জাতিসংঘ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, ইরানের বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর দিনেই মিনাবের স্কুলে হামলার ঘটনা ঘটে, যেখানে ১২০ শিশু শিক্ষার্থীসহ ১৫০ জন নিহত হন। ছবি: সংগৃহীত

ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়ে দুটি বেসামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের ‘যৌক্তিক প্রমাণ’ পাওয়ার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্য-অনুসন্ধান মিশন। একই প্রতিবেদনে দেশ জুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বেআইনি হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক ও জোরপূর্বক গুমসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফার্স প্রদেশের লামের শহরের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে চালানো হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী ছিল বলে মনে করার মতো যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। মিশনের ভাষ্য, হামলা দুটি বেসামরিক স্থাপনায় চালানো হয় এবং এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘিত হয়ে থাকতে পারে।

মিনাবের স্কুলে হামলা

জাতিসংঘের মিশনের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি মিনাব শহরের শাজরে তাইয়্যিবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা নিয়ে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর ওই হামলা হয়।

ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ১২০ জনই ছিল শিক্ষার্থী। জাতিসংঘের মিশন বলছে, হামলার আগে ওই এলাকায় একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সামরিক কমান্ডারের উপস্থিতি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল।

তদন্ত শেষে মিশন বলেছে, হামলাটি মার্কিন বাহিনী চালিয়েছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ রয়েছে। তাদের মতে, এটি ছিল একটি বেসামরিক স্থাপনায় নির্বিচার হামলা এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুলটি আইআরজিসির একটি নৌ-স্থাপনার কাছাকাছি ছিল। ওই স্থাপনার উপস্থিতি সম্পর্কে মার্কিন বাহিনীর কাছে তথ্য থাকলেও স্কুল ভবনটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু কি না, তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। জাতিসংঘের মিশন বলেছে, স্কুলটি স্পষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য বেসামরিক স্থাপনা ছিল এবং সেটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল— এমন প্রমাণ তারা পায়নি।

মিশনের মতে, হামলার সময় বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত লাগার উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি সম্পর্কে মার্কিন বাহিনী অবগত ছিল। ফলে ঘটনাটিকে নিছক ভুল বা অবহেলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য এর আগে বলেছিলেন, ইরানে মেয়েদের একটি স্কুলকে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হামলার লক্ষ্য বানায়নি। এ ঘটনায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তও চলছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, প্রাথমিক মার্কিন তদন্তে মিনাব হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী হওয়ার সম্ভাবনা উঠে এসেছিল।

লামেরের ক্রীড়া কমপ্লেক্সেও হামলা

একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে দক্ষিণ ইরানের ফার্স প্রদেশের লামের শহরের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে হামলা নিয়ে। স্থানীয়ভাবে ওই স্থাপনাটি বেসামরিক ব্যবহারের জন্য পরিচিত ছিল। হামলার সময় সেখানে ক্রীড়া কার্যক্রম চলছিল।

জাতিসংঘের মিশন বলেছে, হামলায় ২২ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত বা আহত হন। আশপাশের আবাসিক ভবন ও একটি স্কুলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তদন্তের ভিত্তিতে মিশন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, হামলাটিও নির্বিচার ছিল এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই লামের হামলার দায় অস্বীকার করে আসছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মার্চে বলেছিল, ২৮ ফেব্রুয়ারি লামের শহর বা এর ৩০ মাইলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো হামলা চালায়নি। হামলার ভিডিওতে দেখা ক্ষেপণাস্ত্রও মার্কিন প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল নয় বলে দাবি করেছিল তারা।

অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমসের ভিডিও, ছবি ও অস্ত্রবিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে ওই হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রকে মার্কিন তৈরি প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। হামলার ধরন ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও ওই ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায় বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন।

জাতিসংঘের মিশনের নতুন সিদ্ধান্ত এ বিতর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তবে মিশনের বক্তব্য, ‘যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই যুদ্ধাপরাধ করেছে’— এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তারা পৌঁছায়নি, বরং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের পক্ষে ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ থাকার কথা বলা হয়েছে।

ইরানের বিক্ষোভ দমনেও মানবতাবিরোধী অপরাধ

প্রতিবেদনের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। মিশন বলেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক ও পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এসব কর্মকাণ্ডের কিছু অংশ মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে বলে মিশন মনে করছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে— বেআইনি হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক, জোরপূর্বক গুম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ ও অন্যান্য অমানবিক আচরণ। মিশনের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আক্রমণের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়েছে। মিশনের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের মাত্রা ও ধরন মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতা, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া ও মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি জাতিসংঘের মিশন। ইরানি সরকারি হিসাবে তিন হাজার ৩৮ জন নিহত ও ২৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। মিশনের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

মিশনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে শিশুও ছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো ও আহতদের চিকিৎসা দেওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকেও আক্রমণের অভিযোগ এসেছে। এর আগে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের পৃথক যোগাযোগেও ইরানের বিক্ষোভ দমনের সময় ব্যাপক নির্বিচার আটক, জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণের অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছিল।

ইরান এর আগে দেশটিতে পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বিক্ষোভে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার পেছনে সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাকারীদের ভূমিকা ছিল এবং তাদের বিদেশি শক্তি সমর্থন দিয়েছে।

যা বলছে ২ দেশ

জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বিষয়ে জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী মিশন তাৎক্ষণিকভাবে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে থেকেই বলে আসছেন, ইরানে তাদের সামরিক অভিযান যুদ্ধসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হয়েছে। মিনাব ও লামেরের হামলার দায় নিয়েও ওয়াশিংটন আপত্তি জানিয়েছে।

অন্যদিকে ইরান দেশটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

নতুন প্রতিবেদনে তাই একই যুদ্ধ ও সংকটের দুই দিক উঠে এসেছে— ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের সময় বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ এবং বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। উভয় ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের মিশন আরও তদন্ত ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

৩ বছরে প্রথম ব্যাংক সুদের হার বাড়ল যুক্তরাষ্ট্রে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাংক সুদের হার কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার বিরোধিতা সত্ত্বেও ফেডারেল রিজার্ভের নীতি নির্ধারকরা সর্বসম্মতিক্রমে সুদের হার ৩.৫-৩.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.৭৫-৪ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছেন।

৮ ঘণ্টা আগে

গালফ নেতাদের সঙ্গে বসছেন ট্রাম্প, আলোচনায় ‘যুদ্ধ-পরবর্তী কৌশল’

অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এরই মধ্যে এ বৈঠকের জন্য প্রাথমিক আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে। আরও কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশের নেতাকেও বৈঠকে যুক্ত করা হতে পারে। হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।

৯ ঘণ্টা আগে

সুদানে সোনার খনি ধসে অন্তত ৮২ জনের মৃত্যু

২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী ‘র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ -এর মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছে। এই সংঘাতের খরচ জোগানোর মূল উৎস বহুল আলোচিত সোনা বাণিজ্য। তীব্র খাদ্যসংকট ও চরম বেকারত্বের মুখে পড়ে দেশটির লাখ লাখ তরুণ বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব অনিরাপদ খনিতে নেমে পড়েন।

১২ ঘণ্টা আগে

অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ হচ্ছে

অস্ট্রেলিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত চাপের পেছনে অতিরিক্ত অভিবাসীকে দায়ী করে আসছে রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে কট্টর-ডানপন্থী দল 'ওয়ান নেশন'-এর পক্ষ থেকে অস্থায়ী অভিবাসী কমানোর জোর দাবির মুখে সরকার দ্রুত এই নীতি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিয়েছে।

১২ ঘণ্টা আগে
Advertisement