ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা নিয়ে ধোঁয়াশা, হরমুজে জাহাজে হামলায় বাড়ল উদ্বেগ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ থেকে হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি জাহাজ চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে দুই দেশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালির কাছে একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে একটি পণ্যবাহী জাহাজ অজ্ঞাত একটি বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সংকেত পাঠিয়েছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রণালি দিয়ে যেত। তবে ইরান এটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পর কৌশলগত এই নৌপথ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং তেহরানের জন্য এটি একটি ‘শেষ সুযোগ’— যাতে তারা একটি চুক্তিতে সই করতে পারে। তবে ট্রাম্পের এ দাবি তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে দেয় তেহরান। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না এবং এমন কোনো বৈঠকের পরিকল্পনাও নেই।

হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আলোচনা এখনই চলছে।” তিনি দাবি করেন, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ কয়েকটি দেশের অনুরোধে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “তাদের (ইরানের) জন্য এটি একটি ভালো নথিতে সই করার শেষ সুযোগ।”

এর আগে গত সপ্তাহের শেষ দিকে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অনুমোদন দেওয়া ‘ভয়াবহ হামলা’ স্থগিত করেছেন, কারণ আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। এর আগেও বড় ধরনের সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে পরে তা প্রত্যাহারের নজির রয়েছে তাঁর।

অন্যদিকে, সোমবার এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না এবং কোনো বৈঠকেরও সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি। তিনি জানান, আগামী কয়েক দিনে ইরানের কোনো বিদেশি প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানানোর বা বিদেশে আলোচক পাঠানোর পরিকল্পনাও নেই।

বাঘাই আরও বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ধর্মীয় সফরে ইরাকে থাকলেও অন্য সব ইরানি আলোচক দেশেই অবস্থান করছেন। বর্তমানে কেবল ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতিও দুই দেশের চলমান অচলাবস্থার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ছয়টি জাহাজ চলাচল করেছে। এর মধ্যে ছিল তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার ও তিনটি বাল্ক ক্যারিয়ার। আগের দিন এ সংখ্যা ছিল সাতটি।

শেয়ারবাজারে উত্থান, কমেছে তেলের দাম

তবু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমতে পারে— এমন আশায় সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে এবং প্রধান শেয়ারবাজারগুলোর সূচক বেড়েছে।

ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৩ দশমিক ৭৭ ডলারে নেমে আসে। একই দিন ডাও জোন্স সূচক রেকর্ড উচ্চতায় লেনদেন শেষ করে। মঙ্গলবার এশিয়ার শেয়ারবাজার ও তেলের দাম— দুটিই সামান্য বেড়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যপথ, নৌপথ এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপ সৃষ্টির উপকরণে পরিণত করে ওয়াশিংটনের জন্য সংঘাতের মূল্য ক্রমাগত বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে ইরান।

তাদের ধারণা, এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বুঝতে বাধ্য হবে যে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের দাবি মেনে নেওয়ার চেয়ে সংকট নিয়ন্ত্রণে রাখার খরচই বেশি।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক মাইকেল নাইটস বলেন, “তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তারা আঞ্চলিক দেশগুলো এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”

ট্রাম্পের নতুন দাবি

সোমবার পরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে ‘অবিশ্বাস্য রকমের দ্বিমুখী’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, ইরান বৈঠকের অনুরোধ করেছে এবং খুব শিগগিরই আরও আলোচনা হবে।

এ সময় তিনি আবারও দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

ট্রাম্প লেখেন, “‘যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাতের প্রাচীর!’ আমরা না চাইলে ইরানে কিছুই যেতে পারবে না। আর কোনো চুক্তি বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই যেতে দেওয়া হবে না।”

একই ধারা অব্যাহত

সোমবারের ঘটনাপ্রবাহকে গত পাঁচ মাসের একটি পুনরাবৃত্ত ধারা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার পর থেকে ট্রাম্প একাধিকবার সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। পরে আবার কূটনৈতিক যোগাযোগের অগ্রগতির কথা বলে সেসব পদক্ষেপ থেকে সরে এসেছেন।

অন্যদিকে, গত জুলাইয়ের শুরুতে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আগের মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ইরান প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প যে লক্ষ্যগুলোর কথা বলেছিলেন, সেগুলোর কোনোটিই এখন পর্যন্ত অর্জন করতে পারেননি। এর মধ্যে রয়েছে— ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া, আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হামলার সক্ষমতা সীমিত করা এবং ইরানের ধর্মীয় শাসকদের উৎখাতের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপের জবাবে ইরান অঞ্চল জুড়ে মার্কিন বাহিনী, ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় আরব মিত্র এবং জাহাজ চলাচলের ওপর আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে পিছু হটতে দেখা গেছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ এখনো দুই দেশের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। ওয়াশিংটনের দাবি, জুনে হওয়া সমঝোতা স্মারকে ইরানকে এই কৌশলগত জলপথ খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে তেহরানের দাবি, ওই নথিতে জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের কর্তৃত্ব স্পষ্টভাবেই বহাল রাখা হয়েছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

রাশিয়া ও ইউক্রেনে পাল্টাপাল্টি ড্রোন-মিসাইল হামলা, নিহত অন্তত ২২

রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কনদ্রাতিয়েভ জানান, সোমবার (৩ আগস্ট) গেলেনঝিকের নিকটবর্তী পর্যটনগ্রাম আরখিপো-ওসিপোভকায় একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিন শিশু রয়েছে। এ ঘটনায় আরও প্রায় ৪০ জন আহত হন।

৯ ঘণ্টা আগে

ইরানকে শায়েস্তা করতে সেনাদের কাছেই ‘সৃজনশীল’ কৌশল চাইল মার্কিন সেনাবাহিনী

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ই-মেইলের মাধ্যমে এভাবে সেনাদের কাছ থেকে ধারণা চাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা। এটি ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্পের শর্তে ইরানকে সমঝোতায় বাধ্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা বিকল্পগুলো সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।

১৬ ঘণ্টা আগে

বিহার ও মধ্যপ্রদেশে বিজেপির দুর্গে হানা, ভোট কমল গুজরাটেও

ভারতে সাম্প্রতিক ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘জেন-জি’ আন্দোলনের পর এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন। তাই নতুন প্রজন্মের ভোট কোন দিকে যায়, তা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশেষ করে বিহারে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ বিজেপির বদলে প্রশান্ত কিশোরকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে।

১৮ ঘণ্টা আগে

ছাড় আদায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ইরান

তেহরানের লক্ষ্য সরাসরি বড় ধরনের সামরিক বিজয় নয়; বরং সংঘাতের ব্যয় বাড়িয়ে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে ইরানের দাবি মেনে নেওয়াই তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল বলে মনে হবে।

১ দিন আগে