হরমুজ ঘিরে অচলাবস্থা নিরসনে ৪০ দেশের জোট, নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। প্রতীকী ছবি

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট অচলাবস্থা কাটাতে ৪০ দেশের একটি জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটি বলছে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ পথ পুনরায় চালু করতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পথ খোঁজাই এখন মূল লক্ষ্য।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলো ‘সব ধরনের কার্যকর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ’ পর্যালোচনা করবে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর জের ধরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। এরপরও চলাচল করতে গিয়ে কিছু জাহাজ হামলারও শিকার হয়। এ নৌ রুটে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়, যা ইরান যুদ্ধের পর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে, দেশে দেশে জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

নানা ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতার পর চীন, ভারত, বাংলাদেশসহ হাতেগোনা কয়েকটি দেশের পতাকাবাহী জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দিয়েছে ইরান। তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদেশের জন্য এই নৌ পথ বন্ধই থাকবে।

এদিকে গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আরোপিত অবরোধে পারস্য উপসাগরে অন্তত দুই হাজার ১৯০টি বাণিজ্যিক জাহাজ ও এতে থাকা প্রায় ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়েছেন। এসব বাণিজ্যিক জাহাজের মধ্যে ৩২০টিরও বেশি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার রয়েছে। এর মধ্যে আবার ১২টি বৃহৎ গ্যাসবাহী জাহাজ ও ৫০টি অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ফের চালু করতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রতি নানা ধরনের হুমকি দিয়ে আসছেন শুরু থেকেই। তবে তাতে কোনো কাজ হয়নি। একপর্যায়ে ট্রাম্প তার মিত্রদেশগুলোর সহায়তা চান, তাদের হরমুজ প্রণালিতে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানান। এমনকি চীনের সহায়তাও চান। তবে ট্রাম্পের এ আহ্বানে সাড়া মেলেনি। এসব বিষয়ে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করে ট্রাম্প সামরিক জোট ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকিও দেন।

এর মধ্যেই ইউরোপীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালুর উদ্যোগ নেয়। এর আগে ছয়টি দেশ যৌথ বিবৃতি দিয়েও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানায়। এবার ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের আহ্বান নাকচ করে দেওয়া যুক্তরাজ্য ৪০টি দেশকে নিয়ে এ সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ নিয়েছে।

আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ৪০ দেশের জোট গঠনের এ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নিচ্ছে না। অন্যদিকে বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে— যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরও অনেকে। তারা যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে প্রণালি অবরোধের চেষ্টা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে অংশ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

এই বৈঠককে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে ‘কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক’ করে বিস্তারিত কৌশল নির্ধারণ করা হবে।

লন্ডন থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক ররি চ্যাল্যান্ডস বলেন, এটি একটি বিস্তৃত জোট, যা কেবল পশ্চিমা বা ন্যাটোকেন্দ্রিক নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য-আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে এ দেশগুলো প্রকৃতপক্ষে কতটা সামরিক ও নৌ সক্ষমতা দিতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বলপ্রয়োগে অনীহা, কূটনীতিই প্রধান ভরসা

যুদ্ধ চলমান থাকায় কোনো দেশই বলপ্রয়োগ করে প্রণালি খুলে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়। ইরানের কাছে অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, দ্রুতগতির নৌ যান ও মাইন থাকার কারণে এমন পদক্ষেপ বড় ধরনের সংঘাত ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

স্টারমার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য এ যুদ্ধে জড়াতে চায় না। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎসও বলেছেন একই কথা। ফ্রান্সসহ ইউরোপের অন্য দেশগুলোও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ট্রাম্প তাদের কারও সঙ্গে আলোচনা করে যুদ্ধ শুরু করেননি। ফলে এ যুদ্ধ তাদের নয়।

তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কীভাবে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সামরিক পরিকল্পনাবিদরা শিগগিরই বৈঠকে বসবেন। স্টারমারের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ— দুইয়ের সমন্বয় দরকার হবে, সঙ্গে থাকতে হবে বাণিজ্যিক শিপিং খাতের সহযোগিতা।

এ জোট গঠনকে ইউরোপের পক্ষ থেকে নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও সক্রিয় হওয়ার বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে যখন ওয়াশিংটন ন্যাটো থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ স্পষ্টই বলেছেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে প্রণালি খুলে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তার মতে, এতে দীর্ঘ সময় লাগবে এবং জাহাজগুলো ইরানের উপকূলীয় হামলার ঝুঁকিতে পড়বে। বরং সরাসরি ইরানের সঙ্গে আলোচনাই সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে বলে মত দিয়েছেন তিনি।

এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে অন্তত ২৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। শিপিং ডেটা প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, এসব হামলায় অন্তত ১১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।

হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে গঠিত ৪০ দেশের জোট কূটনৈতিক সমাধানকে সামনে রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে যুদ্ধ চলতে থাকলে এবং ইরান তার অবস্থান না বদলালে, এই সংকট দ্রুত কাটবে— এমন সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।

তথ্যসূত্র: আলজাজিরা, বিবিসি, ওয়াশিংটন পোস্ট, গালফ নিউজ

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার পরও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত

লেবাননে ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা না পেরোতেই সেখানে নতুন করে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট নিরসনের যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, তা শুরুর দিকেই বড় এক পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

৮ ঘণ্টা আগে

অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবার বার্ড ফ্লুর ‘এইচ৫এন১’ স্ট্রেইন শনাক্ত

অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মতো বার্ড ফ্লুর মারাত্মক ‘এইচ৫এন১’ (H5N1) স্ট্রেইন শনাক্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে অত্যন্ত সংক্রামক এই ভ্যারিয়েন্টটি এখন পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশেই পৌঁছে গেল। এর আগে অস্ট্রেলিয়াই ছিল একমাত্র মহাদেশ, যেখানে বার্ড ফ্লুর এই স্ট্রেইনটি খুঁজে

৯ ঘণ্টা আগে

৫১ অভিবাসন প্রত্যাশী নিয়ে লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবি, ১১ লাশ উদ্ধার

ইউরোপে উদ্দেশে রওনা হওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীদের একটি নৌকা গত সপ্তাহে লিবিয়া উপকূলে ডুবে গিয়ে অন্তত ৫১ জন নিখোঁজ হয়েছেন বলে জানিয়েছে পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘আবরিন’। এ দুর্ঘটনায় গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা এবং নিখোঁজদের মধ্যে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, বাকিদের হদিস মেলেনি।

১০ ঘণ্টা আগে

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বড় সুবিধা পাবে আইআরজিসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য

যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দৃষ্টিতে যাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটিতে পরিণত হতে পারে।

১২ ঘণ্টা আগে