বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা: জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান ১ দিনের রিমান্ডে

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, নির্বাহী পরিচালককে (ইডি) হুমকি এবং নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর ও জামায়াত নেতা মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে ১ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর এ আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবু বক্কর ছিদ্দিক।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার এসআই মাজেদুল ইসলাম তাকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছিলেন। এর আগে বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার বলেছিলেন, ‘তাকে কোর্টে পাঠিয়ে দিয়েছি, আমরা তার পাঁচ দিনের রিমান্ড চাইব।’
এর আগে শুক্রবার ভোরে আখতারুজ্জামান রঞ্জনের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলাটি করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা কর্মকর্তা শাহরিয়ার আলম সজিব। মামলার প্রতিবেদন আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে দাখিল করতে বলেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর।
এরপর শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) একটি দল। পরে তাকে বিমানবন্দর থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানান পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার রেজাউল করিম রেজা।
গ্রেপ্তারের আগমুহূর্তে শুক্রবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ফেসবুকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় আখতারুজ্জামান রঞ্জন বলেন, ‘আমাকে এই মুহূর্তে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি শুধু জানিয়ে গেলাম আপনাদের। দোয়া করবেন, আমি যেন জনগণের জন্য, দেশের মানুষের জন্য বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য যদি শহীদ হতে পারি…আল্লাহ যেন আমার সেই দাবি কবুল করেন। জনগণের অধিকারের সংগ্রামে আমি আছি, থাকব। যতোদিন বেঁচে আছি, ততদিন জনগণের পাশেই থাকব… জনগণের জন্য এ জীবন ত্যাগ করব।’
মামলায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, আঘাত, অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ, ইচ্ছাকৃত অপমান ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা পবিত্র জমজমের পানির বোতল ক্ষতিসাধন এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে সৌদি আরবের মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটটি ঢাকায় পৌঁছায়। যাত্রীরা উড়োজাহাজ থেকে নেমে ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় গেলে সেখানে ট্রলির সংকট দেখা দেয়। লাগেজ পেতে দেরি হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে যান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ। পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের আহ্বানে পরিস্থিতি দেখতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করার সময় আখতারুজ্জামান আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে রাগীব সামাদের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় তিনি ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’ বলে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে প্রকাশ্যে হুমকি দেন। পাশাপাশি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রীকে নিয়েও অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এজাহারে বলা হয়েছে, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা প্রটোকল সহকারীরা বিমানবন্দরের সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। সেখানে দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাদের ভিডিও করতে নিষেধ করেন। এতে আখতারুজ্জামান ক্ষুব্ধ হয়ে ওই নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও করা হয়েছে মামলায়।
আখতারুজ্জামান বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্পর্কে ‘অত্যন্ত অশালীন ও অবমাননাকর’ মন্তব্য করেন জানিয়ে এজাহারে বলা হয়, আখতারুজ্জামান বলেন, ‘হি ইজ এ বাস্টার্ড। বিমানবন্দরের জন্য কিছুই করছে না।’ তখন আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কয়েকজন প্রটোকল সহকারী ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা ‘সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল’ করার ‘হুমকি’ দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে আরও বলা হয়েছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা সুপারভাইজার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বিমানবন্দরের কেপিআই এলাকায় ভিডিও ধারণ না করতে সংশ্লিষ্টদের নিষেধ করেন। তখন অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান অতর্কিতে ওয়ারেন্ট অফিসার কামাল উদ্দিনের কাছে গিয়ে তাকে ‘অকথ্য ভাষায়’ গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে আঘাত করেন।
মারধরের ঘটনাটি সিসিটিভির আওতাভুক্ত ছিল না দাবি করে এজাহারে বলা হয়, বিষয়টি ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব। পরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তার সঙ্গেও অশোভন ও মারমুখী আচরণ করেন আখতারুজ্জামান।
এ সময় তিনি সাধারণ যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলেন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যসহ বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করা হবে। এসব তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের দুইবারের সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জুনে কটিয়াদী আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি জয়লাভ করেন।
এবার কিশোরগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েন আখতারুজ্জামানের ছোট ভাই আনিসুজ্জামান খোকন। তিনি এর আগে ১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ময়মনসিংহ-১৯ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।














-9d5c8f-256x144.webp)



