ট্রাম্পের হুমকি, তবু ইইউয়ের ‘সহযোগী সদস্য’ প্রস্তাবকে স্বাগত কার্নির

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই উদ্যোগকে ‘হাস্যকর’ আখ্যা দিয়ে ইউরোপের ওপর ‘অত্যন্ত কঠোর শুল্ক’ আরোপ এবং প্রয়োজনে বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কার্নি প্রস্তাবটির পক্ষে নিজের সমর্থন জানান।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে কার্নি ইইউয়ে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জানান, কানাডা ও ইউরোপের উচিত নিজেদের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে আরও গভীরভাবে একসঙ্গে কাজ করা। তিনি বলেন, ‘কানাডা এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে স্বাগত জানায়।’

কার্নির ভাষ্য, কানাডায় পরিচালিত জনমত জরিপেও ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে বিপুল জনসমর্থন রয়েছে।

এর আগে, বুধবার ইইউয়ের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন কানাডাকে জোটটির প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ হওয়ার দরজা খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

ফন ডার লিয়েন বলেন, কানাডা ও ইউরোপের সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যতের একটি বৃহত্তর জোটে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। তার প্রস্তাবে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো খাতে আরও গভীর সহযোগিতার কথা বলা হয়।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যখন বড় ধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন একই মূল্যবোধের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তিনি কানাডা-ইইউ সম্পর্ককে ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের কথাও জানান।

ফন ডার লিয়েনের এ প্রস্তাবকে মোটেও ভালোভাবে নেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই ভাষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। কানাডাকে ইইউয়ের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ করার পরিকল্পনাকে ‘হাস্যকর’ আখ্যা দিয়ে একে ‘শত্রুতামূলক’ উদ্যোগ হিসেবেও দেখার ইঙ্গিত দেন।

ট্রাম্প বলেন, ইইউ এই পরিকল্পনা এগিয়ে নিলে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের ওপর ‘খুব কঠোর শুল্ক’ আরোপ করতে পারে, এমনকি ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধও করতে পারে। তার ভাষায়, উদ্যোগটির উদ্দেশ্য ভালো হলে বিষয়টি এক রকম, কিন্তু উদ্দেশ্য খারাপ হলে ইউরোপকে ‘খুব বড় শুল্কে’র মুখে পড়তে হবে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন একসময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়ে কানাডা ও ইউরোপ— উভয় পক্ষই নিজেদের অংশীদারত্ব বহুমুখী করার চেষ্টা করছে।

তবে ট্রাম্পের এ বক্তব্য বিচলিত করতে পারেনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্পের হুমকির সরাসরি জবাব দেন তিনি। বলেন, কানাডার মানুষ নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে কার সঙ্গে চুক্তি করবে— সে বিষয়ে বাইরের কারও নির্দেশনা মেনে নেবে না।

কার্নি বলেন, ‘কানাডিয়ানরা ঐক্যবদ্ধ যে কেউ আমাদের বলবে না আমরা কোন ভাষায় কথা বলব। কেউ আমাদের সংস্কৃতি বা আন্তর্জাতিকভাবে কার সঙ্গে চুক্তি করব, তা নির্ধারণ করে দেবে না।’

কার্নি আরও বলেন, কানাডা ও ইউরোপের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোট গঠনের উদ্যোগ নয়। বরং লক্ষ্য হলো ‘সম্মিলিত স্থিতিস্থাপকতা’, অর্থাৎ কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে পারস্পরিক সক্ষমতার মাধ্যমে ঝুঁকি মোকাবিলা করা।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কানাডা ও ইউরোপ— দুই পক্ষই শক্তিশালী। একসঙ্গে হলে তারা আরও শক্তিশালী।’

কার্নি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তিনি কোনো তৃতীয় শক্তির বিরুদ্ধে নতুন কোনো জোট তৈরি করতে চাইছেন না, বরং গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্য কানাডা-ইউরোপের সম্পর্ককে একটি উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করাতে চান।

কী থাকছে ইইউ-কানাডা সম্ভাব্য অংশীদারত্বে

কার্নির প্রস্তাবিত সহযোগিতার পরিধি বেশ বিস্তৃত। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটিং, জ্বালানি নিরাপত্তা, মহাকাশ এবং আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।

এ ছাড়া কৃষিপণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্য ও বিস্তৃত পরিসরের সেবায় আরও সহজ ও বাধাহীন ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রস্তাব দেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী।

তরুণদের জন্যও নতুন কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এর আওতায় কানাডা ও ইউরোপের তরুণদের দুই অঞ্চলে কাজ, পড়ালেখা ও বসবাসের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কানাডাকে ইইউর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ক্রীড়া কর্মসূচি ‘ইরাসমাস প্লাস’-এ যুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছেন কার্নি।

‘সহযোগী সদস্য’ মানে কী?

তবে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— ‘সহযোগী সদস্য’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে।

ইইউয়ের চুক্তিতে বর্তমানে ‘সহযোগী সদস্য’ নামে কোনো আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ নেই। ফলে কানাডার ক্ষেত্রে এর অধিকার, দায়িত্ব, একক বাজারে প্রবেশাধিকার কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ কী হবে— এসব এখনো নির্ধারিত হয়নি।

ইইউয়ের কিছু সদস্যদেশ কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার পক্ষে থাকলেও ‘সহযোগী সদস্য’ নামটি নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে কার্নিও বিষয়টি নিয়ে নামের চেয়ে সম্পর্কের বাস্তব কাঠামোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নামকরণ ইউরোপের বিষয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো এর ‘সারবস্তু’।

কার্নি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কানাডা পূর্ণ সদস্য হওয়ার অবস্থানে নেই এবং দেশটি পূর্ণ সদস্য হতে চাইছেও না। ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কাঠামো নিয়ে কানাডার পার্লামেন্টে আলোচনা ও ভোট হবে।

কেন আরও কাছে আসছে কানাডা-ইইউ

কানাডা ও ইইউয়ের মধ্যে এরই মধ্যে বিস্তৃত বাণিজ্যিক ও খাতভিত্তিক চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কানাডা-ইইউ কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইটিএ) এবং গত জুনে সই হওয়া কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি।

তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুপক্ষের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এর পেছনে বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন ও ওয়াশিংটনের নীতিগত অনিশ্চয়তা। ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বক্তব্যও অটোয়াকে ইউরোপসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

কার্নির সরকারের দৃষ্টিতে ইউরোপ কানাডার জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বাজার পেতে পারে; আর কানাডা ইউরোপের প্রযুক্তি, উৎপাদন, প্রতিরক্ষা ও গবেষণার সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও বলেছে, ইউরোপের বাজার, গবেষণা ও উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে কানাডার জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, মহাকাশ, এআই ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সক্ষমতার সমন্বয় দুপক্ষের জন্যই নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কার্নির ভাষায়, এই সম্পর্কের লক্ষ্য ‘স্বনির্ভরতা’ নয়, বরং ‘সম্মিলিত স্থিতিস্থাপকতা’। আর সে কারণেই ট্রাম্পের আপত্তি সত্ত্বেও কানাডা-ইইউ সম্পর্ককে আরও গভীর করার প্রস্তাবটি এখন দুপক্ষের বৃহত্তর কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের অংশ হয়ে উঠছে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

রাশিয়ার বিরুদ্ধে বড় নিষেধাজ্ঞার বিল পাস মার্কিন কংগ্রেসে

আইনটি কার্যকর হলে রাশিয়ার তেল-গ্যাস কিনছে— এমন দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পাবেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানিতে ব্যবহৃত ‘শ্যাডো ফ্লিট’সহ দেশটির জ্বালানি ও আর্থিক খাতেও চাপ বাড়ানো হবে।

৮ ঘণ্টা আগে

কানাডাকে ‘সহযোগী সদস্য’ করতে চান ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতায় ইউরোপকে নিজেদের অংশীদারত্ব নতুন করে ভাবতে হবে। কানাডার সঙ্গে সম্পর্ককে ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ নিয়ে যেতে চান বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, এই সহযোগিতা কারও বিরুদ্ধে নয়; বরং নিজেদের সক্ষমতা ও শক্তি বাড়ানোর জন্য।

৯ ঘণ্টা আগে

৩ বছরে প্রথম ব্যাংক সুদের হার বাড়ল যুক্তরাষ্ট্রে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাংক সুদের হার কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার বিরোধিতা সত্ত্বেও ফেডারেল রিজার্ভের নীতি নির্ধারকরা সর্বসম্মতিক্রমে সুদের হার ৩.৫-৩.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.৭৫-৪ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছেন।

১০ ঘণ্টা আগে

গালফ নেতাদের সঙ্গে বসছেন ট্রাম্প, আলোচনায় ‘যুদ্ধ-পরবর্তী কৌশল’

অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এরই মধ্যে এ বৈঠকের জন্য প্রাথমিক আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে। আরও কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশের নেতাকেও বৈঠকে যুক্ত করা হতে পারে। হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।

১১ ঘণ্টা আগে
Advertisement