
মনোয়ার মোস্তফা

বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মহেশখালীতে একটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) আকস্মিক দুর্ঘটনার পর দেশ জুড়ে গ্যাস সরবরাহ চেইন আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে পড়েছে। সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি এখন তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে যেসব শিল্প কারখানা গ্যাস ব্যবহার করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তারাও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারছে না। বাসাবাড়িতেও গ্যাস পাচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন এক নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অর্থনীতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা— সবকিছুই ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে।
জনদুর্ভোগ ও চরম সামাজিক অস্থিরতা
বিদ্যুৎ ঘাটতির সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছে দেশের গ্রামাঞ্চল। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সেখানে প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং এক নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ভ্যাপসা গরম, অন্যদিকে সেচ সংকটে কৃষকের হাহাকার— সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ এতটাই ভয়াবহ যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি বা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলার ঘটনা ঘটছে। বাধ্য হয়ে অনেক জায়গায় কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে যখন পুলিশের পাহারায় কাজ করতে হয়, তখন বুঝতে হবে সংকট কতটা গভীর এবং কী ভয়াবহ মাত্রায় সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে।
স্থবির শিল্পখাত ও অর্থনীতির রক্তক্ষরণ
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই আকালের সরাসরি আঘাত লেগেছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল, সার, সিমেন্টসহ নানা ভারী ও রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পমালিকদের তথ্যমতে, পর্যাপ্ত গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানাগুলো নিজস্ব ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন সচল রাখার মরিয়া চেষ্টা করছে। কিন্তু জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম শিল্পের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছে অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমনিতেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে রয়েছে, তার ওপর রপ্তানি আয়ে ধস নামলে পুরো অর্থনীতি এক ভয়াবহ চক্রে আটকে পড়বে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার বিভ্রান্তি ও আর্থিক পঙ্গুত্ব
সাধারণ পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন জাগা খুব স্বাভাবিক— কাগজে-কলমে আমাদের তো ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে, তাহলে বিদ্যুৎ নেই কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে চরম এক আর্থিক সংকটের ভেতর। সরকার দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিল পরিশোধ করতে পারছে না। হিসাব অনুযায়ী, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনার পরিমাণ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা।
মাসের পর মাস বিল না পেয়ে এসব কেন্দ্র অর্থের অভাবে বিদেশ থেকে জ্বালানি (কয়লা বা ফার্নেস অয়েল) আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত রাখতে হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভৌত সক্ষমতা বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকার পরও, কেবল অর্থের অভাবে আমরা অন্ধকারেই পড়ে আছি।
আমদানি-নির্ভরতার ফাঁদ ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা
দেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো একক জ্বালানি-নির্ভরতা। আমাদের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪০ শতাংশেরও বেশি আসে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। অথচ গত এক দশকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না চালানোর কারণে দেশীয় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে পাওয়া যায় ২০০ থেকে ২২০ কোটি ঘনফুট।
এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে আমরা ২০১৮ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে বিশ্ব বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যায়, ভয়ানক আর্থিক চাপের মুখে পড়ে জাতীয় অর্থনীতি। কিন্তু সংকট শুধু ডলার বা অর্থের নয়, অবকাঠামোরও। যদি ধারকর্জ করে এলএনজি কেনার টাকা জোগাড়ও হয়, তবু সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
কারণ, আমদানি করা এলএনজিকে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার মতো আমাদের রি-গ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা খুবই সীমিত। বিশাল এই চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের সম্বল মাত্র দুটি এফএসআরইউ টার্মিনাল, যার একটি দুর্ঘটনায় বিকল। মনে রাখা দরকার, এ দু’টি ইউনিটের দৈনিক রি-গ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা মাত্র ৮৫ কোটি ঘনফুট। যদি এ দুটি ইউনিট পুরাদমে চালু থাকতো, তাহলেও কিন্তু প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি থেকে যেত।
এ ধরনের টার্মিনাল বিকল হলে তা মেরামত করতে অনেক সময় লাগে। এই অবকাঠামোগত দুর্বলতাই প্রমাণ করে যে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর।
নেই কোনো ‘কুইক ফিক্স’, সমাধান কোথায়?
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির উত্তরণে কোন রাতারাতি সমাধান বা ‘কুইক ফিক্স’ বলে কিছু নেই। অনেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর বিদ্যুতের (সোলার) কথা বেশ জোরেশোরে বলছেন। এটা ঠিক যে, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মধ্য কিংবা দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানিই একমাত্র পথ।
কিন্তু বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সোলার পাওয়ার রাতারাতি আমাদের এই বিশাল ঘাটতির সমাধান করতে পারবে না। শর্ট-টার্মে বা স্বল্প মেয়াদে বিদ্যুতের এই চলমান ঘাটতি পূরণের ম্যাজিক সোলারের হাতে নেই। তবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে এখন থেকেই বাসাবাড়ি, শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপকভিত্তিক ‘সোলারাইজেশন’ বা রুফটপ সোলার স্থাপন করে তা নেট-মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিকল্প নেই। সেই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
সত্যি বলতে, জ্বালানি খাতের বর্তমান এই মহাসংকট থেকে রাতারাতি মুক্তির কোনো ‘কুইক ফিক্স’ বা শর্টকাট সমাধান নেই। পৃথিবীর কোনো বিশেষজ্ঞই এর তাৎক্ষণিক জাদুকরী সমাধান দিতে পারবেন না। কারণ, আজকের এই পরিস্থিতি আকাশ থেকে পড়েনি। এটি অতীত থেকে সৃষ্ট। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার কথা না ভেবে আমরা আমদানি-নির্ভর ও ব্যয়বহুল এক বিদ্যুৎ খাত তৈরি করেছি।
একই সঙ্গে আমরা এমন একটি গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছি, যারা প্রায় এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে এই খাতে লুটপাট চালিয়েছে গেছে। বাস্তবতা হলো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে এমন এক ব্যবস্থা দাঁড় করানো হয়েছে, যা সামান্য বৈশ্বিক ধাক্কা, ডলার সংকট বা একটি টার্মিনাল বিকল হলেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচতে চাইলে আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতেই হবে। অতীতের ভুল নীতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার এটাই মোক্ষম সময়, নতুবা সামনে আরও গভীর অন্ধকার অপেক্ষা করছে।
লেখক: উন্নয়ন-অর্থনীতি বিশ্লেষক

বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মহেশখালীতে একটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) আকস্মিক দুর্ঘটনার পর দেশ জুড়ে গ্যাস সরবরাহ চেইন আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে পড়েছে। সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি এখন তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে যেসব শিল্প কারখানা গ্যাস ব্যবহার করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তারাও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারছে না। বাসাবাড়িতেও গ্যাস পাচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন এক নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অর্থনীতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা— সবকিছুই ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে।
জনদুর্ভোগ ও চরম সামাজিক অস্থিরতা
বিদ্যুৎ ঘাটতির সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছে দেশের গ্রামাঞ্চল। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সেখানে প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং এক নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ভ্যাপসা গরম, অন্যদিকে সেচ সংকটে কৃষকের হাহাকার— সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ এতটাই ভয়াবহ যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি বা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলার ঘটনা ঘটছে। বাধ্য হয়ে অনেক জায়গায় কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে যখন পুলিশের পাহারায় কাজ করতে হয়, তখন বুঝতে হবে সংকট কতটা গভীর এবং কী ভয়াবহ মাত্রায় সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে।
স্থবির শিল্পখাত ও অর্থনীতির রক্তক্ষরণ
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই আকালের সরাসরি আঘাত লেগেছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল, সার, সিমেন্টসহ নানা ভারী ও রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পমালিকদের তথ্যমতে, পর্যাপ্ত গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানাগুলো নিজস্ব ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন সচল রাখার মরিয়া চেষ্টা করছে। কিন্তু জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম শিল্পের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছে অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমনিতেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে রয়েছে, তার ওপর রপ্তানি আয়ে ধস নামলে পুরো অর্থনীতি এক ভয়াবহ চক্রে আটকে পড়বে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার বিভ্রান্তি ও আর্থিক পঙ্গুত্ব
সাধারণ পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন জাগা খুব স্বাভাবিক— কাগজে-কলমে আমাদের তো ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে, তাহলে বিদ্যুৎ নেই কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে চরম এক আর্থিক সংকটের ভেতর। সরকার দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিল পরিশোধ করতে পারছে না। হিসাব অনুযায়ী, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনার পরিমাণ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা।
মাসের পর মাস বিল না পেয়ে এসব কেন্দ্র অর্থের অভাবে বিদেশ থেকে জ্বালানি (কয়লা বা ফার্নেস অয়েল) আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত রাখতে হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভৌত সক্ষমতা বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকার পরও, কেবল অর্থের অভাবে আমরা অন্ধকারেই পড়ে আছি।
আমদানি-নির্ভরতার ফাঁদ ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা
দেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো একক জ্বালানি-নির্ভরতা। আমাদের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪০ শতাংশেরও বেশি আসে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। অথচ গত এক দশকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না চালানোর কারণে দেশীয় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে পাওয়া যায় ২০০ থেকে ২২০ কোটি ঘনফুট।
এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে আমরা ২০১৮ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে বিশ্ব বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যায়, ভয়ানক আর্থিক চাপের মুখে পড়ে জাতীয় অর্থনীতি। কিন্তু সংকট শুধু ডলার বা অর্থের নয়, অবকাঠামোরও। যদি ধারকর্জ করে এলএনজি কেনার টাকা জোগাড়ও হয়, তবু সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
কারণ, আমদানি করা এলএনজিকে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার মতো আমাদের রি-গ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা খুবই সীমিত। বিশাল এই চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের সম্বল মাত্র দুটি এফএসআরইউ টার্মিনাল, যার একটি দুর্ঘটনায় বিকল। মনে রাখা দরকার, এ দু’টি ইউনিটের দৈনিক রি-গ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা মাত্র ৮৫ কোটি ঘনফুট। যদি এ দুটি ইউনিট পুরাদমে চালু থাকতো, তাহলেও কিন্তু প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি থেকে যেত।
এ ধরনের টার্মিনাল বিকল হলে তা মেরামত করতে অনেক সময় লাগে। এই অবকাঠামোগত দুর্বলতাই প্রমাণ করে যে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর।
নেই কোনো ‘কুইক ফিক্স’, সমাধান কোথায়?
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির উত্তরণে কোন রাতারাতি সমাধান বা ‘কুইক ফিক্স’ বলে কিছু নেই। অনেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর বিদ্যুতের (সোলার) কথা বেশ জোরেশোরে বলছেন। এটা ঠিক যে, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মধ্য কিংবা দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানিই একমাত্র পথ।
কিন্তু বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সোলার পাওয়ার রাতারাতি আমাদের এই বিশাল ঘাটতির সমাধান করতে পারবে না। শর্ট-টার্মে বা স্বল্প মেয়াদে বিদ্যুতের এই চলমান ঘাটতি পূরণের ম্যাজিক সোলারের হাতে নেই। তবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে এখন থেকেই বাসাবাড়ি, শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপকভিত্তিক ‘সোলারাইজেশন’ বা রুফটপ সোলার স্থাপন করে তা নেট-মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিকল্প নেই। সেই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
সত্যি বলতে, জ্বালানি খাতের বর্তমান এই মহাসংকট থেকে রাতারাতি মুক্তির কোনো ‘কুইক ফিক্স’ বা শর্টকাট সমাধান নেই। পৃথিবীর কোনো বিশেষজ্ঞই এর তাৎক্ষণিক জাদুকরী সমাধান দিতে পারবেন না। কারণ, আজকের এই পরিস্থিতি আকাশ থেকে পড়েনি। এটি অতীত থেকে সৃষ্ট। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার কথা না ভেবে আমরা আমদানি-নির্ভর ও ব্যয়বহুল এক বিদ্যুৎ খাত তৈরি করেছি।
একই সঙ্গে আমরা এমন একটি গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছি, যারা প্রায় এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে এই খাতে লুটপাট চালিয়েছে গেছে। বাস্তবতা হলো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে এমন এক ব্যবস্থা দাঁড় করানো হয়েছে, যা সামান্য বৈশ্বিক ধাক্কা, ডলার সংকট বা একটি টার্মিনাল বিকল হলেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচতে চাইলে আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতেই হবে। অতীতের ভুল নীতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার এটাই মোক্ষম সময়, নতুবা সামনে আরও গভীর অন্ধকার অপেক্ষা করছে।
লেখক: উন্নয়ন-অর্থনীতি বিশ্লেষক

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, কাজী জেসিনের যোগ্যতা নিয়ে যুক্তি উপস্থাপনের পরিবর্তে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে— তিনি কার সঙ্গে ‘ঘুমিয়েছেন’, কাকে ‘খুশি করেছেন’ বা কীভাবে এই পদ পেয়েছেন। এসব মন্তব্য কোনোভাবেই রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, এগুলো নারীবিদ্বেষের প্রকাশ।
৫ দিন আগে
৫ আগস্ট রাতের সেই এক ধরনের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ পরিস্থিতি একটা চাপা শঙ্কা তৈরি করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পাশেই যা দেখেছিলাম— দেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার পতনের পর সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে ওঠা সেই অবর্ণনীয় আনন্দ— তা ছিল সম্পূর্ণ খাঁটি, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম।
৭ দিন আগে
আজ ৫ আগস্ট ২০২৬। সেই দুপুরের ঠিক দুই বছর পর। যে মিছিল সেদিন শাহবাগ, শহিদ মিনার আর যমুনার সামনের রাস্তায় থেমে গিয়েছিল আনন্দ-উল্লাসে, তার পায়ের শব্দ আজও যেন মিলিয়ে যায়নি। বদলেছে সরকার, বদলেছে সংসদ, বদলেছে রাষ্ট্রের নথিপত্র। কিন্তু সেই দিনের প্রশ্নগুলো এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
৭ দিন আগে
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ, রক্তক্ষয় এবং দেশ জুড়ে অশান্তির পর ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।
৭ দিন আগে