
বিল্লাল বিন কাশেম

মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় জীবনে পবিত্র ঈদুল আজহা এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ উপলক্ষ। এই ঈদ কেবল আনন্দ, উৎসব বা পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আত্মত্যাগ, তাকওয়া, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং মানবিক দায়িত্ববোধের এক মহিমান্বিত শিক্ষা। কোরআন ও হাদিসের আলোকে কোরবানির প্রকৃত দর্শন উপলব্ধি করলে বোঝা যায়, এটি শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মানুষের অন্তরের পরিশুদ্ধি, নৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সাম্যের এক অনন্য অনুশীলন।
আজকের বাস্তবতায় কোরবানির মূল চেতনা অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতা, সামাজিক প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। অনেকেই কোরবানিকে বড় পশু কেনা, সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন কিংবা বাহ্যিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন। অথচ ইসলাম কোরবানির মাধ্যমে মানুষকে যে শিক্ষা দিতে চেয়েছে, তা অনেক গভীর ও ব্যাপক।
কোরবানির ইতিহাস মানব সভ্যতার প্রাচীনতম আত্মত্যাগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর কাহিনি বর্ণনা করেছেন, যা কোরবানির মূল ভিত্তি। মহান আল্লাহ স্বপ্নের মাধ্যমে ইবরাহিম (আ.)-কে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করার নির্দেশ দেন। পুত্র ইসমাঈল (আ.) ছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। কিন্তু আল্লাহর আদেশের সামনে পিতা-পুত্র উভয়েই আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন— “অতঃপর যখন সে (ইসমাঈল আ.) তার পিতার সঙ্গে চলাফেরার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম বললেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী?’ সে বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’” সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০২।
এই আয়াত শুধু একটি ঘটনার বিবরণ নয়; বরং এটি ঈমান, আত্মসমর্পণ ও নিঃস্বার্থ আনুগত্যের সর্বোচ্চ উদাহরণ। কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানদের শেখানো হয়— মানুষের জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কিছু নেই।
ইসলামে কোরবানির অন্যতম বড় শিক্ষা হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন। অনেকেই মনে করেন, কোরবানির মূল বিষয় হলো পশুর রক্ত বা মাংস। কিন্তু পবিত্র কোরআন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, কোরবানির বাহ্যিক রূপের চেয়ে মানুষের অন্তরের নিয়ত ও তাকওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মহান আল্লাহ বলেন— “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” সূরা আল-হজ ২২:৩৭।
এই আয়াত আমাদের গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। যদি কোরবানি মানুষের ভেতরে বিনয়, ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধি তৈরি না করে, তাহলে কেবল পশু জবাই করলেই কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
আজ সমাজে একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়— কে কত বড় গরু কিনল, কার কোরবানি বেশি দামি, কে কত সামাজিক মর্যাদা দেখাতে পারল— এসব নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। অথচ কোরবানির শিক্ষা হলো অহংকার ত্যাগ করা। আল্লাহর কাছে সম্পদ, বংশ, সামাজিক অবস্থান নয়; বরং আন্তরিকতা ও নিয়তই মুখ্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করে না, তার প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে। যদিও ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে কোরবানি ওয়াজিব না সুন্নাতে মুয়াক্কাদা— এ বিষয়ে মাজহাবভেদে মতপার্থক্য রয়েছে, তবে এর গুরুত্ব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে কোরবানি করতেন এবং উম্মতের জন্য দোয়া করতেন। তিনি বলেন— “আদম সন্তানের জন্য কোরবানির দিনের সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো রক্ত প্রবাহিত করা (কোরবানি করা)।” সুনান ইবনে মাজাহ।
তবে ইসলামের শিক্ষা কেবল পশু জবাই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। কোরবানির আরেকটি বড় তাৎপর্য হলো সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম্পদের বণ্টন। ইসলামে কোরবানির মাংসের একটি অংশ আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বণ্টনের নির্দেশ রয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও সাম্যের বোধ তৈরি হয়।
ঈদুল আজহার সময়ে দেখা যায়, অনেক দরিদ্র পরিবার বছরের এই একটি সময় ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ পায়। ধনী-গরিবের বৈষম্য কমাতে কোরবানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল ইবাদত নয়; বরং একটি সামাজিক কল্যাণমূলক ব্যবস্থাও।
তবে একটি প্রশ্ন আজ সামনে আসে— কোরবানির শিক্ষা কি কেবল ঈদের তিন দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? আমরা কি কোরবানির চেতনা সারা বছর ধারণ করি?
প্রকৃতপক্ষে কোরবানির শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একজন মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, নিজের লোভ সংযত করে, অন্যের অধিকারকে প্রাধান্য দেয়, সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দেয়— সেটিও এক ধরনের কোরবানি।
একজন মা তার সন্তানের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দেন; একজন শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে শ্রম দেন; একজন সৎ কর্মকর্তা দুর্নীতির সুযোগ ত্যাগ করেন; একজন চিকিৎসক মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করেন— এসবই আত্মত্যাগের শিক্ষা, যা কোরবানির প্রকৃত দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
বর্তমান সমাজে কোরবানির সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কোরবানির বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ না করলে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই কোরবানি শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে নাগরিক সচেতনতার সম্পর্কও গভীর।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— কোরবানির পশু কেনা ও প্রস্তুতিতে নৈতিকতা বজায় রাখা। পশুকে অযথা কষ্ট দেওয়া, প্রতারণা করা বা প্রদর্শনমূলক আচরণ ইসলাম সমর্থন করে না। হাদিসে পশুর প্রতি দয়া ও সদাচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা যদি হৃদয়ে ধারণ করা যায়, তাহলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। আজ দুর্নীতি, লোভ, হিংসা, স্বার্থপরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ে সমাজ আক্রান্ত। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আত্মসংযম, ত্যাগ ও মানবিক মূল্যবোধ— যার প্রতীক কোরবানি।
কোরবানি আমাদের শেখায়— সবকিছু অর্জনই জীবনের সার্থকতা নয়; বরং কখনো কখনো প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতেও জানতে হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের অহংকার, অন্যায় প্রবণতা, হিংসা, লোভ ও কুপ্রবৃত্তিকে কোরবানি করাই প্রকৃত আত্মশুদ্ধি।
পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের সামনে প্রতি বছর এই বার্তাই নিয়ে আসে— মানুষ হও, আত্মশুদ্ধির পথে ফিরে আসো, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার বন্ধনে আবদ্ধ হও।
সবশেষে বলা যায়, কোরআন ও হাদিসের আলোকে কোরবানি কেবল একটি পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ঈমানের পরীক্ষা, আত্মসমর্পণের প্রতীক, সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা এবং মানবিক সমাজ গঠনের এক অনন্য দিকনির্দেশনা। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা যদি ব্যক্তি ও সমাজে প্রতিফলিত হয়, তাহলে শুধু ধর্মীয় জীবন নয়, নৈতিক ও সামাজিক জীবনও হবে অধিকতর সুন্দর, ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণমুখী।
কোরবানির মর্মবাণী হোক ত্যাগে মহিমা, তাকওয়ায় সফলতা ও মানবিকতায় পূর্ণতা।
লেখক: গণসংযোগ কর্মকর্তা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় জীবনে পবিত্র ঈদুল আজহা এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ উপলক্ষ। এই ঈদ কেবল আনন্দ, উৎসব বা পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আত্মত্যাগ, তাকওয়া, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং মানবিক দায়িত্ববোধের এক মহিমান্বিত শিক্ষা। কোরআন ও হাদিসের আলোকে কোরবানির প্রকৃত দর্শন উপলব্ধি করলে বোঝা যায়, এটি শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মানুষের অন্তরের পরিশুদ্ধি, নৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সাম্যের এক অনন্য অনুশীলন।
আজকের বাস্তবতায় কোরবানির মূল চেতনা অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতা, সামাজিক প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। অনেকেই কোরবানিকে বড় পশু কেনা, সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন কিংবা বাহ্যিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন। অথচ ইসলাম কোরবানির মাধ্যমে মানুষকে যে শিক্ষা দিতে চেয়েছে, তা অনেক গভীর ও ব্যাপক।
কোরবানির ইতিহাস মানব সভ্যতার প্রাচীনতম আত্মত্যাগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর কাহিনি বর্ণনা করেছেন, যা কোরবানির মূল ভিত্তি। মহান আল্লাহ স্বপ্নের মাধ্যমে ইবরাহিম (আ.)-কে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করার নির্দেশ দেন। পুত্র ইসমাঈল (আ.) ছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। কিন্তু আল্লাহর আদেশের সামনে পিতা-পুত্র উভয়েই আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন— “অতঃপর যখন সে (ইসমাঈল আ.) তার পিতার সঙ্গে চলাফেরার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম বললেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী?’ সে বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’” সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০২।
এই আয়াত শুধু একটি ঘটনার বিবরণ নয়; বরং এটি ঈমান, আত্মসমর্পণ ও নিঃস্বার্থ আনুগত্যের সর্বোচ্চ উদাহরণ। কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানদের শেখানো হয়— মানুষের জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কিছু নেই।
ইসলামে কোরবানির অন্যতম বড় শিক্ষা হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন। অনেকেই মনে করেন, কোরবানির মূল বিষয় হলো পশুর রক্ত বা মাংস। কিন্তু পবিত্র কোরআন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, কোরবানির বাহ্যিক রূপের চেয়ে মানুষের অন্তরের নিয়ত ও তাকওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মহান আল্লাহ বলেন— “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” সূরা আল-হজ ২২:৩৭।
এই আয়াত আমাদের গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। যদি কোরবানি মানুষের ভেতরে বিনয়, ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধি তৈরি না করে, তাহলে কেবল পশু জবাই করলেই কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
আজ সমাজে একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়— কে কত বড় গরু কিনল, কার কোরবানি বেশি দামি, কে কত সামাজিক মর্যাদা দেখাতে পারল— এসব নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। অথচ কোরবানির শিক্ষা হলো অহংকার ত্যাগ করা। আল্লাহর কাছে সম্পদ, বংশ, সামাজিক অবস্থান নয়; বরং আন্তরিকতা ও নিয়তই মুখ্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করে না, তার প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে। যদিও ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে কোরবানি ওয়াজিব না সুন্নাতে মুয়াক্কাদা— এ বিষয়ে মাজহাবভেদে মতপার্থক্য রয়েছে, তবে এর গুরুত্ব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে কোরবানি করতেন এবং উম্মতের জন্য দোয়া করতেন। তিনি বলেন— “আদম সন্তানের জন্য কোরবানির দিনের সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো রক্ত প্রবাহিত করা (কোরবানি করা)।” সুনান ইবনে মাজাহ।
তবে ইসলামের শিক্ষা কেবল পশু জবাই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। কোরবানির আরেকটি বড় তাৎপর্য হলো সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম্পদের বণ্টন। ইসলামে কোরবানির মাংসের একটি অংশ আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বণ্টনের নির্দেশ রয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও সাম্যের বোধ তৈরি হয়।
ঈদুল আজহার সময়ে দেখা যায়, অনেক দরিদ্র পরিবার বছরের এই একটি সময় ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ পায়। ধনী-গরিবের বৈষম্য কমাতে কোরবানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল ইবাদত নয়; বরং একটি সামাজিক কল্যাণমূলক ব্যবস্থাও।
তবে একটি প্রশ্ন আজ সামনে আসে— কোরবানির শিক্ষা কি কেবল ঈদের তিন দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? আমরা কি কোরবানির চেতনা সারা বছর ধারণ করি?
প্রকৃতপক্ষে কোরবানির শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একজন মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, নিজের লোভ সংযত করে, অন্যের অধিকারকে প্রাধান্য দেয়, সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দেয়— সেটিও এক ধরনের কোরবানি।
একজন মা তার সন্তানের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দেন; একজন শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে শ্রম দেন; একজন সৎ কর্মকর্তা দুর্নীতির সুযোগ ত্যাগ করেন; একজন চিকিৎসক মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করেন— এসবই আত্মত্যাগের শিক্ষা, যা কোরবানির প্রকৃত দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
বর্তমান সমাজে কোরবানির সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কোরবানির বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ না করলে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই কোরবানি শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে নাগরিক সচেতনতার সম্পর্কও গভীর।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— কোরবানির পশু কেনা ও প্রস্তুতিতে নৈতিকতা বজায় রাখা। পশুকে অযথা কষ্ট দেওয়া, প্রতারণা করা বা প্রদর্শনমূলক আচরণ ইসলাম সমর্থন করে না। হাদিসে পশুর প্রতি দয়া ও সদাচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা যদি হৃদয়ে ধারণ করা যায়, তাহলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। আজ দুর্নীতি, লোভ, হিংসা, স্বার্থপরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ে সমাজ আক্রান্ত। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আত্মসংযম, ত্যাগ ও মানবিক মূল্যবোধ— যার প্রতীক কোরবানি।
কোরবানি আমাদের শেখায়— সবকিছু অর্জনই জীবনের সার্থকতা নয়; বরং কখনো কখনো প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতেও জানতে হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের অহংকার, অন্যায় প্রবণতা, হিংসা, লোভ ও কুপ্রবৃত্তিকে কোরবানি করাই প্রকৃত আত্মশুদ্ধি।
পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের সামনে প্রতি বছর এই বার্তাই নিয়ে আসে— মানুষ হও, আত্মশুদ্ধির পথে ফিরে আসো, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার বন্ধনে আবদ্ধ হও।
সবশেষে বলা যায়, কোরআন ও হাদিসের আলোকে কোরবানি কেবল একটি পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ঈমানের পরীক্ষা, আত্মসমর্পণের প্রতীক, সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা এবং মানবিক সমাজ গঠনের এক অনন্য দিকনির্দেশনা। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা যদি ব্যক্তি ও সমাজে প্রতিফলিত হয়, তাহলে শুধু ধর্মীয় জীবন নয়, নৈতিক ও সামাজিক জীবনও হবে অধিকতর সুন্দর, ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণমুখী।
কোরবানির মর্মবাণী হোক ত্যাগে মহিমা, তাকওয়ায় সফলতা ও মানবিকতায় পূর্ণতা।
লেখক: গণসংযোগ কর্মকর্তা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
৯ দিন আগে
প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ
১১ দিন আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১১ দিন আগে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।
১২ দিন আগে