গাজার ৭০% দখলের নির্দেশ নেতানিয়াহুর, যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে পড়ার শঙ্কা

গাজার ৭০% দখলের নির্দেশ নেতানিয়াহুর, যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে পড়ার শঙ্কা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

গাজা উপত্যকার ৭০ শতাংশ এলাকা দখলে নেওয়ার জন্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার এই ঘোষণাকে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এতে গাজায় আরও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইসরায়েলি বাহিনী গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখে একটি নির্ধারিত সীমারেখায় অবস্থান নেয়। তবে এরপর থেকেই ধীরে ধীরে তারা পশ্চিমমুখী অগ্রসর হয়ে হামাস-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর দিকে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে আসছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ ঘোষণা করে সেখানে যেকোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অধিকার দাবি করছে ইসরায়েল।

সম্প্রতি ইসরায়েল-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও ওই সীমান্তবর্তী এলাকা খালি করতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়িঘর ও আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

একটি পশ্চিম তীরের বসতিতে আয়োজিত সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা এখন হামাসকে চেপে ধরছি। বর্তমানে গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে। আগে ছিল ৫০ শতাংশ। এখন আমি নির্দেশ দিয়েছি, সেটিকে ৭০ শতাংশে নিতে হবে।’

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা। তিনি একে ‘স্বেচ্ছামূলক স্থানান্তর’ বলে উল্লেখ করেন, তবে মানবাধিকার কর্মীরা একে দীর্ঘমেয়াদি জাতিগত নির্মূল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে গেলে ২২ লাখ ফিলিস্তিনিকে উপত্যকার এক-তৃতীয়াংশেরও কম এলাকায় গাদাগাদি করে বসবাস করতে হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ওই অঞ্চল আগে থেকেই চরম জনঘনত্ব ও মানবিক সংকটে ভুগছে।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভিজিটিং ফেলো মোহাম্মদ শেহাদা বলেন, ‘নেতানিয়াহু কার্যত পুরো ট্রাম্প পরিকল্পনাকেই বাতিল ঘোষণা করছেন। এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই।’

চলমান যুদ্ধবিরতির আট মাসেও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো এবং গাজার ভেতরে বিমান হামলা বন্ধ করেনি ইসরায়েলি বাহিনী। বরং বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৯০০’র বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

জাতিসংঘের এক অভ্যন্তরীণ ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, উত্তর গাজার জাবালিয়া ও দক্ষিণের খান ইউনিস অঞ্চলেও ইসরায়েলি ট্যাংক অগ্রসর হচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল-সমর্থিত মিলিশিয়াগুলো সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে দিতে চাপ তৈরি করছে।

দেইর আল-বালাহ এলাকার বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী ওয়ায়েল নায়েফ আবু আল-আজিন জানান, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, ‘তারা এসে জানায়, রাত ১০টার মধ্যে এলাকা খালি করতে হবে। যা বহন করা যায়, তা নিয়ে চলে যেতে বলে।’

আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্টের গবেষক নাসের খদোউর বলেন, এসব মিলিশিয়া শুধু হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে না, বরং সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষকেও আরও পশ্চিমে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ ও গ্রেপ্তারের অভিযোগও রয়েছে।

অন্যদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তত্ত্বাবধানে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা শান্তি বোর্ডের প্রধান প্রতিনিধি নিকোলাই ম্ল্যাডেনভ সম্প্রতি দেওয়া প্রতিবেদনে যুদ্ধবিরতি ভাঙনের জন্য মূলত হামাসকে দায়ী করেন। তবে সমালোচকরা বলছেন, সেখানে ইসরায়েলের চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হয়েছে।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক গেরশন বাসকিন মনে করেন, মূল যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা কার্যত ভেঙে পড়েছে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিকল্প পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পুনর্গঠন করা হবে এবং হামাস-সংযোগ নেই— এমন ফিলিস্তিনিদেরই সেখানে যেতে দেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, শেষ পর্যন্ত তথাকথিত “ইয়েলো জোনে” শুধু হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে রেখে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর ইসরায়েল তাদের বিরুদ্ধে যা ইচ্ছা করতে পারবে— এমন পরিকল্পনাই সামনে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বড় সুবিধা পাবে আইআরজিসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য

যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দৃষ্টিতে যাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটিতে পরিণত হতে পারে।

৬ ঘণ্টা আগে

‘বিশ্বাসঘাতক’ ট্রাম্পের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় ক্ষোভ, এককভাবে লড়াইয়ের পক্ষে ইসরায়েলিরা

৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন এই নেতা এখন ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখনও তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।

৬ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা: সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন উইটকফ ও আরাগচি

লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর অন্তর্বর্তীকালীন ইরান যুদ্ধ চুক্তিকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক চুক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা আবারও জোরদার হয়েছে। এই আলোচনার অংশ হিসেবে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি উভয়েই সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে এক্সিওসের বরাতে জানিয়ে

৮ ঘণ্টা আগে

ইরান ইস্যুই গড়তে পারে জে ডি ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী এ ধরনের হাই-প্রোফাইল আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর। কিন্তু ট্রাম্প দৃশ্যত রুবিওর পরিবর্তে ভ্যান্সকেই সামনে নিয়ে এসেছেন। ফলে প্রশাসনের ভেতরে রুবিওর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

৯ ঘণ্টা আগে