
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

ছয় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অর্জন কম নয়। ইরানের সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দুর্বল হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিও।
তবে এত কিছুর পরও তেহরান আত্মসমর্পণ করেনি, ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে আছে এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতাও পুরোপুরি ধ্বংস করা যায়নি। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে— যে যুদ্ধের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে এসেছে ইসরায়েল, সেই যুদ্ধের সমাপ্তি কি এখন চায় তেলআবিব?
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরে দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ দিয়ে আসছিল তেলআবিব।
কিন্তু ছয় মাস পর যুদ্ধের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের মতো সরাসরি সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার বদলে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চাপ তৈরির দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে কাতারসহ কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে এবং হরমুজ খুলে দেওয়ার পথ নিয়েও আলোচনা চলছে।
অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যখন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে, তেলআবিব তখনো ইরানের সঙ্গে কোনো স্থায়ী সমঝোতার ব্যাপারে গভীরভাবে সন্দিহান।
যুদ্ধ শুরুর নেপথ্যে ইসরায়েলের হিসাব
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ইসরায়েলের অবস্থান নতুন নয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর সময় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযান ইরানের ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ দূর করার জন্য প্রয়োজনীয়। তেলআবিবের বক্তব্য ছিল, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি যেতে দেওয়া হলে পরে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নাও থাকতে পারে।
এ কারণে ইসরায়েলের কাছে যুদ্ধের লক্ষ্য শুধু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা ছিল না। আরও বড় লক্ষ্য ছিল তেহরানের সামরিক সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করা এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে ইরান ভবিষ্যতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা হারায়।
ইসরায়েলের অর্জন কতটা?
ছয় মাসের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের আঘাত। ইরানের সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দুর্বল হয়েছে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচিতেও বড় ধাক্কা এসেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ইরানের সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে এমনভাবে দুর্বল করা, যাতে তেহরান দ্রুত সেগুলো পুনর্গঠন করতে না পারে। সামরিক দিক থেকে সেই লক্ষ্য পূরণে ইসরায়েল উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।
ইসরায়েল আরও দেখাতে পেরেছে যে, ইরানের গভীরে গিয়ে দেশটির সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে ধারাবাহিক হামলা চালানোর সক্ষমতা তার রয়েছে। অর্থাৎ, তেহরানের ওপর সামরিক চাপ তৈরির ক্ষেত্রে তেলআবিব নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
তবে এখানেই অর্জনের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। দেশটি এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে, ড্রোন ব্যবহার করতে পারে এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
অর্থাৎ, ইসরায়েল ইরানকে দুর্বল করেছে, কিন্তু ইরানকে অক্ষম করে দিতে পারেনি। এ কারণেই ইসরায়েলের সামরিক সাফল্যকে চূড়ান্ত বিজয় বলা কঠিন। সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা আর ইরানকে দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের জন্য নিরাপদ করে দেওয়া— দুটি এক বিষয় নয়।
ওয়াশিংটনের হিসাব বদলেছে
যুদ্ধের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য অনেকটাই এক ছিল। ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামোয় হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস এবং তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ— দুই পক্ষই এসব চেয়েছে।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বদলেছে। মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে চাপ পড়ছে, কয়েক দশক ধরে তৈরি সামরিক মজুত দ্রুত কমেছে, যুদ্ধের ব্যয় কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং মার্কিন জনগণের মধ্যেও যুদ্ধের সমর্থন কমেছে। সর্বশেষ রয়টার্স-ইপসোস জরিপে মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সমর্থন করেছেন।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এখন প্রশ্নটি শুধু ‘ইরানকে কতটা দুর্বল করা যাবে’ নয়। প্রশ্ন হলো— এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বের হবে?
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ছয় মাস পর সংঘাতটি ব্যয়বহুল অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। সামরিক হামলার পাশাপাশি এখন ইরানের তেল রপ্তানি, অর্থনীতি ও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চাপ তৈরিই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এ কারণেই হরমুজ খুলে দেওয়া, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ বাড়ানো এবং ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে।
কিন্তু ইসরায়েলের হিসাব এখনো অনেক বেশি নিরাপত্তাকেন্দ্রিক।
জুনের সমঝোতাই প্রথম বড় ফাটল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জুনে যে অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল, সেটিই দুই মিত্রের মধ্যে মতপার্থক্যকে সবচেয়ে স্পষ্ট করে তোলে।
ওই সমঝোতায় যুদ্ধের সামরিক তীব্রতা কমে আসে এবং আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের একটি পথ তৈরির চেষ্টা হয়। কিন্তু ইসরায়েলের কাছে প্রশ্ন ছিল— ইরানের ওপর সামরিক চাপ কমিয়ে দিলে ছয় মাসের অভিযানে অর্জিত সুবিধা কি নষ্ট হবে না?
ইসরায়েল আশঙ্কা করছিল, তেহরান সময় পেলে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আবার গড়ে তুলতে পারে। এ কারণেই নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে প্রকাশ্যে সংশয় দেখাতে থাকেন।
সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক চুক্তি সম্ভব নয়। একই সময়ে তিনি ট্রাম্পকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ‘অবরোধ’ আরও শক্ত করার পরামর্শ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, ইসরায়েল এখন যুদ্ধের সামরিক পর্যায় থেকে অর্থনৈতিক চাপের পর্যায়ে যেতে রাজি হলেও চাপ কমিয়ে সমঝোতার দিকে যাওয়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহী নয়।
নেতানিয়াহু-ট্রাম্প দূরত্ব কোথায়?
এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে কৌশলগত পার্থক্যটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান চালিয়েছেন, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বারবার যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। সাম্প্রতিক সময়েও মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধের বদলে নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের পথ খুঁজছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর অবস্থান— ইরানকে দুর্বল করার সুযোগ এখন হাতছাড়া করা যাবে না।
এখানে দুই নেতার রাজনৈতিক বাস্তবতাও আলাদা। ট্রাম্পকে জবাব দিতে হচ্ছে মার্কিন ভোটারদের কাছে। যুদ্ধের ব্যয়, তেলের দাম এবং মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দীর্ঘ যুদ্ধ তার জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে।
বিপরীতে নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক হিসাব ইসরায়েলের নিরাপত্তা, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঘিরে।
ফলে ট্রাম্পের কাছে ‘যুদ্ধের সমাপ্তি’ একটি রাজনৈতিক প্রয়োজন হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু নেতানিয়াহুর কাছে ইরানের বিরুদ্ধে চাপ বজায় রাখাই নিরাপত্তার প্রয়োজন।
ইসরায়েল কি একা ইরানের বিরুদ্ধে যাবে?
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো— যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চায়, তাহলে ইসরায়েল কি সেই সমঝোতা মেনে নেবে?
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-লক্ষ্য বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানও ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ, তেলআবিব চাইছে ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় থাকুক; অন্যদিকে ওয়াশিংটনের কাছে এখন যুদ্ধের খরচ ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বড় হয়ে উঠছে।
ইসরায়েলের জন্য অবশ্য একা যুদ্ধ চালানো সহজ নয়। ছয় মাসের সংঘাতে দেশটির ওপরও সামরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।
অর্থাৎ ইসরায়েল চাইলে আবার হামলা করতে পারে— কিন্তু আরেকটি বড় যুদ্ধ শুরু করলে সেটি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
ইসরায়েল কি এই যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে?
এভাবে বলা অতিরঞ্জিত হবে। ইসরায়েল যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল, তার একটি বড় অংশ অর্জিত হয়েছে। ইরানের সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচিও বড় ধাক্কা খেয়েছে।
কিন্তু সামরিক সাফল্য আর রাজনৈতিক বিজয় এক বিষয় নয়। ইসরায়েলের মূল উদ্দেশ্য ছিল শুধু ইরানের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা নয়; তেহরানকে এমনভাবে দুর্বল করা, যাতে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি তৈরি করতে না পারে। সেই লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে বলা যাচ্ছে না।
তেহরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে, ড্রোন ব্যবহার করতে পারে, হরমুজে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে— তার রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে আছে।
এ কারণেই ইসরায়েলের ভেতরেও যুদ্ধের ফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আল-মনিটরের উদ্ধৃত জুনের এক জরিপ অনুযায়ী, ৯২ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেছেন ইরান এই সংঘাত থেকে লাভবান হয়েছে অথবা অন্তত ইরানের অবস্থানের উন্নতি হয়েছে।
আরেকটি জরিপে দেখা যায়, ৮২ দশমিক ৯ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, এই সংঘাতের পর তাদের দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দুর্বল হয়েছে। একই জরিপে প্রায় ৭২ শতাংশ নেতানিয়াহুর সামরিক অভিযানের সাফল্য নিয়ে তার দাবিতে আস্থা রাখেননি।
এটি নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার সবচেয়ে বড় বাধা?
ছয় মাসের যুদ্ধের শেষে ইসরায়েল একটি অদ্ভুত অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। যে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল, সেই দেশই এখন দেখতে পাচ্ছে— যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকে আর আগের জায়গায় রাখতে চাইছে না।
ওয়াশিংটন হরমুজ খুলতে চাইছে। কাতার ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন পক্ষ মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। ইরানও শর্তসাপেক্ষে আলোচনার দরজা খোলা রাখছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য ইরান ও ওমানের মধ্যেও একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু বলছেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা নেই এবং তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর পক্ষে তিনি।
তাই যুদ্ধের আগামী পর্যায়ে ইসরায়েলের ভূমিকা হয়তো আগের মতো ‘সামনের সারির যোদ্ধা’ হিসেবে থাকবে না। বরং সমঝোতার পথে সবচেয়ে কঠিন নিরাপত্তাগত শর্তগুলো সামনে রাখার পক্ষ হিসেবে ইসরায়েল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্যের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ওয়াশিংটন যদি যুদ্ধ শেষ করে তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চায়, কিন্তু ইসরায়েল মনে করে সেই চুক্তি ইরানকে আবার শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দেবে, তাহলে দুই মিত্রের মধ্যে চাপ বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে ইসরায়েলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধের শুরুতে তেলআবিব ছিল সংঘাতের অন্যতম চালিকাশক্তি; এখন যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগে তার অবস্থানও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো— যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষ করতে চাইলে ইসরায়েল তাতে কতটা রাজি হবে?
সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, টাইমস অব ইসরায়েল, গার্ডিয়ান, বিবিসি

ছয় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অর্জন কম নয়। ইরানের সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দুর্বল হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিও।
তবে এত কিছুর পরও তেহরান আত্মসমর্পণ করেনি, ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে আছে এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতাও পুরোপুরি ধ্বংস করা যায়নি। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে— যে যুদ্ধের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে এসেছে ইসরায়েল, সেই যুদ্ধের সমাপ্তি কি এখন চায় তেলআবিব?
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরে দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ দিয়ে আসছিল তেলআবিব।
কিন্তু ছয় মাস পর যুদ্ধের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের মতো সরাসরি সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার বদলে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চাপ তৈরির দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে কাতারসহ কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে এবং হরমুজ খুলে দেওয়ার পথ নিয়েও আলোচনা চলছে।
অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যখন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে, তেলআবিব তখনো ইরানের সঙ্গে কোনো স্থায়ী সমঝোতার ব্যাপারে গভীরভাবে সন্দিহান।
যুদ্ধ শুরুর নেপথ্যে ইসরায়েলের হিসাব
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ইসরায়েলের অবস্থান নতুন নয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর সময় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযান ইরানের ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ দূর করার জন্য প্রয়োজনীয়। তেলআবিবের বক্তব্য ছিল, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি যেতে দেওয়া হলে পরে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নাও থাকতে পারে।
এ কারণে ইসরায়েলের কাছে যুদ্ধের লক্ষ্য শুধু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা ছিল না। আরও বড় লক্ষ্য ছিল তেহরানের সামরিক সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করা এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে ইরান ভবিষ্যতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা হারায়।
ইসরায়েলের অর্জন কতটা?
ছয় মাসের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের আঘাত। ইরানের সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দুর্বল হয়েছে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচিতেও বড় ধাক্কা এসেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ইরানের সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে এমনভাবে দুর্বল করা, যাতে তেহরান দ্রুত সেগুলো পুনর্গঠন করতে না পারে। সামরিক দিক থেকে সেই লক্ষ্য পূরণে ইসরায়েল উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।
ইসরায়েল আরও দেখাতে পেরেছে যে, ইরানের গভীরে গিয়ে দেশটির সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে ধারাবাহিক হামলা চালানোর সক্ষমতা তার রয়েছে। অর্থাৎ, তেহরানের ওপর সামরিক চাপ তৈরির ক্ষেত্রে তেলআবিব নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
তবে এখানেই অর্জনের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। দেশটি এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে, ড্রোন ব্যবহার করতে পারে এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
অর্থাৎ, ইসরায়েল ইরানকে দুর্বল করেছে, কিন্তু ইরানকে অক্ষম করে দিতে পারেনি। এ কারণেই ইসরায়েলের সামরিক সাফল্যকে চূড়ান্ত বিজয় বলা কঠিন। সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা আর ইরানকে দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের জন্য নিরাপদ করে দেওয়া— দুটি এক বিষয় নয়।
ওয়াশিংটনের হিসাব বদলেছে
যুদ্ধের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য অনেকটাই এক ছিল। ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামোয় হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস এবং তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ— দুই পক্ষই এসব চেয়েছে।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বদলেছে। মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে চাপ পড়ছে, কয়েক দশক ধরে তৈরি সামরিক মজুত দ্রুত কমেছে, যুদ্ধের ব্যয় কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং মার্কিন জনগণের মধ্যেও যুদ্ধের সমর্থন কমেছে। সর্বশেষ রয়টার্স-ইপসোস জরিপে মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সমর্থন করেছেন।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এখন প্রশ্নটি শুধু ‘ইরানকে কতটা দুর্বল করা যাবে’ নয়। প্রশ্ন হলো— এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বের হবে?
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ছয় মাস পর সংঘাতটি ব্যয়বহুল অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। সামরিক হামলার পাশাপাশি এখন ইরানের তেল রপ্তানি, অর্থনীতি ও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চাপ তৈরিই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এ কারণেই হরমুজ খুলে দেওয়া, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ বাড়ানো এবং ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে।
কিন্তু ইসরায়েলের হিসাব এখনো অনেক বেশি নিরাপত্তাকেন্দ্রিক।
জুনের সমঝোতাই প্রথম বড় ফাটল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জুনে যে অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল, সেটিই দুই মিত্রের মধ্যে মতপার্থক্যকে সবচেয়ে স্পষ্ট করে তোলে।
ওই সমঝোতায় যুদ্ধের সামরিক তীব্রতা কমে আসে এবং আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের একটি পথ তৈরির চেষ্টা হয়। কিন্তু ইসরায়েলের কাছে প্রশ্ন ছিল— ইরানের ওপর সামরিক চাপ কমিয়ে দিলে ছয় মাসের অভিযানে অর্জিত সুবিধা কি নষ্ট হবে না?
ইসরায়েল আশঙ্কা করছিল, তেহরান সময় পেলে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আবার গড়ে তুলতে পারে। এ কারণেই নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে প্রকাশ্যে সংশয় দেখাতে থাকেন।
সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক চুক্তি সম্ভব নয়। একই সময়ে তিনি ট্রাম্পকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ‘অবরোধ’ আরও শক্ত করার পরামর্শ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, ইসরায়েল এখন যুদ্ধের সামরিক পর্যায় থেকে অর্থনৈতিক চাপের পর্যায়ে যেতে রাজি হলেও চাপ কমিয়ে সমঝোতার দিকে যাওয়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহী নয়।
নেতানিয়াহু-ট্রাম্প দূরত্ব কোথায়?
এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে কৌশলগত পার্থক্যটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান চালিয়েছেন, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বারবার যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। সাম্প্রতিক সময়েও মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধের বদলে নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের পথ খুঁজছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর অবস্থান— ইরানকে দুর্বল করার সুযোগ এখন হাতছাড়া করা যাবে না।
এখানে দুই নেতার রাজনৈতিক বাস্তবতাও আলাদা। ট্রাম্পকে জবাব দিতে হচ্ছে মার্কিন ভোটারদের কাছে। যুদ্ধের ব্যয়, তেলের দাম এবং মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দীর্ঘ যুদ্ধ তার জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে।
বিপরীতে নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক হিসাব ইসরায়েলের নিরাপত্তা, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঘিরে।
ফলে ট্রাম্পের কাছে ‘যুদ্ধের সমাপ্তি’ একটি রাজনৈতিক প্রয়োজন হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু নেতানিয়াহুর কাছে ইরানের বিরুদ্ধে চাপ বজায় রাখাই নিরাপত্তার প্রয়োজন।
ইসরায়েল কি একা ইরানের বিরুদ্ধে যাবে?
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো— যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চায়, তাহলে ইসরায়েল কি সেই সমঝোতা মেনে নেবে?
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-লক্ষ্য বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানও ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ, তেলআবিব চাইছে ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় থাকুক; অন্যদিকে ওয়াশিংটনের কাছে এখন যুদ্ধের খরচ ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বড় হয়ে উঠছে।
ইসরায়েলের জন্য অবশ্য একা যুদ্ধ চালানো সহজ নয়। ছয় মাসের সংঘাতে দেশটির ওপরও সামরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।
অর্থাৎ ইসরায়েল চাইলে আবার হামলা করতে পারে— কিন্তু আরেকটি বড় যুদ্ধ শুরু করলে সেটি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
ইসরায়েল কি এই যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে?
এভাবে বলা অতিরঞ্জিত হবে। ইসরায়েল যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল, তার একটি বড় অংশ অর্জিত হয়েছে। ইরানের সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচিও বড় ধাক্কা খেয়েছে।
কিন্তু সামরিক সাফল্য আর রাজনৈতিক বিজয় এক বিষয় নয়। ইসরায়েলের মূল উদ্দেশ্য ছিল শুধু ইরানের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা নয়; তেহরানকে এমনভাবে দুর্বল করা, যাতে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি তৈরি করতে না পারে। সেই লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে বলা যাচ্ছে না।
তেহরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে, ড্রোন ব্যবহার করতে পারে, হরমুজে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে— তার রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে আছে।
এ কারণেই ইসরায়েলের ভেতরেও যুদ্ধের ফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আল-মনিটরের উদ্ধৃত জুনের এক জরিপ অনুযায়ী, ৯২ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেছেন ইরান এই সংঘাত থেকে লাভবান হয়েছে অথবা অন্তত ইরানের অবস্থানের উন্নতি হয়েছে।
আরেকটি জরিপে দেখা যায়, ৮২ দশমিক ৯ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, এই সংঘাতের পর তাদের দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দুর্বল হয়েছে। একই জরিপে প্রায় ৭২ শতাংশ নেতানিয়াহুর সামরিক অভিযানের সাফল্য নিয়ে তার দাবিতে আস্থা রাখেননি।
এটি নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার সবচেয়ে বড় বাধা?
ছয় মাসের যুদ্ধের শেষে ইসরায়েল একটি অদ্ভুত অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। যে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল, সেই দেশই এখন দেখতে পাচ্ছে— যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকে আর আগের জায়গায় রাখতে চাইছে না।
ওয়াশিংটন হরমুজ খুলতে চাইছে। কাতার ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন পক্ষ মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। ইরানও শর্তসাপেক্ষে আলোচনার দরজা খোলা রাখছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য ইরান ও ওমানের মধ্যেও একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু বলছেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা নেই এবং তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর পক্ষে তিনি।
তাই যুদ্ধের আগামী পর্যায়ে ইসরায়েলের ভূমিকা হয়তো আগের মতো ‘সামনের সারির যোদ্ধা’ হিসেবে থাকবে না। বরং সমঝোতার পথে সবচেয়ে কঠিন নিরাপত্তাগত শর্তগুলো সামনে রাখার পক্ষ হিসেবে ইসরায়েল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্যের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ওয়াশিংটন যদি যুদ্ধ শেষ করে তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চায়, কিন্তু ইসরায়েল মনে করে সেই চুক্তি ইরানকে আবার শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দেবে, তাহলে দুই মিত্রের মধ্যে চাপ বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে ইসরায়েলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধের শুরুতে তেলআবিব ছিল সংঘাতের অন্যতম চালিকাশক্তি; এখন যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগে তার অবস্থানও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো— যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষ করতে চাইলে ইসরায়েল তাতে কতটা রাজি হবে?
সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, টাইমস অব ইসরায়েল, গার্ডিয়ান, বিবিসি

সম্প্রতি পেংঘু দ্বীপপুঞ্জে ভোরের আলো ফোটার আগেই এক যুদ্ধ মহড়ার আয়োজন করে তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী। সবুজ প্লাস্টিক ক্যানিস্টার থেকে ১০৫ মিলিমিটারের গোলা বের করে ৪টি ট্যাংকে লোড করেন সেনাসদস্যরা। বেইজিংয়ের হামলা প্রতিহত করতে এই দ্বীপপুঞ্জে বর্তমানে হাজার হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছেন, যারা যুদ্ধের সম্
১১ ঘণ্টা আগে
কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধের মধ্যেই উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ হ্রদ লেক অন্টারিওর নাম বদলে ‘লেক আমেরিকা’ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
১৩ ঘণ্টা আগে
শুক্রবার ভোরে নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১৫ ঘণ্টা আগে
ইরান আত্মসমর্পণ করেনি। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখনো মারাত্মকভাবে ব্যাহত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষতি করলেও তেহরানের সরকারকে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে পারেনি।
২০ ঘণ্টা আগে