ইরানকে শায়েস্তা করতে সেনাদের কাছেই ‘সৃজনশীল’ কৌশল চাইল মার্কিন সেনাবাহিনী

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩: ২৩
ইরানকে চাপে ফেলতে নতুন কৌশল খুঁজছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। প্রতীকী ছবি: এআই

ইরানের ওপর আরও চাপ বাড়াতে নতুন ও অপ্রচলিত কৌশলের খোঁজ করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এ লক্ষ্যে সেনাদের কাছ থেকেই ‘সৃজনশীল’ বিভিন্ন ধারণা চেয়ে একটি ই-মেইল পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের বুধবার সেন্টকমের গোয়েন্দা শাখার ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সামরিক বিশ্লেষকদের একটি বড় দলের কাছে পাঠানো ই-মেইলে ইরানকে ‘শায়েস্তা’ করতে নতুন, সৃজনশীল ও অপ্রচলিত কৌশলের পরামর্শ চান।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ই-মেইলের মাধ্যমে এভাবে সেনাদের কাছ থেকে ধারণা চাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা। এটি ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্পের শর্তে ইরানকে সমঝোতায় বাধ্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা বিকল্পগুলো সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।

তাই নতুন পথ খুঁজতেই সেন্টকমের ওই কর্মকর্তা এমন উদ্যোগ নিয়েছেন বলে মনে করছেন তারা। দ্বিতীয় সূত্রটি জানিয়েছে, সেন্টকম এখন সব ধরনের সম্ভাব্য বিকল্প পর্যালোচনা এবং বর্তমান কৌশল নতুন করে মূল্যায়ন করছে।

সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স এক বিবৃতিতে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের নতুন ও উদ্ভাবনী উপায়ে চিন্তা ও কাজ করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে অ্যাডমিরাল কুপার দলের সদস্যদের কাছ থেকে ধারণা নেন, যাতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা যায়।”

এই ই-মেইল পাঠানোর কয়েক দিন পরই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার হুমকি দেন। তবে গত সপ্তাহের শেষ দিকে সৌদি আরবের যুবরাজসহ আঞ্চলিক নেতারা ফোন করে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানালে তিনি সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন।

এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। এসব হামলার উদ্দেশ্য হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল করা এবং তেহরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতার লক্ষণ দেখা যায়নি।

এদিকে ট্রাম্প সামরিক অভিযান আরও জোরদারের বিষয়টিও বিবেচনা করছেন। এর মধ্যে গত গ্রীষ্মে হামলার পরও অবশিষ্ট থাকা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আবারও ব্যাপক হামলার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও আগের হামলার পর তিনি দাবি করেছিলেন, সেসব স্থাপনা পুরোপুরি ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে।

মার্কিন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনসহ কয়েকটি স্থাপনায় নতুন করে হামলার প্রস্তুতি চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, এসব স্থাপনায় এখনো পারমাণবিক উপাদান বা সরঞ্জাম থাকতে পারে।

তবে সূত্রগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্র দিয়েও এসব স্থাপনা ধ্বংস করা কঠিন, কারণ সেগুলো গভীর ভূগর্ভে নির্মিত। সেগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হলে স্থল সেনা মোতায়েন করতে হতে পারে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সে পথে যেতে রাজি হননি।

এর পাশাপাশি যুদ্ধে মার্কিন সেনা হতাহতের তথ্য প্রকাশে তার প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখন পর্যন্ত সংঘাতে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প এমন ধরনের হামলার কথাও ভাবছেন, যা অনেকটা ‘আতশবাজির প্রদর্শনীর’ মতো হবে। এতে এক বছর আগে যেসব স্থাপনায় হামলা হয়েছিল, সেগুলো বা একই ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আবার হামলা চালানো হতে পারে। উদ্দেশ্য হবে প্রতীকী একটি বিজয় দেখিয়ে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা, যদিও এতে তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য— ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা অর্জিত নাও হতে পারে।

তবে এমন হামলা হলেও যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু— হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কর্তৃত্বের দাবি সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাম্প্রতিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সম্পর্কে অবহিত আরেকটি সূত্র বলেছে, “শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট একটি সমঝোতাই চাইবেন। তাই তিনি একদিকে কঠোর অবস্থান দেখাবেন, অন্যদিকে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথও খুঁজবেন।”

সূত্রটি আরও বলেছে, “প্রচলিত বিকল্পগুলো ফুরিয়ে এলে সৃজনশীল চিন্তার প্রয়োজন হয়।”

সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) মূল্যায়ন করেছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের বোমাবর্ষণ চালাচ্ছে, তা ইরানের আলোচনার অবস্থান পরিবর্তনে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ উপদেষ্টা এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। গত মাসে সিনেটরদের তিনি বলেন, “বিমান শক্তিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”

কয়েক মাস ধরেই সংঘাত আরও বাড়ানোর বিভিন্ন বিকল্প ট্রাম্পের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের অপেক্ষায় এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জামও পাঠানো হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সেন্টকমের একটি পরিকল্পনায় এক থেকে দুই সপ্তাহ ধরে ব্যাপক বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার কথা রয়েছে। তবে ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সে পরিকল্পনায় অনুমোদন দেননি।

এর একটি কারণ, জেনারেল কেইন তাকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। অন্য কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছেন, সেতু ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রের মতো অবকাঠামোয় হামলা হলে ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সংঘাত আরও বাড়াতে চাইলে ট্রাম্প স্থল সেনা মোতায়েনের পথও বেছে নিতে পারেন। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ দখল বা ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি আগেও এমন হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু তা হলে ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারে সমর্থকদের দেওয়া তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হবে। তিনি বলেছিলেন, “অন্তহীন ও অর্থহীন বিদেশি যুদ্ধে লড়তে এবং মরতে আমি আপনাদের পাঠাব না।”

অন্যদিকে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিও মেনে নিতে পারেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনির্দিষ্টকাল হামলা ও পালটা হামলা চলতে থাকবে। এতে আরও মার্কিন সেনা হতাহতের আশঙ্কা থাকবে এবং হরমুজ প্রণালি স্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে থাকবে। যা অতীতে ট্রাম্পের নিজেরই সমালোচনা করা ‘অন্তহীন যুদ্ধে’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

শুক্রবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে যুদ্ধ কীভাবে শেষ করতে চান— এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমরা শুধু জিততে চাই। আমরা তাদের ওপর খুব কঠোরভাবে হামলা চালাব। একসময় তারা বলবে, ‘আমরা আর এটা সহ্য করতে পারছি না।’”

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

আস্থার সংকট, তবু ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা আলোচনায় ফেরার আশা সিরিয়ার

দামেস্কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাইবানি বলেন, সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে স্থগিত রয়েছে। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগের দরজা এখনো খোলা এবং শিগগিরই আলোচনা ফেরার আশা করছে সিরিয়া।

৭ ঘণ্টা আগে

সীমান্ত নিয়ে আলোচনায় চীন সফরে যাচ্ছেন ভারতের অজিত দোভাল

সোমবার (২৪ আগস্ট) বেইজিং যাচ্ছেন অজিত দোভাল। সফরে ভারতের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন তিনি। অন্যদিকে চীনের সীমান্তবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। আগামী মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুই দেশের মধ্যে বৈঠকটি হবে।

১৮ ঘণ্টা আগে

ইরান যুদ্ধে নতুন মোড়— ওয়াশিংটনের ‘কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা’ বনাম তেহরানের পালটা হুঁশিয়ারি

ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে নতুন করে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা’ ঘোষণা করা হবে। তবে ওয়াশিংটনের এই হুমকির মুখেও পিছু হটার ইঙ্গিত নেই ইরানের। বরং নতুন নিষেধাজ্ঞাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘হতাশার

১৯ ঘণ্টা আগে

নির্বাচনের ‘বিপক্ষে’ জেলেনস্কি, বললেন যুদ্ধের মধ্যে ভোট হলে ইউক্রেন ধ্বংস হবে

সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময়ে জেলেনস্কি বলেন, ‘আমরা যদি দেশকে ধ্বংস করতে চাই, তাহলে এমন যুদ্ধের মধ্যে নির্বাচনের দিকে এগোতে পারি।’ তার মতে, এখন নির্বাচন আয়োজন করলে তা ‘রাষ্ট্রের জন্য সুনামি’ হয়ে দাঁড়াবে এবং ইউক্রেনকে বিভক্ত করে ফেলতে পারে।

২০ ঘণ্টা আগে