মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: প্রবাসী শ্রমবাজার সুরক্ষায় কূটনৈতিক প্রস্তুতি জরুরি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত সম্পৃক্ততায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল ভূরাজনৈতিক সংকট নয়; বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও এক বড় সতর্কসংকেত। উপসাগরীয় অঞ্চল বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রধান গন্তব্য। বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখের বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী বিভিন্ন দেশে কর্মরত; যাদের সিংহভাগ অবস্থান করছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিদেশে গেছেন ১৩ লাখের বেশি কর্মী, যার প্রায় ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই ১১ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন, যার মধ্যে সাড়ে সাত লাখের বেশি সৌদি আরবে।

এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও বৈদেশিক আয় কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে আঞ্চলিক যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত, ভিসা নবায়নে জটিলতা, প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রত্যাবাসনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স এখন জীবনরেখার মতো। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে এসেছে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। শুধু সৌদি আরব থেকেই বছরে রেমিট্যান্স আসে ছয় থেকে সাত বিলিয়ন ডলার।

এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, বাজেটের ভারসাম্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যদি নির্মাণ ও অবকাঠামো প্রকল্প স্থগিত হয়, কর্মঘণ্টা কমে যায় বা ব্যাংকিং লেনদেন ব্যাহত হয়, তাহলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পতনের আশঙ্কা রয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বে, টাকার মান দুর্বল হতে পারে এবং আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।

এদিকে তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং শিল্প উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও প্রতিফলিত হওয়ার ঝুঁকি প্রবল।

এ প্রেক্ষাপটে কেবল তাৎক্ষণিক সংকট ব্যবস্থাপনা নয়, সমন্বিত কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ জোরদার করে প্রবাসীদের নিরাপত্তা, ভিসার স্থিতি ও কর্মচুক্তি সুরক্ষায় সক্রিয় হতে হবে। প্রতিটি দূতাবাসে জরুরি সেল, হটলাইন ও ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি, যেন প্রয়োজন হলে দ্রুত সহায়তা ও প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা নীতি অনুযায়ী বর্তমানে যে ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা অব্যাহত রেখে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ বাড়াতে হবে এবং হুন্ডি প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করতে হবে।

প্রবাসী কল্যাণ তহবিলকে আরও কার্যকর করে জরুরি আর্থিক সহায়তা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রত্যাবাসিত শ্রমিকদের জন্য দেশে অস্থায়ী কর্মসংস্থান ও দক্ষতা পুনর্বিন্যাস কর্মসূচি প্রস্তুত রাখা উচিত, যাতে শ্রমবাজারে আকস্মিক চাপ কমানো যায়।

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কমিয়ে শ্রমবাজারে বৈচিত্র্য আনা। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, রোমানিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেইসহ বিকল্প বাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ বাড়ানো হলেও ভাষা দক্ষতা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সনদের ঘাটতি এখনো বড় বাধা। তাই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা, আইটি ও প্রকৌশল খাতে উচ্চদক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং বিদেশি নিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সমঝোতা জোরদার করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে দেশে শিল্পায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য ও অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবাসী আয়ের ওপর অতিনির্ভরতাও কমাতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ হয়তো সাময়িক, কিন্তু এর ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য কাঠামোগত। তাই এখনই কূটনৈতিক তৎপরতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রবাস ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

প্রবাসী শ্রমিকদের ঘামে গড়ে ওঠা রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। সেই স্তম্ভ সুরক্ষায় সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই হতে পারে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে কার্যকর উত্তর।

লেখক: উপপরিচালক (ফ্যাকাল্টি এইচআর), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি; সাবেক সহসভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা)

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বই কেনা নয়, পড়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে

বই আমাদের জীবনের কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ঘরের সাজসজ্জার অংশ হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বইকে এমন এক ধরনের ‘সামাজিক আসবাব’ হিসেবেও ব্যবহার করেন, যা ঘরের রুচি ও সামাজিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। হকিংয়ের বই নিয়ে পুরোনো এক প্রতিবেদনে প্রকাশকরাই এমন বইকে ‘সোশ্যাল ফার্নিচার’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

৪ দিন আগে

ভূমিকম্পের পরে উদ্ধার নয়, বিপর্যয়ের আগেই জীবন বাঁচাতে হবে

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সতর্ক করেছেন— বড় ভূমিকম্পে ঢাকার বহু এলাকায় উদ্ধারকারী দলের পৌঁছানো কঠিন হবে, কোথাও কোথাও উদ্ধার অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। তার এ বক্তব্যকে একটি সংস্থার সীমাবদ

৫ দিন আগে

জ্বালানি সংকট: সাময়িক সমাধানের চেয়ে প্রয়োজন আরও বেশি কিছু

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির সংকট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, দুর্বল চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা পরিকল্পনার ঘাটতি মিলেই বারবার এই সংকট তৈরি করছে।

৬ দিন আগে

শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির বাণিজ্যের পথ যেন সুগম না হয়

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার বিকল্প নেই। এনটিআরসিএ’র বিদ্যমান কাঠামোর কোনো দুর্বলতা থাকলে তা পর্যালোচনা ও সংস্কারের মাধ্যমে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এই প্রক্রিয়াকে পেছনে ঠেলে দিয়ে আবার ব্যক্তি বা কমিটির দুর্নীতির সুযোগ করে

৬ দিন আগে