থাইল্যান্ডে স্কুলে গুলির আগেই দাদা-দাদিকে হত্যা, ‘মানসিক চাপে’ ছিল শিক্ষার্থী

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ২৯
ননথাবুরির ডেবসিরিন স্কুলে গুলির ঘটনার পর প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত

থাইল্যান্ডের ননথাবুরি প্রদেশের একটি স্কুলে ১৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর গুলিতে পাঁচ শিক্ষক নিহত ও অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। পরে ওই শিক্ষার্থীও আত্মহত্যা করেছে। স্কুলে এ হামলার আগে সে নিজের দাদা-দাদিকেও হত্যা করে বলে জানা গেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল বলেছেন, মানসিক চাপে থাকা ওই শিক্ষার্থীর হামলাটি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল।

বিবিসির খবরে বলা হয়, পুলিশ ওই শিক্ষার্থীর বাড়ি থেকে যে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, তাতে দেখা যায় সে ভিডিও গেমে খুবই আসক্ত ছিল। থাইল্যান্ডের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পোলাপি সুভানচাওয়ি জানান, ১৪ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থী তার দাদা-দাদির সঙ্গে বসবাস করত। পরে তাদের দুজনকে বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

কর্তৃপক্ষ বলছে, স্কুলে যাওয়ার আগে সে তার দাদা-দাদিকে হত্যা করে। এরপর ননথাবুরির ডেবসিরিন স্কুলে গিয়ে পাঁচ শিক্ষককে গুলি করে। পরে সে নিজেকেও গুলি করে এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়।

এদিকে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী অনুতিন বলেন, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে হামলাকারীর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানিয়েছে, পড়াশোনা-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সে মানসিক চাপে ছিল।

স্কুলটি পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল। ছবি: সংগৃহীত
স্কুলটি পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল। ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঘটনার আগে ও পরে তার কর্মকাণ্ড দেখে স্পষ্ট, সে হামলাটি আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছিল।’ তিনি আরও জানান, এ ঘটনার পর দেশের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে পুলিশপ্রধানের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

স্কুলটির এক শিক্ষক বিবিসিকে বলেন, ছেলেটি ভালো ছাত্র ছিল এবং তার পড়াশোনার ফলও ভালো ছিল। তাকে কখনোই আক্রমণাত্মক স্বভাবের মনে হয়নি।

হামলার পর প্রথমদিকে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। পরে দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী পাত্তানা প্রমফাত নিশ্চিত করেন, স্কুলে পাঁচ শিক্ষক নিহত হয়েছেন। এতে নিহতের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় আটজনে। এর মধ্যে রয়েছেন হামলাকারীর দাদা-দাদি এবং হামলাকারী নিজেও।

গুলিতে নিহত এক শিক্ষকের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত
গুলিতে নিহত এক শিক্ষকের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, হামলাকারী স্কুলে যাওয়ার আগে নিজের দাদা-দাদিকেও হত্যা করে। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত ৯ মিলিমিটার পিস্তলটি তার দাদার, যিনি একজন শিক্ষক ছিলেন।

শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে ননথাবুরি প্রদেশের ব্যাং ক্রুয়াই জেলার ডেবসিরিন স্কুলে গোলাগুলির ঘটনা শুরু হয়। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ ফেসবুকে সতর্কবার্তা দিয়ে জানায়, হামলাকারী স্কুলের কম্পিউটার কক্ষে অবস্থান করছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

হামলার পর আহত এক শিক্ষককে অ্যাম্বুলেন্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
হামলার পর আহত এক শিক্ষককে অ্যাম্বুলেন্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

তখনও যারা ভবনের ভেতরে আটকে ছিলেন, তাদের নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে থাকতে এবং কর্তৃপক্ষের জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়। পরে থাই পুলিশ ও স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, সন্দেহভাজন হামলাকারী মারা গেছে। তবে সে পুলিশের গুলিতে নাকি আত্মহত্যা করেছে, তা তখনই নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে ননথাবুরি প্রাদেশিক পুলিশের প্রধান দেচরাপি কংদি বিবিসিকে জানান, হামলাকারী নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। থাইল্যান্ডে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বয়স সাধারণত ১৪ বছর।

ডেবসিরিন স্কুল থাইল্যান্ডের একটি সুপরিচিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর শাখা রয়েছে। ননথাবুরির শাখাটি ব্যাংককের উত্তর-পশ্চিম উপকণ্ঠে অবস্থিত। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মূল ডেবসিরিন স্কুল থেকে দেশটির বহু কূটনীতিক, ক্রীড়াবিদ এবং একাধিক প্রধানমন্ত্রী পড়াশোনা করেছেন। থাইল্যান্ডে স্কুলটি শিক্ষাগত মর্যাদার প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

স্কুলের এক শিক্ষার্থী রয়টার্সকে বলেন, প্রথমে তিনি গুলির শব্দকে আতশবাজি বা কোনো কিছু আঘাত করার শব্দ ভেবেছিলেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমার মনে হয়নি এটা গুলির শব্দ। অনেকবার গুলির শব্দ শুনেছি— ব্যাং, ব্যাং, ব্যাং। এরপর কিছুক্ষণ নীরব ছিল। তারপর আবার শুরু হয়।’

গুলির ঘটনার সময় শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। বাইরে অপেক্ষমাণ ডেবসিরিন ননথাবুরি স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদেরও উদ্বিগ্ন ও বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল।

প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল নিহতদের পরিবারের প্রতি শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি খুবই ভয়াবহ। এমনটি কখনোই হওয়া উচিত ছিল না। শুধু নিহতদের জন্যই নয়, আমাদের দেশেই এমন ঘটনা ঘটেছে— এ জন্যও আমি গভীরভাবে দুঃখিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ কারণেই সরকার সাধারণ নাগরিকদের অস্ত্র রাখার অনুমতি দেয় না।’

এদিকে বিরোধী দল পিপলস পার্টির নেতা নাত্তাফং রুয়েংপানিয়াউত এ ঘটনার পর দেশের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতিও সমবেদনা জানান।

ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, হামলার উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সমাজের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাগুলোর একটি হওয়া উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে এমন সহিংসতা থাই সমাজকে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গুরুত্বের সঙ্গে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়।

স্কুলের ওই ভবনটি থেকে প্রাণে বেঁচে বেরিয়ে আসা সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী বিবিসিকে জানায়, সে শ্রেণিকক্ষে ছিল, তখন হামলাকারীকে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যেতে দেখেছে। তার ভাষ্য, এরপর হামলাকারী তার শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষককে গুলি করে। এরপর আর কিছু দেখতে পারেনি সে।

বিবিসি লিখেছে, থাইল্যান্ডে অস্ত্র আইন বেশ কঠোর। অবৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে এরপরও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডে সাধারণ মানুষের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের মালিকানার হার অন্যতম বেশি।

দেশটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক প্রাণঘাতী গুলির ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে একটি স্কুল অবরোধের সময় ১৮ বছর বয়সী এক বন্দুকধারীর গুলিতে এক প্রধান শিক্ষক ও এক ছাত্রী আহত হন। পরদিন হাসপাতালে ওই প্রধান শিক্ষকের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া গত বছর ব্যাংককের একটি খাদ্যবাজারে গুলির ঘটনায় পাঁচজন নিহত হন।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

শাহবাজ শরিফের পর সৌদি আরবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট, নতুন কৌশলগত জোটের ইঙ্গিত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রিপাক্ষিক এই জোট আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলার জেরে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জা

৬ ঘণ্টা আগে

সেউতা সীমান্তে ভয়াবহ অভিবাসন ট্র্যাজেডি: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০০

সেউতার মেয়র জুয়ান জেসুস ভিভাস লারা এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন, সংকট এখনও কাটেনি। অন্তত ৮০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীর একটি বড় অংশ ফেরত গেলেও এখনও ৩ থেকে ৫ হাজার মানুষ শহরের ভেতরে অবস্থান করছেন।

৯ ঘণ্টা আগে

জাপানে টাইফুন: ৫ শতাধিক ফ্লাইট বাতিল

৯ ঘণ্টা আগে

মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার মধ্যেই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আঞ্চলিক দুটি সূত্র জানায়, শুক্রবারই চুক্তিটি সই হওয়ার কথা। পরে এক তুর্কি কর্মকর্তাও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে আরেকটি আঞ্চলিক সূত্রের ভাষ্য, চুক্তিটি সই হলেও শুক্রবারই তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

৯ ঘণ্টা আগে