ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক: আন্তর্জাতিক আইনের মোড়কে কি শুধুই মুখরক্ষার চুক্তি?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সই করেছে সমঝোতা স্মারকে। প্রতীকী ছবি

যুদ্ধ শুরু করার চেয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি কঠিন। গত কয়েক মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এই সত্যটিই সবচেয়ে কঠিনভাবে উপলব্ধি করেছেন। এখন যেহেতু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে, তাই আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক অনুশীলনের মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে এই চুক্তিতে আসলে কী বিষয়ে সম্মতি হয়েছে, তা পরিমাপ করা সম্ভব হচ্ছে।

১৪ দফার এই নথিতে কার্যত ইরানের প্রায় সব প্রধান দাবিরই প্রতিফলন দেখা যায়। যুদ্ধ চলাকালে যদি এসব দাবি উত্থাপন করা হতো, তাহলে অনেক পর্যবেক্ষকের কাছেই সেগুলো সম্পূর্ণ অবাস্তব বলে মনে হতে পারত। কারণ সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক ও সামরিক— উভয় ধরনের প্রধান চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারই অনেকাংশে হারাচ্ছে।

অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ বাধ্যবাধকতা কী হবে, সেটি এখনো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়নি। এমনকি ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার মতো যুদ্ধকালীন মার্কিন লক্ষ্যগুলোরও কোনো উল্লেখ এই দলিলে নেই।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— এটি কি আদৌ কোনো আইনগতভাবে বাধ্যবাধকতাপূর্ণ চুক্তি?

আইনি চুক্তি, নাকি রাজনৈতিক অঙ্গীকার?

একটি সমঝোতা স্মারক রাজনৈতিক কিংবা আইনি— দুই ধরনের প্রতিশ্রুতিই হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক চুক্তি কার্যকর করতে সাধারণত সিনেটের পরামর্শ ও সম্মতির প্রয়োজন হয়।

এই সমঝোতা স্মারকের প্রথম বাক্যেই বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘যৌথভাবে সম্মত হয়েছে’। এই ধরনের ভাষা একটি অনানুষ্ঠানিক আইনি চুক্তির ইঙ্গিত দিতে পারে, যা মূলত ‘সদিচ্ছা’র (গুড ফেইথ) ভিত্তিতে কার্যকর থাকে। দলিলটির প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রদর্শনের পাশাপাশি এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন না করার জন্য দুপক্ষ সম্ভবত এই সীমা পর্যন্তই যেতে পেরেছে।

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, উভয় পক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ নিয়ে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ আন্তর্জাতিক আইনের কোনো নির্দিষ্ট কারিগরি শব্দ নয়, তবু নথিতে বলা হয়েছে যে এটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি ‘বাধ্যতামূলক’ প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যৎ চুক্তির আইনি প্রকৃতি নিয়ে যে অস্পষ্টতা রয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদের এমন একটি প্রস্তাব তা দূর করতে পারে। সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আইনি বাধ্যবাধকতার উৎস হবে মূলত জাতিসংঘ সনদ।

কিন্তু এখানেই দেখা দেয় বড় ধরনের একটি দ্বন্দ্ব। কারণ ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরান— উভয় পক্ষই সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতির প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি ছাড়াই ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির নেতৃত্বের একটি বড় অংশকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের বাইরে থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে এবং সরকারবিরোধী হাজারও নাগরিককে হত্যা করেছে।

তাহলে এমন দুপক্ষের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তিকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া যায়? আর এই সমঝোতা স্মারক আন্তর্জাতিক আইনের বর্তমান অবস্থার ব্যাপারে আমাদের কী বার্তা দেয়?

কীভাবে বজায় থাকবে শান্তি?

সমঝোতা স্মারকের কিছু ধারা মূলত চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত প্রথম ৬০ দিনের অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য প্রযোজ্য। তবে এর বহু বিধানই স্থায়ী প্রকৃতির।

এর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান ‘স্থায়ীভাবে’ বন্ধ করার ঘোষণা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এই প্রতিশ্রুতি চূড়ান্ত চুক্তি অর্জনের ওপর নির্ভরশীল নয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা সামরিক অভিযান শুরু না করার বিষয়েও উভয় পক্ষ অঙ্গীকার করেছে।

মূলত এর মাধ্যমে দুই দেশ জাতিসংঘ সনদের সেই মৌলিক বাধ্যবাধকতাকে পুনরুজ্জীবিত করছে, যেখানে আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, এই অঙ্গীকার ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তিতে আরও সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু গত এক বছরে দুবার হামলার শিকার হওয়ার পর মার্কিন প্রতিশ্রুতির ওপর ইরানের আস্থা কতটা থাকবে, সেটি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

নথিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করবে না। এর অর্থ হলো— ভবিষ্যতে চূড়ান্ত চুক্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রেও আর বলপ্রয়োগের হুমকি ব্যবহার করা যাবে না।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো— চূড়ান্ত চুক্তি কার্যকর হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ‘নিকটবর্তী এলাকা’ থেকে তার বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু এর বাস্তব অর্থ কী?

আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক মোতায়েনের ক্ষেত্রে এটি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা স্পষ্ট নয়। ধারণা করা যায়, এর মধ্যে মার্কিন নৌ সম্পদ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষেত্রে কী হবে? আবার ইরানের ‘নিকটবর্তী এলাকা’ বলতে ঠিক কতটুকু ভূখণ্ড বা সামুদ্রিক অঞ্চল বোঝানো হয়েছে, তাও পরিষ্কার নয়।

তারপরও এটুকু বলা যায়, ইরানের নিরাপত্তা উদ্বেগকে সম্মান জানিয়ে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি সীমিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখানে একটি বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে।

ইসরায়েল, লেবানন ও আঞ্চলিক বাস্তবতা

এই সমঝোতা স্মারক কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে ‘চলমান যুদ্ধে তাদের মিত্রদের’ কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ বিমান হামলা বন্ধ হওয়ার কথা। একই সঙ্গে চুক্তির আনুষ্ঠানিক পক্ষ না হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলকে লেবাননের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং দেশটির আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করতে হবে— এমন একটি ধারণাও এই দলিল থেকে পাওয়া যায়।

তবে বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। ইসরায়েলের কাছ থেকে এমন সংযম প্রত্যাশা করা কঠিন। ফলে এই ধারা চুক্তির একটি স্থায়ী দুর্বলতা কিংবা অস্থিতিশীল উপাদান হয়ে উঠতে পারে।

আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো— যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে।

এই প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ গত ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানে একটি গণঅভ্যুত্থানকে উৎসাহিত করেছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে এ অবস্থান পরিবর্তনকে একটি বড় কূটনৈতিক ছাড় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলে কি ফি আদায় করতে পারবে ইরান?

সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে। এর বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে। তবে বিতর্কের শুরু এখানেই।

নথি অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরান তার ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’ ব্যবহার করবে। কিন্তু কোনো ফি বা চার্জ ছাড়া এই ব্যবস্থা কেবল প্রথম ৬০ দিনের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ, ৬০ দিনের পর কী হবে— সে প্রশ্নের উত্তর খোলা রাখা হয়েছে।

সমঝোতা স্মারকে আরও বলা হয়েছে, ওমানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ‘সামুদ্রিক পরিষেবাগুলোর ভবিষ্যৎ প্রশাসন’ নির্ধারণ করা হবে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এই ভাষা এমন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, যার মাধ্যমে ইরান ও ওমান ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচলের প্রশাসনিক ব্যয় দেখিয়ে কোনো ধরনের টোল বা ফি আরোপ করতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইন অবশ্য স্বীকার করে যে জটিল নৌ পথ কিংবা বিশেষ চুক্তি ব্যবস্থার আওতাভুক্ত প্রণালিগুলোর ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী দেশগুলো নৌচলাচল সহায়ক অবকাঠামোর ব্যয় (পাইলটেজ চার্জ) মেটাতে সীমিত পরিমাণ ফি আদায় করতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো— যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালিতে এমন কোনো ফি নেওয়া হতো না। আর যুদ্ধের পরও এমন কোনো নতুন পরিষেবার প্রয়োজন দেখা দেয়নি, যার জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায় যৌক্তিক হতে পারে। তারপরও সমঝোতা স্মারকটি ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যতে ইরান কোনো না কোনো ধরনের ছদ্মবেশী টোল বা কর আরোপের চেষ্টা করতে পারে।

এমনটি হলে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালিগুলোতে উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করার যে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক আইনি নীতি রয়েছে, সেটি আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কী বলা হয়েছে?

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে ইরানের তেল রপ্তানি ও সংশ্লিষ্ট সেবার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। এর ফলে ইসলামিক রিপাবলিকে বিপুল পরিমাণ অর্থপ্রবাহ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এ ছাড়া চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে দ্রুত প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

আবার বলপ্রয়োগ, সামরিক হুমকি কিংবা নতুন অবরোধ আরোপের বিকল্প পথ— যা যুক্তরাষ্ট্র এই সমঝোতার মাধ্যমে বর্জন করেছে— সেগুলো বাদ দিলে এই অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোই এখন ইরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগের প্রধান প্রণোদনা বলে মনে হয়। অথচ এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান যুদ্ধকালীন লক্ষ্য।

সমঝোতা স্মারকে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এটি নতুন কোনো অবস্থান নয়। বহু বছর ধরেই তেহরানের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এমনই।

আলোচনার শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ইরানের সব উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান বিদেশে পাঠিয়ে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। কিন্তু নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে সেই উপাদানগুলো ইরানের ভেতরেই কম সমৃদ্ধ (ডাউন-ব্লেন্ড) করা যেতে পারে।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল, ইরান আগামী কয়েক দশকের জন্য ভবিষ্যৎ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করুক। কিন্তু সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, বিষয়টি ‘ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজন’ বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা করা হবে। অর্থাৎ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা এখানে নেই।

বাস্তব চুক্তি, নাকি মুখরক্ষার ব্যবস্থা?

সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়— এটি কি সত্যিকার অর্থে একটি কার্যকর চুক্তি? ট্রাম্প প্রশাসন কি সত্যিই জাতিসংঘের সেই নীতিকে মেনে নিয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে বলপ্রয়োগকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে?

তা বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ সমঝোতায় সইয়ের পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন। এ অবস্থায় কেউ কেউ মনে করতে পারেন, এই সমঝোতা স্মারক আসলে ইরানের সামরিক নেতৃত্বকে একটি সমঝোতা মেনে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তৈরি একটি ‘মুখরক্ষা’র ব্যবস্থা মাত্র।

যদি সেই ব্যাখ্যা সঠিক হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বহু প্রতিশ্রুতিই আসলে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আগে থেকেই বিদ্যমান বাধ্যবাধকতার পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছু নয়। সে ক্ষেত্রে বাস্তবে নতুন চুক্তির পরিমাণ খুবই সীমিত। আর আগামী ৬০ দিনের মধ্যে এই সমঝোতার অসংখ্য ফাঁকফোকর ও অস্পষ্টতা দূর করার সম্ভাবনাও খুব বেশি উজ্জ্বল নয়।

নথিতে বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে। এর ফলে ওয়াশিংটন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ‘ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য’ বরাদ্দ ৩০০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই অর্থ কোথা থেকে আসবে? কারা দেবে? কীভাবে ব্যবহৃত হবে?

বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা

সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন অনেকাংশে এমন সব পক্ষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে, যারা এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক অংশ নয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মতি প্রয়োজন হবে। ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদের একটি বড় অংশও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

অন্যদিকে লেবাননে শান্তি বজায় রাখা অনেকাংশে ইসরায়েলের নীতির ওপর নির্ভর করবে। অথচ বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্কও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন হবে। আইএইএ জাতিসংঘের আওতাধীন একটি স্বাধীন সংস্থা, আর ঠিক এই ধরনের বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিই ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অনাস্থা রয়েছে।

এখানেই দেখা যায় সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। নিজের শুরু করা যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত আবার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং সেই আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে, যেগুলোকে একসময় অকার্যকর বা অপ্রয়োজনীয় বলে পাশ কাটিয়ে যেতে চেয়েছিল।

গত জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে জোর করে সরিয়ে দেওয়ার পর হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে মনে হয়েছিল, বলপ্রয়োগ এখনো একটি কার্যকর কৌশল। কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক অন্য একটি বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সেটি হলো— যুদ্ধ এখনো ততটাই অনিশ্চিত, ব্যয়বহুল ও অনাকাঙ্ক্ষিত, যতটা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় এর স্থপতিরা বিশ্বাস করেছিলেন। আর সেই কারণেই সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

[যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজে প্রকাশিত বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধের ভাবানুবাদ। নিবন্ধটি লিখেছেন চ্যাথাম হাউজের গ্লোবাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সিকিউরিটি সেন্টারের ইন্টারন্যাশনাল ল প্রোগ্রামের পরিচালক মার্কিন ওয়েলার।]

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুষ্টু লোক, স্বাস্থ‍্যমন্ত্রীর কোটি টাকা ও মিরাকল প্রতিমন্ত্রী

সাম্প্রতিক সময়ের তিনটি আলোচিত ঘটনা যেন একই নাটকের তিনটি দৃশ্য। চরিত্র আলাদা, সংলাপ আলাদা, কিন্তু প্রশ্ন একটাই— প্রকৃত সত্য কী? সবটাই যে সত্য, তা নয়। আবার সবটাই যে মিথ্যা, সেটিও বলা যায় না। আর এই ধূসর অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হয় জনবিশ্বাসের।

৫ দিন আগে

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

১০ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১২ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১২ দিন আগে