
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যিনি বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান। এমনকি যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্বে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও প্রকাশ করেছিলেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফিরে সেই ট্রাম্পই এখন ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সামরিক হামলা ও কঠোর হুমকির নীতি অনুসরণ করছেন। তার বক্তব্য ও পদক্ষেপে এমন ধারণাই তৈরি হচ্ছে, যেন ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে যুদ্ধের হুমকি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পালটা হামলা শুরু হওয়ার পর কয়েক ডজন ইরানি নিহত হয়েছেন। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এই সংঘাতে প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— ট্রাম্প কি এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন, যার শেষ কোথায়, সেটি তার নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়?
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো কখন, কোথায় এবং কীভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া। পেন্টাগন আগের তুলনায় এখন মার্কিন হতাহত ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য কম প্রকাশ করলেও যুদ্ধের বাস্তব ঝুঁকি যে রয়ে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
যুদ্ধ কিংবা যুদ্ধের হুমকিকে যদি সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্যের মতো উপস্থাপন করা হয়, তবে সেটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করে। কারণ, এতে সহিংসতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠে এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের নৈতিক সীমারেখাও দুর্বল হতে থাকে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অপ্রচলিত ও প্রায়ই অপ্রত্যাশিত কৌশল কখনো কখনো বাস্তব কিংবা অনিচ্ছাকৃত কিছু ফলও এনে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন যে পূর্বসূরিদের তুলনায় আলাদা, সে বিষয়ে খুব একটা বিতর্ক নেই। তবে সেই ব্যতিক্রমী পদ্ধতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধের হুমকিও যেন প্রতিদিনের রাজনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে উঠছে।
গত মাসে ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক কার্যত ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত সেই সমঝোতা আর কার্যকর থাকবে না— এমন বাস্তবতা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার মধ্যেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরও ধ্বংসাত্মক হামলার হুমকি দিয়ে চলেছেন।
বলপ্রয়োগের নৈতিকতা এবং প্রতিরোধমূলক কৌশল হিসেবে এর কার্যকারিতা— উভয় দিক থেকেই বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কারণ, ট্রাম্প যেসব ধরনের হামলার কথা প্রকাশ্যে বলছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কূটনৈতিক আচরণগত মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গত কয়েক দশকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও একটি বিষয়ে ওয়াশিংটন ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রেখেছে। সেটি হলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার অঙ্গীকার এবং সামরিক শক্তিকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা। যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা এবং বলপ্রয়োগকে অনিবার্য হিসেবে তুলে ধরাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত নীতি।
কিন্তু ট্রাম্প এখন প্রকাশ্যেই ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো— যেমন সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার কথা বলছেন। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের স্থাপনায় ইচ্ছাকৃত হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়েও পড়তে পারে।
ট্রাম্পের সমর্থকরা যুক্তি দিতে পারেন, আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত সংজ্ঞাগুলো আর আগের মতো কার্যকর নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতে এমন বহু নজির তৈরি হয়েছে, যা যুদ্ধকে আরও নির্মম করেছে। তবু আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো এখনো বহাল রয়েছে এবং যথেষ্ট কারণেই তা বহাল আছে। অথচ ট্রাম্প প্রকাশ্যে সেই সীমারেখা অতিক্রম করার কথাই বলছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালান, তখন পশ্চিমা দেশগুলো তার কঠোর সমালোচনা করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত কয়েক দশকে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যে সতর্কতা দেখিয়েছে, সেটিই পেন্টাগনের সামরিক সক্ষমতার কার্যকারিতা ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র একাধিক যুদ্ধে জড়িয়েছে, তবে প্রতিবারই কেন সেই যুদ্ধ প্রয়োজন, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সেই প্রচলিত নীতি থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ঘটনাটিও ছিল ট্রাম্পের ‘দুঃসাহসী ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ পদক্ষেপগুলোর একটি। সময়ের সঙ্গে সেটি ওয়াশিংটনের জন্য কিছু কৌশলগত সুবিধা এনে দিলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অলিখিত নীতিকে দুর্বল করেছে।
প্রথমত, কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে কেবল রাজনৈতিক কারণে তার নিজ রাজধানী থেকে অপহরণ না করার যে আন্তর্জাতিক রীতি রয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ— বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে শান্তিকামী নেতার ভাবমূর্তি গড়ে তোলার যে চেষ্টা ট্রাম্প করেছিলেন, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এখন ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, যার সমাপ্তির কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই ‘হালকা সংস্করণের অন্তহীন যুদ্ধে’র উদ্দেশ্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে, সামরিক লক্ষ্যও বারবার বদলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এই যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনও ধীরে ধীরে কমছে। অন্যদিকে ইরান তুলনামূলকভাবে ধৈর্যশীল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
গত মাসের সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে, তা ইরানের কট্টরপন্থিদের জন্য সহজেই লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। ওই চুক্তিতে ইরান এমন একটি পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগে সম্মত হয়েছিল, যার অস্তিত্ব তেহরান বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে দেশটি কয়েক শ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারত। কিন্তু এখন তেহরানের দাবি, পরিস্থিতি আবারও প্রায় ফেব্রুয়ারির অবস্থায় ফিরে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের টানা ১৩ হাজারের বেশি হামলার পরও ইরানকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। বরং দেশটি সময়ের সঙ্গে নিজেদের সামরিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল আধুনিক গোলাবারুদের মজুত পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অথচ ইরানের জন্য নতুন সামরিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা কিংবা ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে দেখা দিচ্ছে।
এখানেই অব্যবহৃত সামরিক শক্তির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি রাষ্ট্রের হাতে বিপুল সামরিক সক্ষমতা থাকলেই যে সেটি সব পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে, এমন নয়। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়— সেই রাষ্ট্র বাস্তবে কত দূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত এবং তার রাজনৈতিক সংকল্পের সীমা কোথায়।
‘ফরএভার ওয়ার’ বা ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ শব্দটি প্রথম জনপ্রিয়তা পায় আফগানিস্তান যুদ্ধকে ঘিরে। সেখানে বিপুল অর্থ, আধুনিক অস্ত্র ও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে বের হতে পারেনি। সামরিকভাবে আরও অনেক কিছু করার সক্ষমতা ওয়াশিংটনের ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক ও মানবিক মূল্য বিবেচনায় সেই পথ শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয়নি। অথচ আফগানিস্তানে যুদ্ধের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার প্রতিশোধ নেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলা ঠেকানো।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই মার্কিন জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেননি, কেন এই যুদ্ধ অপরিহার্য। বরং তিনি এমনভাবে সংঘাতকে উপস্থাপন করেছেন, যেন খুব সামান্য মূল্যেই এর সমাপ্তি ঘটানো সম্ভব। এ কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘কোক জিরো যুদ্ধে’র সঙ্গে তুলনা করা যায়— অর্থাৎ এমন এক যুদ্ধ, যার মূল্য যেন প্রায় শূন্য বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। ট্রাম্প যেন আগে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, পরে তার রাজনৈতিক ও সামরিক পরিণতি নিয়ে ভাবছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মূল্যায়নের ওপর আস্থা রেখে তিনি সংঘাতকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখেছেন।
কিন্তু ইরানের সরকার পতন হলে এরপর কী ঘটবে, প্রথম হামলার এক মাস পর পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে কিংবা দুই সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে— এসব প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের ছিল বলে মনে হয় না। যুদ্ধ শুরুর এই তাড়াহুড়োই এখন সংঘাতের অগোছালো গতিপথে প্রতিফলিত হচ্ছে।
একটি যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু সেটিকে রাজনৈতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত পরিণতিতে পৌঁছানো অনেক বেশি কঠিন। শুধু মস্কো বা বেইজিং নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিপক্ষও এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রতিরাতে ইরানে প্রাণহানি যদি এমন এক আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়, যাকে কেবল কাঁধ ঝাঁকিয়ে মেনে নেওয়া যায়, তবে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ইরানের সঙ্গে বর্তমান সংঘাত আবারও মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। ট্রাম্প চাইলে আরও বড় ধরনের বিমান হামলা বা কৌশলগত স্থানে স্থলবাহিনী পাঠানোর হুমকি দিতে পারেন। কিন্তু প্রতিবার এমন হুমকি বাস্তবে কার্যকর না হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে অন্তত দুটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমটি অর্থনৈতিক। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। মজুত কমে আসায় তেলের বাজার আবারও চাপে পড়ছে। ইতিহাস বলছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রায় সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্তে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলেছে।
দ্বিতীয় সীমাবদ্ধতাটি রাজনৈতিক। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট হয়তো আর দীর্ঘ রাজনৈতিক ভবিষ্যতের হিসাব করছেন না। তবে নিজের উত্তরসূরির হাতে একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি তুলে দেওয়া এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন— দুটি বিষয়ই তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সেই রাজনৈতিক মূল্যও বাড়বে।
অন্যদিকে, ইরানের কট্টরপন্থি সরকার কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকতেই এক ধরনের কৌশলগত বিজয় অর্জন করছে। বছরের শুরুতে দেশটি বড় ধরনের জনঅসন্তোষের মুখে ছিল। এরপর সরকারের জনপ্রিয়তা নাটকীয়ভাবে না বাড়লেও অতিরিক্ত সামরিক চাপের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
আফগানিস্তানের তালেবান ও ইরাকের বিদ্রোহীরা দীর্ঘদিন সড়কপথে বোমা হামলা ও ধারাবাহিক প্রতিরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। তবে তারা রাষ্ট্র ছিল না। ইরান যদি একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে একই ধরনের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে, তবে তার প্রভাব বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে আরও গভীর হতে পারে। এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিই নয়, তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সক্ষমতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠবে।
গত এক বছরে ধারাবাহিক লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক নেতাদের হারানোর পরও ইরান রাষ্ট্রীয় কাঠামো সচল রাখতে পেরেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিকেও এমন অবস্থায় নিয়ে এসেছে, যেখানে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর জন্য ওয়াশিংটনকে বারবার সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এই সংঘাতের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। শেষ পর্যন্ত আলোচনা শুরু হলেও দুই পক্ষ প্রায় সেই অবস্থানেই ফিরে যেতে পারে, যেখানে তারা ফেব্রুয়ারিতে ছিল। অর্থাৎ দীর্ঘ সংঘাত, বিপুল প্রাণহানি ও বিপুল সামরিক ব্যয়ের পরও যদি আলোচনার সূচনা প্রায় একই জায়গা থেকে করতে হয়, তবে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ধরনের ভুলের ইঙ্গিত বহন করে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে দ্রুত নতি স্বীকার করানো যাবে— ট্রাম্প প্রশাসনের এই ধারণাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে। যে সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তি প্রত্যাশা করা হয়েছিল, সেটিই ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। আর সেই পথই যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেলে দিতে পারে আরেকটি নতুন ‘ফরএভার ওয়ার’— অর্থাৎ ‘অন্তহীন যুদ্ধে’র দিকে।
[মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনে প্রকাশিত নিবন্ধের ভাবানুবাদ। মূল নিবন্ধটি লিখেছেন একাধিক এমি পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক নিক প্যাটন ওয়ালশ। তিনি লন্ডনভিত্তিক সিএনএনের প্রধান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদদাতা]

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যিনি বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান। এমনকি যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্বে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও প্রকাশ করেছিলেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফিরে সেই ট্রাম্পই এখন ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সামরিক হামলা ও কঠোর হুমকির নীতি অনুসরণ করছেন। তার বক্তব্য ও পদক্ষেপে এমন ধারণাই তৈরি হচ্ছে, যেন ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে যুদ্ধের হুমকি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পালটা হামলা শুরু হওয়ার পর কয়েক ডজন ইরানি নিহত হয়েছেন। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এই সংঘাতে প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— ট্রাম্প কি এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন, যার শেষ কোথায়, সেটি তার নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়?
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো কখন, কোথায় এবং কীভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া। পেন্টাগন আগের তুলনায় এখন মার্কিন হতাহত ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য কম প্রকাশ করলেও যুদ্ধের বাস্তব ঝুঁকি যে রয়ে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
যুদ্ধ কিংবা যুদ্ধের হুমকিকে যদি সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্যের মতো উপস্থাপন করা হয়, তবে সেটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করে। কারণ, এতে সহিংসতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠে এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের নৈতিক সীমারেখাও দুর্বল হতে থাকে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অপ্রচলিত ও প্রায়ই অপ্রত্যাশিত কৌশল কখনো কখনো বাস্তব কিংবা অনিচ্ছাকৃত কিছু ফলও এনে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন যে পূর্বসূরিদের তুলনায় আলাদা, সে বিষয়ে খুব একটা বিতর্ক নেই। তবে সেই ব্যতিক্রমী পদ্ধতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধের হুমকিও যেন প্রতিদিনের রাজনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে উঠছে।
গত মাসে ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক কার্যত ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত সেই সমঝোতা আর কার্যকর থাকবে না— এমন বাস্তবতা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার মধ্যেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরও ধ্বংসাত্মক হামলার হুমকি দিয়ে চলেছেন।
বলপ্রয়োগের নৈতিকতা এবং প্রতিরোধমূলক কৌশল হিসেবে এর কার্যকারিতা— উভয় দিক থেকেই বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কারণ, ট্রাম্প যেসব ধরনের হামলার কথা প্রকাশ্যে বলছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কূটনৈতিক আচরণগত মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গত কয়েক দশকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও একটি বিষয়ে ওয়াশিংটন ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রেখেছে। সেটি হলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার অঙ্গীকার এবং সামরিক শক্তিকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা। যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা এবং বলপ্রয়োগকে অনিবার্য হিসেবে তুলে ধরাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত নীতি।
কিন্তু ট্রাম্প এখন প্রকাশ্যেই ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো— যেমন সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার কথা বলছেন। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের স্থাপনায় ইচ্ছাকৃত হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়েও পড়তে পারে।
ট্রাম্পের সমর্থকরা যুক্তি দিতে পারেন, আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত সংজ্ঞাগুলো আর আগের মতো কার্যকর নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতে এমন বহু নজির তৈরি হয়েছে, যা যুদ্ধকে আরও নির্মম করেছে। তবু আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো এখনো বহাল রয়েছে এবং যথেষ্ট কারণেই তা বহাল আছে। অথচ ট্রাম্প প্রকাশ্যে সেই সীমারেখা অতিক্রম করার কথাই বলছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালান, তখন পশ্চিমা দেশগুলো তার কঠোর সমালোচনা করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত কয়েক দশকে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যে সতর্কতা দেখিয়েছে, সেটিই পেন্টাগনের সামরিক সক্ষমতার কার্যকারিতা ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র একাধিক যুদ্ধে জড়িয়েছে, তবে প্রতিবারই কেন সেই যুদ্ধ প্রয়োজন, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সেই প্রচলিত নীতি থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ঘটনাটিও ছিল ট্রাম্পের ‘দুঃসাহসী ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ পদক্ষেপগুলোর একটি। সময়ের সঙ্গে সেটি ওয়াশিংটনের জন্য কিছু কৌশলগত সুবিধা এনে দিলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অলিখিত নীতিকে দুর্বল করেছে।
প্রথমত, কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে কেবল রাজনৈতিক কারণে তার নিজ রাজধানী থেকে অপহরণ না করার যে আন্তর্জাতিক রীতি রয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ— বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে শান্তিকামী নেতার ভাবমূর্তি গড়ে তোলার যে চেষ্টা ট্রাম্প করেছিলেন, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এখন ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, যার সমাপ্তির কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই ‘হালকা সংস্করণের অন্তহীন যুদ্ধে’র উদ্দেশ্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে, সামরিক লক্ষ্যও বারবার বদলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এই যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনও ধীরে ধীরে কমছে। অন্যদিকে ইরান তুলনামূলকভাবে ধৈর্যশীল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
গত মাসের সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে, তা ইরানের কট্টরপন্থিদের জন্য সহজেই লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। ওই চুক্তিতে ইরান এমন একটি পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগে সম্মত হয়েছিল, যার অস্তিত্ব তেহরান বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে দেশটি কয়েক শ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারত। কিন্তু এখন তেহরানের দাবি, পরিস্থিতি আবারও প্রায় ফেব্রুয়ারির অবস্থায় ফিরে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের টানা ১৩ হাজারের বেশি হামলার পরও ইরানকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। বরং দেশটি সময়ের সঙ্গে নিজেদের সামরিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল আধুনিক গোলাবারুদের মজুত পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অথচ ইরানের জন্য নতুন সামরিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা কিংবা ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে দেখা দিচ্ছে।
এখানেই অব্যবহৃত সামরিক শক্তির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি রাষ্ট্রের হাতে বিপুল সামরিক সক্ষমতা থাকলেই যে সেটি সব পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে, এমন নয়। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়— সেই রাষ্ট্র বাস্তবে কত দূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত এবং তার রাজনৈতিক সংকল্পের সীমা কোথায়।
‘ফরএভার ওয়ার’ বা ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ শব্দটি প্রথম জনপ্রিয়তা পায় আফগানিস্তান যুদ্ধকে ঘিরে। সেখানে বিপুল অর্থ, আধুনিক অস্ত্র ও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে বের হতে পারেনি। সামরিকভাবে আরও অনেক কিছু করার সক্ষমতা ওয়াশিংটনের ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক ও মানবিক মূল্য বিবেচনায় সেই পথ শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয়নি। অথচ আফগানিস্তানে যুদ্ধের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার প্রতিশোধ নেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলা ঠেকানো।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই মার্কিন জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেননি, কেন এই যুদ্ধ অপরিহার্য। বরং তিনি এমনভাবে সংঘাতকে উপস্থাপন করেছেন, যেন খুব সামান্য মূল্যেই এর সমাপ্তি ঘটানো সম্ভব। এ কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘কোক জিরো যুদ্ধে’র সঙ্গে তুলনা করা যায়— অর্থাৎ এমন এক যুদ্ধ, যার মূল্য যেন প্রায় শূন্য বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। ট্রাম্প যেন আগে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, পরে তার রাজনৈতিক ও সামরিক পরিণতি নিয়ে ভাবছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মূল্যায়নের ওপর আস্থা রেখে তিনি সংঘাতকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখেছেন।
কিন্তু ইরানের সরকার পতন হলে এরপর কী ঘটবে, প্রথম হামলার এক মাস পর পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে কিংবা দুই সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে— এসব প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের ছিল বলে মনে হয় না। যুদ্ধ শুরুর এই তাড়াহুড়োই এখন সংঘাতের অগোছালো গতিপথে প্রতিফলিত হচ্ছে।
একটি যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু সেটিকে রাজনৈতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত পরিণতিতে পৌঁছানো অনেক বেশি কঠিন। শুধু মস্কো বা বেইজিং নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিপক্ষও এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রতিরাতে ইরানে প্রাণহানি যদি এমন এক আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়, যাকে কেবল কাঁধ ঝাঁকিয়ে মেনে নেওয়া যায়, তবে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ইরানের সঙ্গে বর্তমান সংঘাত আবারও মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। ট্রাম্প চাইলে আরও বড় ধরনের বিমান হামলা বা কৌশলগত স্থানে স্থলবাহিনী পাঠানোর হুমকি দিতে পারেন। কিন্তু প্রতিবার এমন হুমকি বাস্তবে কার্যকর না হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে অন্তত দুটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমটি অর্থনৈতিক। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। মজুত কমে আসায় তেলের বাজার আবারও চাপে পড়ছে। ইতিহাস বলছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রায় সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্তে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলেছে।
দ্বিতীয় সীমাবদ্ধতাটি রাজনৈতিক। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট হয়তো আর দীর্ঘ রাজনৈতিক ভবিষ্যতের হিসাব করছেন না। তবে নিজের উত্তরসূরির হাতে একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি তুলে দেওয়া এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন— দুটি বিষয়ই তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সেই রাজনৈতিক মূল্যও বাড়বে।
অন্যদিকে, ইরানের কট্টরপন্থি সরকার কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকতেই এক ধরনের কৌশলগত বিজয় অর্জন করছে। বছরের শুরুতে দেশটি বড় ধরনের জনঅসন্তোষের মুখে ছিল। এরপর সরকারের জনপ্রিয়তা নাটকীয়ভাবে না বাড়লেও অতিরিক্ত সামরিক চাপের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
আফগানিস্তানের তালেবান ও ইরাকের বিদ্রোহীরা দীর্ঘদিন সড়কপথে বোমা হামলা ও ধারাবাহিক প্রতিরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। তবে তারা রাষ্ট্র ছিল না। ইরান যদি একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে একই ধরনের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে, তবে তার প্রভাব বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে আরও গভীর হতে পারে। এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিই নয়, তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সক্ষমতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠবে।
গত এক বছরে ধারাবাহিক লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক নেতাদের হারানোর পরও ইরান রাষ্ট্রীয় কাঠামো সচল রাখতে পেরেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিকেও এমন অবস্থায় নিয়ে এসেছে, যেখানে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর জন্য ওয়াশিংটনকে বারবার সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এই সংঘাতের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। শেষ পর্যন্ত আলোচনা শুরু হলেও দুই পক্ষ প্রায় সেই অবস্থানেই ফিরে যেতে পারে, যেখানে তারা ফেব্রুয়ারিতে ছিল। অর্থাৎ দীর্ঘ সংঘাত, বিপুল প্রাণহানি ও বিপুল সামরিক ব্যয়ের পরও যদি আলোচনার সূচনা প্রায় একই জায়গা থেকে করতে হয়, তবে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ধরনের ভুলের ইঙ্গিত বহন করে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে দ্রুত নতি স্বীকার করানো যাবে— ট্রাম্প প্রশাসনের এই ধারণাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে। যে সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তি প্রত্যাশা করা হয়েছিল, সেটিই ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। আর সেই পথই যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেলে দিতে পারে আরেকটি নতুন ‘ফরএভার ওয়ার’— অর্থাৎ ‘অন্তহীন যুদ্ধে’র দিকে।
[মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনে প্রকাশিত নিবন্ধের ভাবানুবাদ। মূল নিবন্ধটি লিখেছেন একাধিক এমি পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক নিক প্যাটন ওয়ালশ। তিনি লন্ডনভিত্তিক সিএনএনের প্রধান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদদাতা]

রোববার (১৬ আগস্ট) মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের নামের তালিকা মিয়ানমারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে বাংলাদেশে অবস্থানরত রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
২১ ঘণ্টা আগে
মার্কিন সেনাদের আটক বা হত্যা করে ইরানের কাছে হস্তান্তর করতে পারলে প্রায় ৩০ হাজার ডলার (৫ বিলিয়ন ইরানি তোমান) পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, কোনো নারী এ ধরনের কাজ করলে তাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেওয়া হবে।
১ দিন আগে
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠে একটি পাঁচতলা হোটেলে ভয়াবহ আগুনে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আগুনে দগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে তারা মারা গেছেন। এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত হতাহতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
১ দিন আগে
মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরে সোমবার (১৭ আগস্ট) শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের (ইউএনসিসিডি) ১৭তম সম্মেলন— কপ১৭। ২৮ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এই বৈঠক। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে উন্নয়নশীল ও খরাপ্রবণ দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ কীভাবে বাস্তব প্রকল্পে ব্
১ দিন আগে