সড়ক দুর্ঘটনায় শোকের মাতম— বরের দাফন মোংলায়, কনের কয়রায়

বাগেরহাট প্রতিনিধি
আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬, ১৩: ১১
ভয়াবহ এই সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ৯ জনসহ মোট ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

বাগেরহাটের রামপালে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বর-কনেসহ ১৪ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) গভীর রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়।

নিহতদের মধ্যে বর, তার বাবা, ভাই-বোন, ভাবি ও ভাগ্নে-ভাগ্নিসহ একই পরিবারের ৯ জন রয়েছেন। আজ শুক্রবার (১৩ মার্চ) ভোরে তাদের মরদেহ বাগেরহাটের মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম শেলাবুনিয়া এলাকায় পৌঁছায়। অন্যদিকে কনে, তার বোন, দাদি ও নানির মরদেহ নেওয়া হয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলায়। দুই এলাকায়ই শোকের মাতম নেমে এসেছে।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার মিতুর সঙ্গে মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরের বিয়ে হয়। কনের বাড়িতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৪ জন একটি মাইক্রোবাসে করে মোংলার উদ্দেশে রওনা দেন।

পথে মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত অবস্থায় একজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

নিহতরা হলেন— বর আহাদুর রহমান সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, ঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল ও তাদের সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম।

এ ছাড়া কনে মার্জিয়া আক্তার মিতু, তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাসের চালক নাঈমও নিহত হন। চালক নাঈমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।

জানা গেছে, বর সাব্বির মোংলা শহরে একটি মোবাইল ফোনের দোকান চালাতেন। কনে মিতু কয়রার নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

নিহত ঐশীর শ্বশুর মো. আব্দুল আলীম বলেন, “রাজ্জাক ভাইয়ের আদি বাড়ি কয়রায়। বিয়ের অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম। তারা দুপুরের পর রওনা দিয়েছিল। এই দুর্ঘটনায় আমার পুত্রবধূ ও একমাত্র নাতিও মারা গেছে।”

শুক্রবার সকালে মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেলাবুনিয়ায় বরের বাড়িতে অসংখ্য মানুষের ভিড় দেখা যায়। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসেন। পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ির ভেতরে রাখা হয়েছে পরিবারের নিহত চার নারীর মরদেহ। পাশের উপজেলা পরিষদ চত্বরে রাখা হয়েছে বাকি পাঁচজনের মরদেহ।

প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, “একসঙ্গে এতগুলো লাশ জীবনে দেখিনি। আজ যে বাড়িতে হাসি-আনন্দে গমগম করার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধু কান্নার শব্দ।”

নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার বলেন, “আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই, তবে গ্রামের বাড়ি কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তার মেয়ের বিয়েও কয়রায় দিয়েছিলেন। এবার ছেলের বিয়ে দিলেন। একটি দুর্ঘটনা সবকিছু ওলটপালট করে দিল।”

তিনি আরও জানান, আশপাশের নয়টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষে একে একে নয় স্বজনের মরদেহ খাটিয়ায় রাখা হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাজা শেষে তাদের মোংলা পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে।

মোংলা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. নুর আলম শেখ বলেন, “বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের এতগুলো মানুষ একসঙ্গে মারা যাওয়ায় পুরো এলাকা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তাদের বাড়িতে ভিড় করছেন। কারও মুখে কথা নেই, সবার চোখে অশ্রু। এমন মৃত্যুর দায় কার— এ প্রশ্নই এখন সবার মনে।”

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইফতারে বিরিয়ানি খেয়ে অর্ধশতাধিক শ্রমিক অসুস্থ, ১৯ জন ময়মনসিংহে ভর্তি

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় গ্লোবাল সুজ লিমিটেড নামের একটি জুতা কারখানায় ইফতারের সময় বিরিয়ানি খেয়ে অর্ধশতাধিক শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ১৯ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

১ দিন আগে

ফিরতি বর‍যাত্রাই শেষযাত্রা, বিএনপি নেতাসহ পরিবারের সবাই না ফেরার দেশে

ঈদের অপেক্ষা না করে রমজানেই ছেলেকে বিয়ে দিয়েছিলেন বাগেরহাটের মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নতুন বউকে নিয়ে ফিরছিলেন বাড়ির পথে। বর-কনের মাইক্রোবাসে ছিলেন তিনিও। ছিলেন পরিবারের আরও চারজনসহ আরও পাঁচ স্বজন। কে জানত, ফিরতি বরযাত্রাই পরিণত হবে শোক

১ দিন আগে

রামপালের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বেড়ে ১৩

প্রাথমিকভাবে এ দুর্ঘটনায় চারজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছিলেন। পরে আহতদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে আটজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন আরও একজন।

১ দিন আগে

রামপালে বাস-মাইক্রো মুখোমুখি, নিহত ৪

বাগেরহাটের রামপালে একটি মাইক্রোবাস ও একটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে আরও অন্তত পাঁচজন। নিহত চারজনের মধ্যে তিনজনই নারী। হতাহতরা সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী ছিলেন।

১ দিন আগে