মধ্যপ্রাচ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ২৫ লাখের ড্রোন ‘শাহেদ-১৩৬’

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৬: ৫৩
ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন। ছবি: সংগৃহীত

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে এক অদ্ভুত শব্দ— ঘাস কাটার মেশিনের (লনমাওয়ার) মতো কর্কশ ধ্বনি। মুহূর্তের মধ্যে সেই শব্দ রূপ নিচ্ছে বিস্ফোরণে। ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্ব জুড়ে পরিচিতি পাওয়া ইরানের ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণ।

গত কয়েক দিনে বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে শত শত ড্রোন হামলার খবর মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক তৎপরতার পর ইরান শুরু করেছে প্রতিশোধমূলক অভিযান ‘ট্রু প্রমিস ৪’। এ অভিযানে কোটি কোটি টাকার ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং আতঙ্ক ছড়াচ্ছে স্বল্পমূল্যের কিন্তু দূরপাল্লার শাহেদ-১৩৬ ড্রোন। প্রতিটি ড্রোনের আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা হলেও এর কৌশলগত প্রভাব অনেক বেশি।

গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে এক হাজারের বেশি ড্রোন ছুড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর একটি বড় অংশই শাহেদ-১৩৬ মডেলের।

ভিডিওতে ধরা পড়া ‘শাহেদ’ আতঙ্ক

সম্প্রতি বাহরাইনের এক ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি ডেল্টা-উইং ড্রোন রাতের অন্ধকার চিরে একটি বহুতল ভবনের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তেই বিস্ফোরণ— ব্যালকনি ভেঙে আগুন ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ছে নিচে। আরেকটি ফুটেজে দেখা যায়, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদরদপ্তরের ওপর একটি ড্রোন উড়ে গিয়ে রাডার ডোমে আঘাত হেনে সেটি ধ্বংস করে দিয়েছে।

বাহরাইনের একটি বহুতল ভবনে আছড়ে পড়ছে শাহেদ-১৩৬ ড্রোন (বাঁয়ে) এবং ড্রোনের আঘাতে ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ (মাঝে); বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদরদপ্তরের রাডার ডোম ড্রোনের আঘাতে বিধ্বস্ত (ডানে)। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
বাহরাইনের একটি বহুতল ভবনে আছড়ে পড়ছে শাহেদ-১৩৬ ড্রোন (বাঁয়ে) এবং ড্রোনের আঘাতে ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ (মাঝে); বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদরদপ্তরের রাডার ডোম ড্রোনের আঘাতে বিধ্বস্ত (ডানে)। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও শাহেদ ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর (আরএএফ) একটি ঘাঁটিতেও সম্ভবত এই ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। সোমবার বিকেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, সাম্প্রতিক হামলায় তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা শত শত ড্রোনের বড় অংশ তারা ভূপাতিত করেছে। কুয়েত ও বাহরাইনও বিপুল পরিমাণে ড্রোন প্রতিহতের দাবি করেছে।

তবে ইরানের দাবি ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ড্রোন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, কিছু আকাশসীমায় পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস হয়েছে, আবার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ করা হচ্ছে না।

‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন কাজ করে যেভাবে

ফারসি ভাষার ‘শাহেদ’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘শহিদ’— নামটিই এর কার্যকারিতার ইঙ্গিত বহন করে। শাহেদ-১৩৬ মূলত এক ধরনের আত্মঘাতী (লোটারিং মিউনিশন) বা কামিকাজে ড্রোন, যা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেই বিস্ফোরিত হয়। এর নকশা করেছে ইরানের শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটি দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অধীন।

২০২২ সাল থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই ড্রোনটির ব্যবহার শুরু করলে এটি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পায়। শুরুতে ইরান থেকে রপ্তানি করা হলেও পরে এর প্রযুক্তি রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করে তেহরান। বর্তমানে রাশিয়ার ইয়েলাবুগা শহরের একটি কারখানায় বিপুল পরিমাণে শাহেদ ড্রোন উৎপাদিত হচ্ছে।

শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের আকৃতি-পাল্লা-ক্ষমতা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের আকৃতি-পাল্লা-ক্ষমতা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

ড্রোনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.৫ মিটার, ডানার বিস্তার ২.৫ মিটার। এটি ৩০ থেকে ৫০ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে সক্ষম। নিচু দিয়ে উড়ে রাডার এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে এটির। দামও তুলনামূলক কম— ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলারের মধ্যে।

কম খরচে বড় চাপ

শাহেদ-১৩৬ এর আসল শক্তি প্রযুক্তির পাশাপাশি কৌশলেও। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি সস্তা এবং তৈরি করাও সহজ। একটি ‘প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রে’র দাম ৩০ থেকে ৫০ লাখ ডলার, সেখানে কয়েক হাজার ডলারের ড্রোন দিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা ও ব্যয়বহুল করা সম্ভব। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক ড্রোন একসঙ্গে বা পর্যায়ক্রমে নিক্ষেপ করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলা— এটাই ইরানের কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রাশিয়া ইউক্রেনে হামলার সময় প্রায় ৮০০টি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ও অল্পসংখ্যক ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল। মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতেই এই ‘ঝাঁক বেঁধে’ হামলা। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সাম্প্রতিক অভিযানে বড় ‘ঝাঁক’ নয়, বরং বিচ্ছিন্ন ও লক্ষ্যভিত্তিক আঘাতের চিত্র বেশি দেখা যাচ্ছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইরান কৌশলগতভাবে নির্দিষ্ট অবকাঠামো— বিশেষ করে জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনাকে টার্গেট করছে।

অবকাঠামোই কি মূল লক্ষ্য?

ইউক্রেন যুদ্ধে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোয় শাহেদ ড্রোনের হামলা বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যেও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সোমবার সকালে সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল শোধনাগার রাস তানুরায় ড্রোন হামলায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে কর্তৃপক্ষ সেটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এই হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনটি শাহেদ-১৩৬ কি না তা নিশ্চিত নয়, তবে এর ধ্বংসক্ষমতা ছিল একই ধরনের।

সৌদি তেল শোধনাগার রাস তানুরায় ইরানের ড্রোন হামলায় অগ্নিকাণ্ড। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সৌদি তেল শোধনাগার রাস তানুরায় ইরানের ড্রোন হামলায় অগ্নিকাণ্ড। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল শোধনাগার, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা রাডার স্থাপনা ধারাবাহিকভাবে ইরানের লক্ষ্যবস্তু হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব পড়তে পারে। পারস্য উপসাগর বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্র, এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের চিত্র

শাহেদ-১৩৬ প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ড্রোন নয়। তুরস্কের বায়রাকতার বা যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত ড্রোনের তুলনায় এটি অপেক্ষাকৃত কম জটিল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সবসময় প্রযুক্তির জৌলুস শেষ কথা নয়— কৌশল, খরচ ও ধারাবাহিক চাপই নির্ধারণ করে ফলাফল।

উপসাগরীয় আকাশে এখন সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। স্বল্পমূল্যের ড্রোন দিয়ে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলা— ইরানের এই কৌশল মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করছে। প্রশ্ন একটাই: এই চাপ কতদিন টেকসই হবে, আর এর প্রতিক্রিয়ায় আঞ্চলিক শক্তিগুলো কোন নতুন পথ বেছে নেবে?

তথ্যসূত্র:

  • দ্য গার্ডিয়ান
  • ইউনাইটেড২৪ মিডিয়া
  • এল মুন্দো আমেরিকা
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের সিদ্ধান্ত বাতিল

দীর্ঘ ৩০ বছর পর মরদেহের কোনো অবশেষ পাওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার আশঙ্কায় মামলার বাদী ও সালমান শাহর পরিবার এই আবেদনটি করেছিলেন।

২৪ দিন আগে

সৌদিতে শুটিংয়ে গিয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত ব্রেকিং ব্যাডের ‘গাস ফ্রিং’

এসপোসিতোর নামাজ পড়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি মসজিদের ভেতরে প্রযোজনা দলের কয়েকজন সদস্য নামাজে অংশ নিচ্ছেন। তাদের মধ্যেও রয়েছেন ব্রেকিং ব্যাড সিরিজের এ তারকা।

২১ জুন ২০২৬

কলকাতায় হেনস্তার অভিযোগ— মোশাররফ করিম বললেন ‘তেমন কিছুই ঘটেনি’

বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিমকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হেনস্তার অভিযোগের বিষয়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন তিনি। কলকাতায় অবস্থানকালে তার সঙ্গে অপ্রীতিকর আচরণের চেষ্টা করা হয়েছে— এমন দাবিকে নাকচ করে অভিনেতা বলেছেন, বাস্তবে তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।

১৬ জুন ২০২৬

সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে তোলার অনুমতি মিলল ৩০ বছর পর

এর আগে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে তুলে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন এবং এ কাজে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য আদালতের কাছে গত ২০ মে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. জিয়াউল মোর্শেদ।

১০ জুন ২০২৬