ইরান যুদ্ধে এবার নতুন ফ্রন্টে হুতিরা, ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি ট্রাম্পের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইয়েমেনের সানায় হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর একটি মিছিল। ইরানপন্থি এই গোষ্ঠী এবার সরাসরি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে এবার সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীরা। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে দেশটির তেলবাহী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে তারা। এর জেরে লোহিত সাগরে চলাচলকারী অন্তত দুটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকার গন্তব্য বদলাতে বাধ্য হয়েছে।

এ পরিস্থিতিকে নতুন যুদ্ধফ্রন্ট হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, তারা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয় বা হুমকি বাস্তবায়ন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘তাদের দেখে নেবে’।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে সরাসরি হুতিদের জড়িয়ে পড়া ও ট্রাম্পের সতর্কবার্তা এমন একসময়ে এলো যখন একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে, অন্যদিকে পালটা জবাব হিসেবে ইরানও বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি নৌ পথ— হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর— উভয়ই এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা হুতিদের

ইয়েমেনের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল এবং লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ নিয়ন্ত্রণকারী হুতি বিদ্রোহীরা সোমবার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয়। জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানো এক বার্তায় তারা জানায়, সৌদি আরবের তেল বহনকারী অথবা সৌদি বন্দরে তেল ওঠানামা করা যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

এ ঘোষণার পরপরই এর প্রভাব দেখা যায় সমুদ্রপথে। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে চীন ও ভারতের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেলবাহী দুটি সৌদি ট্যাংকার মঙ্গলবার (২১ জুলাই) হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে। বাব আল-মান্দেব প্রণালি পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে না গিয়ে তারা সুয়েজ খালের দিকে ফিরে যায়।

ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড বলেছে, হুতিদের ঘোষণার পর বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজের রুট পরিবর্তনের এটিই প্রথম নিশ্চিত ঘটনা। এর ফলে সৌদি তেল রপ্তানি ও আঞ্চলিক নৌ পরিবহনে আরও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

হুতিদের ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি ট্রাম্পের

হুতিদের এ ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে হোয়াইট হাউজে বৈঠকের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এখন পর্যন্ত হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করেনি। তবে তারা যদি সেটি করার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে।

ট্রাম্প বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তা ঘটেনি। ঘটতেও পারে। কিন্তু যদি এমন কিছু ঘটে, তাহলে আমরা তাদের দেখে নেব।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমরা এর আগেও হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। এরপর থেকে অনেক দিন তাদের কাছ থেকে তেমন কিছু শোনা যায়নি।’

বিকল্প পথও ঝুঁকিতে

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরব উপসাগরীয় তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে ইয়ানবু বন্দরে এনে সেখান থেকে লোহিত সাগর হয়ে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করছিল। হুতিদের অবরোধ কার্যকর হলে সেই বিকল্প পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে সৌদি আরবের অধিকাংশ তেল রপ্তানি কার্যত আটকে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দামে পড়তে পারে।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারের ওপরে উঠে যায়। যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রোলের দাম আবার গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের বেশি হয়েছে।

দক্ষিণ ও পশ্চিম ইরানে নতুন মার্কিন হামলা

এদিকে টানা দেড় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা অভিযানের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার রাতেও ইরানের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অভিযানে ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের শিরাজ শহরের আশপাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ ছাড়া কোনারাক, চাবাহার, খোররমাবাদ ও পশ্চিমাঞ্চলের আবদানানের কাছে কয়েকটি স্থানে হামলার খবর পাওয়া যায়। তবে পরে খোররমাবাদের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, সেখানে কোনো শত্রুপক্ষের হামলা হয়নি।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় অন্তত ৫০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং আরও প্রায় ৫০০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে তাদের তিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর জবাব হিসেবেই ইরানের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে।

উপসাগর জুড়ে ইরানের পালটা হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে মঙ্গলবারও উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েত জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলে দেশটি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে এসব হামলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেগুলো একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি উৎপাদনেও ব্যবহৃত হয়।

বাহরাইনে সাইরেন বেজে ওঠার পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করে, তারা সেখানে অ্যামাজনের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, ইরানে নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে। যদিও অ্যামাজন তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি এবং স্বাধীনভাবে আইআরজিসির দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও দাবি করেছে, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়েছে।

হরমুজেও হামলার শিকার ট্যাংকার

ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে জাহাজটির নাবিকদের সেটি ছেড়ে লাইফবোটে আশ্রয় নিতে হয়।

এদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে, প্রণালির দক্ষিণ দিকের নৌ পথ দিয়ে চলাচলের সময় দুটি তেলবাহী জাহাজ বিস্ফোরণের পর আগুনে পুড়ে যায়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র জাহাজগুলোকে দক্ষিণ দিকের নৌ পথ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করলেও ইরান তাদের উপকূলঘেঁষা উত্তর দিকের রুট ব্যবহার করতে চাপ দিচ্ছে। ভবিষ্যতে ওই পথ ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট ফি আদায়ের পরিকল্পনাও রয়েছে তেহরানের।

তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে, যা আগের দিনের সাতটি থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতা

যুদ্ধ চললেও কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি পুনর্বহালের লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানের কাছে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে।

একই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি পাকিস্তর সফর করে ইসলামাবাদকে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে হোয়াইট হাউজে লেবাননের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ইরান আলোচনায় বসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে ‘অর্থবহ’ আলোচনার জন্য তারা প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আগ্রহ নেই।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমতে কমতে নামল ৩৩ শতাংশে

চার দিন ধরে চালানো ওই জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ৩৩ শতাংশ মানুষ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের কার্যক্রমে অনুমোদন জানিয়েছেন। বিপরীতে ৬৪ শতাংশ তার কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে শেষ হওয়া আগের জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ছিল ৩৫ শতাংশ। এবার তা আরও কমে তার বর্তমান মেয়াদের যেকোনো সময়ের চেয়ে নিচে নে

১৫ ঘণ্টা আগে

কারচুপির বিতর্কের মধ্যেই দ্বিতীয় মেয়াদে জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিচিলেমা

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদে এটি ছিল হিচিলেমার সপ্তম প্রচেষ্টা। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাড়তি সুবিধা থাকায় তাঁর এই জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। অন্যদিকে, মুন্ডুবিলের জন্য এটি ছিল প্রেসিডেন্ট পদে প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

১৭ ঘণ্টা আগে

হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি: ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় নারাজ ট্রাম্প

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘গুরুতর’ নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে দুই দেশের আলোচনা চালানোর নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা এখন ‘পুরোপুরি অর্থহীন’ হয়ে পড়েছে। এই সমঝোতার আওতায় তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ বিষয় সমাধানের আলোচনা করার কথা ছিল।

১৮ ঘণ্টা আগে

৩ লাখ রোহিঙ্গার পরিচয় শনাক্ত, রাখাইনে নিরাপত্তা ফিরলে প্রত্যাবাসন: মিয়ানমার

রোববার (১৬ আগস্ট) মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের নামের তালিকা মিয়ানমারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে বাংলাদেশে অবস্থানরত রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

১ দিন আগে