স্বাস্থ্য

পাইলসের ঘরোয়া চিকিৎসা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
প্রতিকী ছবি। ছবি : এআইয়ের তৈরি।

পাইলস বা হেমোরয়েডস এমন একটি সমস্যা যা লজ্জাজনক মনে হলেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এতে ভুগছেন। এই রোগে মলদ্বারের ভেতরের রক্তনালী ফুলে যায় এবং অনেক সময় বাইরে বেরিয়ে আসে। ফলে মলত্যাগের সময় তীব্র ব্যথা, রক্তপাত ও অস্বস্তি হয়। আধুনিক চিকিৎসার নানা উপায় থাকলেও বেশিরভাগ মানুষ প্রথমে ঘরোয়া চিকিৎসার দিকে ঝুঁকে পড়েন। কারণ এসব উপায় অনেক সময় কার্যকর হয়, খরচ কম এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম।

পাইলস নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো লজ্জা। অনেকেই ডাক্তারকে বলতে চান না। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে ঘরোয়া উপায়ে সমস্যা সামলানোর চেষ্টা করা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবনযাত্রার পরিবর্তন আর কিছু প্রাকৃতিক পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে পাইলস নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে।

আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস (NIDDK)-এর গবেষক ড. লিসা হ্যারিস বলেছেন, “পাইলসের প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হয় ঘর থেকেই। পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত ব্যায়াম অনেক ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার ছাড়াই উপশম দেয়।” তিনি আরও বলেন, “অতিরিক্ত ওষুধের ওপর নির্ভর না করে, প্রাকৃতিক উপায়ে শরীরকে স্বাভাবিক রাখা খুবই কার্যকর।”

পাইলসের অন্যতম বড় ঘরোয়া চিকিৎসা হলো আঁশ বা ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। আঁশ মলকে নরম রাখে এবং সহজে বের হতে সাহায্য করে। ফলে মলত্যাগের সময় চাপ কম পড়ে। শাকসবজি, ফল, ডাল, গমের রুটি, ওটস, কলা এবং শশা আঁশের ভালো উৎস।

লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ড. রিচার্ড ওয়াটস উল্লেখ করেছেন, “প্রতিদিন অন্তত ২৫-৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়া উচিত। এটি শুধু পাইলস নয়, হজম প্রক্রিয়ার সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো।” তিনি আরও বলেন, “যেসব দেশে মানুষ প্রচুর শাকসবজি ও আঁশ খায়, সেখানে পাইলসের প্রকোপ অনেক কম।”

পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পানও জরুরি। দিনে অন্তত ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি খেলে শরীরের টক্সিন বের হয় এবং মল নরম থাকে।

গরম পানিতে বসা বা সিটজ বাথ অনেক পুরনো কিন্তু কার্যকর ঘরোয়া চিকিৎসা। এতে ব্যথা ও চুলকানি কমে যায় এবং আক্রান্ত স্থানে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। এক বালতি বা টবে হালকা গরম পানি নিয়ে প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট বসলে আরাম পাওয়া যায়।

মায়ো ক্লিনিকের কোলন ও রেকটাল সার্জন ড. মার্ক টেলর বলেছেন, “সিটজ বাথকে আমরা সাপোর্টিভ থেরাপি বলি। এটি সরাসরি রোগ সারায় না, তবে পাইলসের যন্ত্রণা ও অস্বস্তি অনেকটাই কমিয়ে দেয়।”

পাইলসের ঘরোয়া চিকিৎসায় নারকেল তেল খুব জনপ্রিয়। এতে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ আছে যা ব্যথা ও ফোলা কমায়। নারকেল তেল সরাসরি আক্রান্ত স্থানে লাগানো যায় অথবা খাদ্যতালিকায় ব্যবহার করা যায়।

অন্যদিকে অ্যালোভেরা জেলও একইভাবে কার্যকর। এতে রয়েছে শীতলকারী উপাদান যা জ্বালা-পোড়া কমায়। আমেরিকান হার্বাল মেডিসিন গবেষক ড. নিকোলাস গ্রিন লিখেছেন, “অ্যালোভেরা শুধু পাইলস নয়, বিভিন্ন ত্বকের প্রদাহে আশ্চর্যজনক কাজ করে। তবে এটি ব্যবহার করার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে জেলটি খাঁটি।”

ব্যথা ও ফোলা কমানোর আরেকটি সহজ উপায় হলো বরফ। কাপড়ে মোড়ানো বরফ কয়েক মিনিট আক্রান্ত স্থানে ধরলে প্রদাহ কমে যায়। যদিও এটি সাময়িক আরাম দেয়, তবুও তাৎক্ষণিক কষ্ট লাঘবের জন্য বরফ খুব কার্যকর।

পাইলসের ঘরোয়া চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাত্রার পরিবর্তনও জরুরি। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, টয়লেটে বেশি সময় নেওয়া, ভারী জিনিস তোলা বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করলে রক্তসঞ্চালন ভালো হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষক ড. এমিলি স্টোন বলেন, “শুধু ওষুধ বা ঘরোয়া চিকিৎসাই নয়, জীবনযাত্রা পরিবর্তন না করলে পাইলস বারবার ফিরে আসে। তাই প্রতিদিন হাঁটা, সঠিক ডায়েট ও পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি।”

পাইলসের ঘরোয়া চিকিৎসায় ভেষজের ব্যবহারও জনপ্রিয়। যেমন উইচ হ্যাজেল নামের একটি গাছের নির্যাস ত্বকে লাগালে ব্যথা ও চুলকানি কমে। এতে প্রাকৃতিক অ্যাস্ট্রিনজেন্ট গুণ আছে যা রক্তপাত বন্ধ করতে সাহায্য করে।

ইউরোপের জার্মান কমিশন ই-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, উইচ হ্যাজেল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাইলস ও ত্বকের প্রদাহে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এছাড়া তিল তেল, অলিভ অয়েল, মধু ইত্যাদিও অনেক সময় ব্যথা কমাতে কাজে আসে।

যদিও পাইলসের ঘরোয়া চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর, কিন্তু সব রোগী সমানভাবে আরোগ্য লাভ করেন না। যদি রক্তপাত বেড়ে যায়, তীব্র ব্যথা হয়, অথবা পাইলস অনেক বড় হয়ে যায় তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “পাইলস প্রাথমিক অবস্থায় ঘরোয়া চিকিৎসায় উপশম পাওয়া গেলেও জটিল অবস্থায় সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে।”

পাইলস একটি সাধারণ কিন্তু অস্বস্তিকর রোগ। অনেক সময় মানুষ ডাক্তার দেখাতে লজ্জা পান, কিন্তু ঘরোয়া চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। পর্যাপ্ত আঁশ খাওয়া, প্রচুর পানি পান, নিয়মিত ব্যায়াম, সিটজ বাথ, নারকেল তেল ও অ্যালোভেরার ব্যবহার এসবই প্রমাণিত ঘরোয়া উপায়।

তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো প্রাথমিক চিকিৎসা মাত্র। যদি সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা জটিল রূপ নেয়, তবে চিকিৎসকের শরণ নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরোয়া চিকিৎসা ও আধুনিক চিকিৎসার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করলেই পাইলসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

Ad
Ad
ad
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

জোছনা আর হারিকেন-কুপির আলোয় জমল হারানো পুঁথি পাঠের আসর

বাড়ির উঠোনের এক পাশে খড়ের পালা, অন্য পাশে পুঁথি পাঠের আয়োজন। ভ্যাপসা গরমেও মানুষের আগ্রহে কমতি নেই। আয়োজকরা ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। মাথার ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ, আর উঠোনে কুপি ও হারিকেনের আলো— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম এক আবহ।

২৫ দিন আগে

প্রেমের নাটক-সিনেমার নির্মাণ-সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ চেয়ে আইনি নোটিশ

আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন নোটিশে বলেছেন, মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের অনৈতিক সম্পর্কের অবাধ প্রদর্শন সামাজিক নৈরাজ্য তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। দেশে পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যুবসমাজ ও সাধারণ জনগণকে এই নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা এবং পারি

২৭ আগস্ট ২০২৬

এথিকের ‘হাঁড়ি ফাটিবে’র শততম মঞ্চায়ন ২২ আগস্ট, বিশেষ প্রদর্শনী

এথিকের প্রথম প্রযোজনা ‘হাঁড়ি ফাটিবে’ নতুন আঙ্গিকে নির্দেশনা দিয়েছেন মিন্টু সরদার। নাটকটির শততম মঞ্চায়ন উপলক্ষ্যে মঞ্চ ও নেপথ্যে যুক্ত থাকা ১০০ জন কলাকুশলীকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে।

২০ আগস্ট ২০২৬

বাংলা নাটকের রূপকার সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

১৯৪৯ সালের এ দিনে সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মফিজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব কাস্টমস এবং মা মরহুম ফিরোজা খাতুন।

১৮ আগস্ট ২০২৬
Advertisement