আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিশীল পরিস্থিতিতে জনজীবন যখন আতঙ্ক ও শঙ্কার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, তখন সরকার কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে বলেই মনে হয়। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে সম্প্রতি তার দলের সংরক্ষিত এক নারী সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনাকে একটি বার্তা হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। বিএনপি নতুন করে ক্ষমতায় আসার সাড়ে সাত মাস পর সরকারপ্রধান এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
তবে এ কথাও এখানে বলা দরকার যে, এ ধরনের বার্তা আরও আগে দেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলার এতটা নাজুক অবস্থা হতো না। একই সঙ্গে সরকারকে এটাও মনে রাখতে হবে যে এই একটি সিদ্ধান্তই বিদ্যমান পরিস্থিতির বিপরীতে যথেষ্ট নয়। এ ধরনের পদক্ষেপ শুধুমাত্র একজন নারী সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে নয়, আরও উপরের দিকেও নেওয়া জরুরি। দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং চাঁদাবাজি ও দখলবাজির পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া নিয়ে কোনো কোনো এমপি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর নাম নিয়ে কানাঘুষা আছে। এসব দুষ্কর্মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে লাগাতার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে।
মিরপুরের অর্ধশতাব্দীর পুরনো রাড্ডা ক্লিনিক, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, সেখানে রাতের অন্ধকারে তাণ্ডব চালিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। মূলত জমি দখল করার লোভে এই জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। শুরু থেকেই এর পেছনে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এবং কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক সরকারদলীয় নেতা ও ছাত্রদল নেতার দিকে অভিযোগের তীর ছুটে যায়। মিষ্টি অভিযোগ অস্বীকার করলেও তার শেষ রক্ষা হয়নি। তাকে পাঁচ মাস বয়সী সংসদ সদস্যের পদটি হারাতে হয়।
এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। দলের সহযোগী সংগঠন যুবদলের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা, ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর পশ্চিম শাখা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। দলের কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রাড্ডা ক্লিনিক ভেঙেচুরে তছনছ করা ও লুটপাটের অভিযোগে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিলুপ্ত মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দখল, লুটপাটের ঘটনায় কমিটি বাতিলের ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে পারে।
তবে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির শুধু পদত্যাগই যথেষ্ট কি না, যদি রাড্ডা ক্লিনিক গুঁড়িয়ে দেওয়ার পেছনে তার হাত থেকে থাকে। যদি পদত্যাগে বাধ্য হওয়া এমপি মিষ্টির মদদে মা ও শিশুদের এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়, তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বলতে হবে মিষ্টি রীতিমতো ফৌজদারি অপরাধ করেছেন। এক্ষেত্রে শুধু পদত্যাগ নয়, আরও সাজা তার প্রাপ্য।
নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে প্রায় ১৯ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করে বিএনপি। এবার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি ক্ষমতা গ্রহণ করে। সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। নির্বাচনের আগে ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারে দলটির অঙ্গীকারে আস্থা রেখে ভোটাররা বিএনপির প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রথম চাওয়া তার জীবনের, পরিবারের এবং সমাজজীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকার মোটেও সফলতা দেখাতে পারেনি।
দীর্ঘ সাড়ে সাত মাসেও সরকার সন্ত্রাসী, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ, দখলকারদের দমন করতে পারেনি। সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও এ ক্ষেত্রে জনগণ আশ্বস্ত হয়নি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অব্যাহত খুনোখুনি, পিটিয়ে মেরে ফেলা, শিশু ও নারী ধর্ষণ এবং হত্যা, দিনের বেলায় ছিনতাইকারীদের হাতে স্কুলশিক্ষিকার প্রাণ যাওয়ার মতো ঘটনা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ঘটেই চলেছে।
সম্প্রতি রাজধানীতে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে জমি দখল, বাড়ি দখলের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। রাড্ডা ক্লিনিক ছাড়াও মিরপুরে আরও একটি জমি দখলের জন্য রাতের অন্ধকারে শতাধিক ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের দিয়ে চেষ্টা করা হয়। একাধিক হত্যা মামলার আসামি, দাগি অপরাধী ও কিশোর গ্যাং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তালিকাভুক্ত অনেক বড় বড় অপরাধী বিদেশে বসে দেশের ভেতর অপরাধজগত নিয়ন্ত্রণ করছে। থানা থেকে লুট হওয়া অনেক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জেল ভেঙে পালিয়ে যাওয়া সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী ও জঙ্গিদের অনেকেই এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে নেপথ্যে সরকারি দলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। কোনো রকম পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া চাঁদাবাজি ও দখলবাজির এত এত ঘটনা ঘটা সম্ভব নয়। কোনো পরিসংখ্যানে না গিয়ে শুধু একটি দৈনিক পত্রিকার দুই-তিন দিনের প্রথম পাতার খবরের শিরোনাম প্রমাণ করবে আইনশৃঙ্খলার নাজুক অবস্থা।
দৈনিক সমকালের প্রকাশিত কিছু শিরোনাম প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এখানে উল্লেখ করা হলো: ‘মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল গরিবের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র’ (২৬ সেপ্টেম্বর), ‘অপরাধীরা বেপরোয়া, শঙ্কাহীন’, ‘আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টা: আমরা আতঙ্কে আছি, বের হতে ভয় পাচ্ছি’ (২৮ সেপ্টেম্বর), একই দিনের প্রথম পাতার খবর, ‘স্টুডিও তছনছ, লুটপাট, শ্রমিকও রেহাই পায়নি’। আরেকটি খবরের শিরোনাম, ‘ফেসবুক স্ট্যাটাসের জেরে পিটিয়ে হত্যা’, ‘টাকা ভাংতি না দেওয়ায় দোকানিকে কুপিয়ে হত্যা’, ‘আসামি ধরতে গিয়ে আক্রমণের মুখে পুলিশের গুলি’।
প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায় হত্যাকাণ্ড, শিশু ও নারী নির্যাতন, মব সন্ত্রাসের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। একই পরিবারের সকল সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। রংপুরের জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্টের (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই মব সহিংসতার ৩৫টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৩২ জন। নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২৩৬ নারী ও কন্যাশিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে অন্তত ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ৪৭ জন ১৮ বয়সের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। সংগঠনের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, সারা দেশের নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের ৬৬টি ঘটনায় ৫৯ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত ২০টি ঘটনায় কমপক্ষে ৩৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
সর্বশেষ গতকাল রোববার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তব্যরত বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী দেশি অস্ত্র নিয়ে হামলা করেন। এই হামলার ঘটনায় চার সাংবাদিক আহত হয়েছেন। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেছেন, ‘আমরা ব্যর্থ। আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি, পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে’ (সমকাল, ৪ অক্টোবর ২০২৬)।
মব সন্ত্রাসের দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই বর্তায়। জনজোট তৈরি করে সেই সময় একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। রাস্তাঘাটে নারীদের চরমভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, শিক্ষাঙ্গনে অনেক শিক্ষককে করা হয়েছে লাঞ্ছিত। কবর থেকে লাশ উঠিয়ে পোড়ানোর মতো বীভৎস ঘটনাও ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। অসংখ্য মাজার ভাঙা হয়েছে, পণ্ড করা হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে তিন দফা ভাঙার ঘটনা ঘটে। দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা চালানো হয়েছে। সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচীও হামলার শিকার হয়। সবক্ষেত্রে পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
নতুন সরকারকে শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তবে দীর্ঘ সাত মাসে পরিস্থিতি যথেষ্ট উন্নতি হওয়া জরুরি ছিল। সরকার উন্নয়নের কথা বলছে। বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে এবং যথেষ্ট তৎপরতাও চালাচ্ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলার উন্নতি না গেলে বিদেশি বিনিয়োগ কতখানি আকর্ষণ করা যাবে তা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যায়।
আইনশৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাহিনীগুলোর বিশেষ করে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে বাহিনীর কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এর আগের শর্ত হচ্ছে, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের নেপথ্যে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করা। এ বিষয়ে আরেকটি জরুরি শর্ত হচ্ছে, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এরকম আরও কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট


















-eb944a-256x144.webp)



