কিশোরগঞ্জের হাওরে পানির নিচে ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
আপডেট : ০৪ মে ২০২৬, ২২: ২৮
কিশোরগঞ্জে হাওরে পানির নিচে তলিয়ে তলিয়ে গেছে কৃষকের ধান। ছবি: রাজনীতিডটকম

এক দিন রোদ উঠলে দুই দিন বৃষ্টি হয়। সেই সঙ্গে রয়েছে উজানের ঢল। এতে তলিয়ে গেছে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। এটি কৃষি বিভাগের হিসাব। বেসরকারি হিসাবে ক্ষয়ক্ষতি আরো বেশি। জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের হাওর।

সোমবার অষ্টগ্রামের কলমার বাধঁ ভেঙে নতুন করে ৫০০ একর জমি তলিয়ে গেছে। শুধু ইটনা উপজেলায়ই প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে।

এদিকে, টানা বৃষ্টি ও ঘন ঘন বজ্রপাতের কারণে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকরা ভয়ে মাঠে যাচ্ছেন না। বর্তমানে দৈনিক দুই হাজার টাকা মজুরিতেও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। হারভেস্টার মেশিন পানি উঠে যাওয়া ক্ষেতে কাজ করতে পারছে না (ফসল কাটা যন্ত্র)। ফলে প্রায় ৬০০ হারভেস্টার মেশিন কাজে আসছে না।

কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, সোমবার (৪ মে) পর্যন্ত হাওরে ১০ হাজার ৫০ হেক্টর জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে আরো বহু হাওরে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৩৪ হাজার কৃষক।

কৃষি বিভাগ বলছে, এরই মধ্যে ৬০ ভাগ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। তবে যেসব ধান কাটা হয়েছে, রোদের অভাবে তা শুকাতে পারছে না কৃষক। ভেজা ধানে চারা গজিয়ে উঠছে। টানা বৃষ্টি ও উজানের পানির ঢলে ধনু, মেঘনা, বৌলাই, মগরা, কালনী, কুশিয়ারা, দাইরা, ঘোড়াউত্রা, ধলেশ্বরী নদীর পানি বেড়েই চলেছে। এসব নদ-নদী উপচে পানি হাওরে ঢুকে পড়ায় একের পর এক ফসলি জমি তলিয়ে যাচ্ছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীতে রোববার (৩ মে) পানির স্তর ছিল ৩.১৬ মিটার। আজ (সোমবার) বেড়ে হয়েছে ৩.২৬ মিটার। চামড়াঘাট পয়েন্টে মগড়া নদীতে গতকালের পানির স্তর ২.৭৮ মিটার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.৯৫ মিটারে। রোববার অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানির স্তর ছিল ২.৪০ মিটার। আজ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.৫৮ মিটারে। তবে ভৈরব বাজার পয়েন্টে মেঘনা নদীর পানি কিছুটা কমেছে, গতকাল সেখানে পানির স্তর ছিল ১.৭৭ মিটারে। আজ কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ১.৭২ মিটারে। তবে এখনো নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে আগাম বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। দিন দশেক আগেও বোরো ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন হাওর এলাকার কৃষক। উৎসবমুখর পরিবেশে দ্রুত কাটা হচ্ছিল ধান। শ্রমিক আর হারভেস্টার মেশিনে দিনরাত এক করে কাটা হচ্ছিল সোনালি ধান। কিন্তু হঠাৎ পানি বাড়ে যাওয়ায় বদলে গেছে সেই চিত্র। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টির পর গতকাল রোদ উঠেছিল। গত রাতে বৃষ্টির পর আজ সকাল থেকে আবার রোদ উঠেছে। এই রোদ পেয়ে কৃষকরা দলে দলে ছুটছেন হাওরে।

বড় হাওর ও বালিখলায় গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিক ও কৃষকরা জমির জলাবদ্ধতা উপেক্ষা করেই ক্ষেতের ধান কাটছেন। ভেলা ও নৌকায় তুলে নিয়ে আসছেন শুকনো জায়গায়। আর আগে কাটা ভেজা ধান সড়কে শুকাতে দিচ্ছেন। কোথাও আবার চলছে জোরেশোরে মাড়াইয়ের কাজ। খড় দেওয়া হচ্ছে রোদে। অনেক খলায় (ধান মাড়াইয়ের জায়গা) পানি জমে যাওয়া মিঠামইন ও ইটনার সড়কসহ হাওরের সড়কগুলোই হয়ে গেছে খলা। প্রত্যেক কৃষক পরিবার ধান কেটে তা ঘরে তুলতে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তবে জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় বাড়তি মজুরি দিয়েও ধান কাটার প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক ক্ষেতে পাকা ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মজলিশপুর হাওরের কৃষক আব্দুল আলী জানান, তিনি এবার ১২ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। মাত্র ছয় একর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি ধানক্ষেতে রয়েছে। আর দুই দিন সময় পেলে ধান কাটা শেষ হতো তার। আজ রোদ ওঠায় তা কাটার চেষ্টা করছেন।

বড় হাওরের কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমার ক্ষেতে পানি জমেছে। শ্রমিক পাচ্ছি না। ১৫০০ টাকা করে মজুরি দিয়ে দুইজন শ্রমিক লাগিয়েছি। আর আগে কাটা ধান শুকাতে দিয়েছি রাস্তায়।’

কিরাটন এলাকায় ডুবিয়ে ডুবিয়ে ধান কাটতে দেখা গেছে কয়েকজন কৃষককে। তারা জানান, সবখানেই এখন এই দৃশ্য দেখা যাবে। দ্রুত ধান কেটে শেষ করতে না পারলে, হাওরের অবশিষ্ট বোরো ধান পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে যাবে। তাই আজ তারা ধান কেটে শেষ করতে চান।

মিঠামইন উপজেলার গোপদীঘি গ্রামের কৃষক রইসউদ্দিন বলেন, ৩০ একর ধান চাষ করেছিলাম। এর বেশিরভাগই তলিয়ে গেছে। যেটুকু রয়েছে, তা-ও কাটতে পারছি না। পানির কারণে মেশিনেও কাটা যাচ্ছে না, আবার শ্রমিকও মিলছে না। দিনে দুই হাজার টাকা দিলেও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ধান জমিতেই নষ্ট হচ্ছে। পানি না কমলে আর কাটা যাবে না।

ইটনা সদরের কৃষক আব্দুর রহিম জানান, কিছু ধান কেটেছিলেন তিনি, রোদ না থাকায় শুকানো যায়নি। খলায় রাখা ধান বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছিল। গতকাল ও আজ রোদ ওঠায় তা শুকানোর চেষ্টা করছেন তিনি। আরো রোদ থাকলে ক্ষেতে থাকা বাকি ধান কাটবেন বলে জানান এই কৃষক।

মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এবার ১০ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন রৌহা গ্রামের কৃষক রতন মিয়া। পুরো পরিবারের খাওয়াদাওয়া, সন্তানদের লেখাপড়াসহ সব খরচই চলে এই ধান থেকে। কিন্তু শ্রম-ঘামে ফলানো সেই ধান এবার তলিয়ে গেছে পানিতে। এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারেননি তিনি।

নিয়ামত গ্রামের কৃষক আবু হানিফ বললেন, ‘ধানগুলা পাইক্কা গেছিন। আর চার-পাঁচটা দিন গেলেই কাটতে পারতাম। একটা ধানও ঘরে আনতে পারলাম না। অহন পরিবার লইয়া কেমনে চলবাম।’

অষ্টগ্রাম সদরের বেলাল মিয়া বলেন, ‘বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই ধানকাটা শুরু হয়। ৫০ একর ধানের মধ্যে ৩০ একর কাটা হয়েছে। বৃষ্টিবাদল শুরু হওয়ায় বাকি ধান কাটা যায়নি। এবার ধানচাষে খরচ হয়েছে বেশি। দামও অনেক কম। বাকি ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাচ্ছি না।’

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. সাদেকুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় এক লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ধানের আবাদ হয়েছে এক লাখ চার হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র ছিল প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন। ক্ষয়ক্ষতি বাদ দিলেও অন্তত ১০ লাখ মেট্রিক টন ধান পাওয়া যাবে আশা করি। এরই মধ্যে ৬০ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে।

এদিকে, গতকাল (রবিবার) থেকে সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হয়েছে। তবে ধান ভেজা থাকায় কৃষকরা গুদামে ধান নিয়ে যেতে পারছেন না। ফলে কাগজপত্রে ধানকেনা শুরু হলেও বাস্তবে শুরু হয়েনি জেলার কোথাও। এবার জেলায় ধানকেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন। ৩৬ টাকা কেজি দরে বা ১৪৪০ টাকা মণ দরে ধান কিনবে খাদ্য বিভাগ।

তবে কৃষকরা বলছেন, লাখ লাখ টন ধানের মধ্যে সরকার কিনছে মাত্র ১৮ হজার মেট্রিক টন ধান, এত কম ধান বেচে কৃষকের কোনো লাভ হবে না। সরকারের উচিত এ লক্ষ্যমাত্রা আরো বাড়ানো। বাজারে এখন ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে গিয়ে হাউসবোট থেকে পড়ে কিশোর নিখোঁজ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরে ভ্রমণে এসে তামিম ইসলাম নামে এক কিশোর নিখোঁজ হয়েছেন। শনিবার দুপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরের পাটলাই নদীর শ্রীপুর বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

১৭ ঘণ্টা আগে

ভারত-পাকিস্তানের মতো টেবিলে বসে আমাদের স্বাধীনতা আসেনি: ভূমিমন্ত্রী

ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, ভারত-পাকিস্তানের মতো টেবিলে বসে আমাদের স্বাধীনতা আসেনি। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ছিল ত্যাগ, সংগ্রাম ও সশস্ত্র প্রতিরোধ। এ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১৭ ঘণ্টা আগে

শখের মোটরসাইকেলেই প্রাণ গেল কলেজছাত্রের

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মাহির শাহরিয়ার (২১) নামে এক কলেজছাত্র নিহত হয়েছেন। শনিবার দুপুরে উপজেলার ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের চরহোসেনপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

১৭ ঘণ্টা আগে

জিয়া হত্যা মামলা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বিচার বিভাগ: অর্থমন্ত্রী

আমীর খসরু বলেন, আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। সুতরাং শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার বিচার কী হবে সেটা বিচার বিভাগ সিদ্ধান্ত নেবে, রাজনীতিবিদরা নয়। বিগত দিনে যেটা হয়েছে সেটা আমরা করব না।

২০ ঘণ্টা আগে