটন। কারণ আগামী মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে বেইজিংয়ের পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন পালটা বিধিনিষেধ দিলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

তবে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) চীন স্পষ্ট করে বলেছে, ইরানের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে এবং এতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা বিঘ্ন সৃষ্টি করা উচিত নয়।

‘শত্রুদের হামলার অপেক্ষায় থাকতে হবে’

নতুন নিষেধাজ্ঞার পর ইরানের অর্থমন্ত্রী আলি মাদানিজাদেহ বলেন, তেহরান পালটা জবাব দিতে প্রস্তুত। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা এখন আর শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়, শত্রুদের হামলার অপেক্ষায় থাকতে হবে।’

ইরানের অর্থমন্ত্রীর দাবি, চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপ মেনে নেয়নি এবং অন্য দেশগুলোও মার্কিন চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে বলে তেহরান আশা করছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবিও আরও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। প্রেস টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ এবং জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে বড় ধরনের আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

ওয়াশিংটন কি আবার আলোচনায় ফিরতে চাইছে?

নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার দিনই ইরানের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান আব্বাস গোলরু দাবি করেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির সোমবার তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বার্তা নিয়ে এসেছিলেন।

ইরানের আইএসএনএ সংবাদ সংস্থাকে গোলরু বলেন, ‘মনে হচ্ছে মূল লক্ষ্য ছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে আবার সক্রিয় করা।’ তবে এ বিষয়ে হোয়াইট হাউজ বা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এরই মধ্যে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে সর্বশেষ আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে। আলোচনার মূল বিষয় ছিল সংঘাতের আরও বিস্তার ঠেকানো এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে তেহরান সফর করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে।’ ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তা মেহদি তাবাতাবায়িও জানান, মুনিরের সফর ‘অত্যন্ত মূল্যবান কূটনৈতিক অর্জন’ এনে দিয়েছে এবং এর ফলাফল শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।

এর আগে আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন। ফলে পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ পুনর্স্থাপনের একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

৬ মাসের সংঘাতে ভেঙে পড়েছে তেল সরবরাহ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন দুই কোটি ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহন হতো, যা বিশ্বে প্রতিদিন ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। কিন্তু সোমবার সেই প্রবাহ নেমে আসে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেলে।

নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরও অবশ্য তেলের দাম কমেছে। বাজারের বিনিয়োগকারীরা নতুন নিষেধাজ্ঞাকে প্রত্যাশার তুলনায় কম কঠোর হিসেবে দেখেছেন। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ দশমিক ২১ ডলারে নেমে আসে।

তবে হরমুজ ঘিরে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। মঙ্গলবার ওমানের আশ শিশাহ এলাকার কাছে হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে একটি তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অচল হয়ে পড়ে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, জাহাজটি ওমানের উপকূল থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থান করছিল।

যুদ্ধ থামলেও সমাধান মিলছে না

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের সরাসরি হামলা হয়নি। জুনে দুই দেশ যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতেও পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং ইরান আবারও জাহাজ চলাচলে হামলা শুরু করে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা থেকে বর্তমান যুদ্ধের সূচনা। কয়েক মাসের সংঘাতে ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অর্থনীতি চাপে পড়েছে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। তবে ইরান এখনো উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালানোর এবং তেলবাহী জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে ফেলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থাও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

এদিকে যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমর্থনও কমছে। রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, সংঘাতের পক্ষে মার্কিন জনসমর্থন যুদ্ধের শুরুর দিকের পর সবচেয়ে নিচে নেমেছে। একই সময়ে নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

ফলে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি কূটনৈতিক দরজা খোলা রাখার মার্কিন কৌশল কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একদিকে ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনীতিকে আরও বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি, তেলের বাজার ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ঝুঁকি বিবেচনায় সরাসরি আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতাও দেখাচ্ছে। আর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যদি আলোচনার পথ আবার খুলে যায়, তাহলে প্রায় ছয় মাসের এই সংঘাত নতুন একটি কূটনৈতিক মোড় নিতে পারে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখ আশ্রয়প্রার্থীর ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে ঘোষণা দিতে পারে পররাষ্ট্র দপ্তর। এ ক্ষেত্রে তারা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।

১০ ঘণ্টা আগে

হাইতিতে সন্ত্রাসী হামলা নিহত ৪৭, আহত ২২

১১ ঘণ্টা আগে

ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক অর্থনৈতিক আক্রমণে’র ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

বেসেন্ট এটিকে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তেহরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার এবং ইরানের সঙ্গে ব্যবসা— এই দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হতে পারে।

১৯ ঘণ্টা আগে

হরমুজে ৪৫ তেলবাহী জাহাজকে হুমকি ইরানের

ইরানের নবগঠিত ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ সোমবার (২৪ আগস্ট)এক বিবৃতিতে জানায়, কালো তালিকাভুক্ত জাহাজগুলোর সঙ্গে যারা পণ্য স্থানান্তর বা অন্য ধরনের সহযোগিতা করবে, তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশের কয়েকটি বড় শিপিং কোম্পানির ট্

১৯ ঘণ্টা আগে