মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

সাজ্জাদুর রহমান
আপডেট : ১৭ মে ২০২৬, ১১: ৫৫
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। প্রতীকী ছবি

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা। ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় আগামী সপ্তাহের মধ্যেই দেশটিতে আবারও যৌথ সামরিক হামলা চালাতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরায়েল। তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এই আক্রমণাত্মক যুদ্ধপ্রস্তুতির বিপরীতে এবার সরাসরি সামরিক সংঘাতের চূড়ান্ত পাল্টা আলটিমেটাম দিয়েছে তেহরান।

ফরাসি গণমাধ্যম বিএফএমটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘ওয়াশিংটনের সাথে শিগগিরই কোনো শান্তিচুক্তি না হলে ইরানিদের জন্য সামনে ‘খুব খারাপ সময়’ অপেক্ষা করছে। চুক্তিতে পৌঁছানোই তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে।’ তবে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন করে আলোচনার বার্তা দেওয়া হলেও ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর অবিশ্বাস প্রকাশ করেছে তেহরান।

তীব্র বোমাবর্ষণ, ‘খার্গ দ্বীপ’ দখল কমান্ডো অভিযানের ছক

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস ও ইসরায়েলি গণমাধ্যমের বরাতে শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ অত্যাসন্ন ধরে নিয়ে ইতিমধ্যেই মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে এবার ইরানের সামরিক ও অন্যান্য অবকাঠামো লক্ষ্য করে আগের চেয়েও তীব্র বোমাবর্ষণ করা হবে।

এর পাশাপাশি পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের তেল রপ্তানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ‘খার্গ দ্বীপ’ দখল করার পরিকল্পনাও করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। একই সঙ্গে ইরানের মূল ভূখণ্ডে কমান্ডো পাঠিয়ে সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম জব্দ করে নিয়ে আসার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছক আঁকা হয়েছে, যেখানে ইরানি সেনাদের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলি বিশেষ বাহিনীর সরাসরি রক্তক্ষয়ী লড়াই হতে পারে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২ কে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, “আমেরিকানরা বুঝতে পেরেছে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় কোনো সমাধান আসবে না। আমরা কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছি।”

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি: ‘ভুগতে হবে মার্কিন নাগরিকদের’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ যুদ্ধপ্রস্তুতির জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন, কূটনীতি ব্যর্থ হলে আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে এই সংঘাতের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ ও ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মার্কিন নাগরিকদেরই বহন করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে আরাঘচি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধির একটি চিত্র যুক্ত করে জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়েই হয়ে থাকে।

তিনি দাবি করেন, যুদ্ধের হুমকি যতদিন থাকবে, মার্কিন অর্থনীতি তত দ্রুত মন্দার দিকে যাবে, গৃহঋণের সুদ বাড়বে এবং গাড়ি ঋণ খেলাপি হওয়ার হার (যা ইতিমধ্যে ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ) আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

একই সুর মিলিয়ে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ব্যঙ্গ করে বলেন, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘অভিনয়ধর্মী যুদ্ধ’ চালাচ্ছে, যা নতুন বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ডেকে আনবে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ৩০ বছর মেয়াদি ২৫ বিলিয়ন ডলারের বন্ড দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৫ শতাংশ সুদে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে।

মূল দ্বন্দ্ব যেখানে

এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’। ইরান এই জলপথে নিজেদের সার্বভৌম অধিকারের স্বীকৃতি চাইলেও উপসাগরীয় দেশ ও মার্কিন জোট এটিকে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে দাবি করছে। এর মধ্যেই ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান এব্রাহিম আজিজি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে তেহরান একটি নতুন ব্যবস্থা প্রস্তুত করেছে, যেখানে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনা কিংবা সামরিক চাপ—যেকোনো উপায়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করতে পারলে ট্রাম্প নিজেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারবেন। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন ভোটারদেরও বোঝাতে সক্ষম হবেন যে, ইরানে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী সামরিক অভিযান সফল ছিল। এর আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র দুবার দেশটির ওপর সামরিক হামলা চালিয়েছিল। এখন ট্রাম্পের চূড়ান্ত ‘গ্রিন সিগন্যাল’-এর ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ।

যুদ্ধ বাধলে কেমন হবে বিশ্ব পরিস্থিতি?

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সপ্তাহের মধ্যে এই যুদ্ধ সত্যি সত্যি শুরু হলে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং নিমেষেই তা বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে এক প্রলয়ংকরী বিপর্যয় ডেকে আনবে:

পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার এবং বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে হয়। এটি বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে, যার ধাক্কায় পুরো বিশ্বে একযোগে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতি শুরু হবে।

ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলা হলে রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো তেহরানের পক্ষে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে অবস্থান নিতে পারে। অন্যদিকে মার্কিন মিত্র ন্যাটো জোট ওয়াশিংটনের পাশে দাঁড়ালে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক এই সংঘাত রূপ নিতে পারে এক বৈশ্বিক মহাযুদ্ধে।

সংঘাতের জেরে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার প্রধান নৌ ও বিমান রুটগুলো ব্লক হয়ে যাবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং সাধারণ ভোগ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করাবে—তা এখন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে হোয়াইট হাউজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের সাফল‍্য দেখার অপেক্ষায়

ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন ধর্মীয় উগ্রতা বা বিভাজনের রাজনীতি থেকে সরে এসে বৃহত্তর মানবিকতা, সার্বজনীনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদের পথে এগোয়। ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগানটি যদি সত্যিকার অর্থে একটি ঐক্যের আহ্বান হয়ে ওঠে, তবে তা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য হত

১১ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, বাংলাদেশের হিসাব-নিকাশ

বিজেপির নেতৃত্বে দিল্লির কেন্দ্র সরকার ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ককে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে, যা বাংলাদেশের এখনকার নতুন সরকারের সঙ্গেও টেকসই সম্পৃক্ততা ও যোগাযোগের মাধ্যমে প্রমাণিত। এটি ইঙ্গিত দেয়, নির্বাচনি প্রচারের ‘পলিটিক্যাল রেটোরিক’ তাদের দেশীয় রাজনীতির জন্য লাভজনক হতে প

১১ দিন আগে

শিশু-কিশোরদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উন্মুক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সেখানে নানা ধরনের আচরণ ও কার্যকলাপ শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর। প্রতারণা ও হয়রানির ঝুঁকির পাশাপাশি শিশুরা অনলাইন বুলিংয়েরও শিকার হয়।

১৪ দিন আগে

দেশীয় উৎস এবং পুঁজিবাজারকে আস্থায় নিতে হবে

এ দেশ এখনো পর্যন্ত মীরজাফর, ঘষেটি বেগম, জগৎ শেঠ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (ইন্ডিকো) কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্রমুক্ত হতে পারেনি। ওদের ওপর সরকারসহ প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি। জাতীয় ঐক্য সুসংহত হওয়ার বিষয়টিও জরুরি।

১৫ দিন আগে