মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বড় সুবিধা পাবে আইআরজিসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আইআরজিসির কয়েকজন কমান্ডার তেহরানে ‘পাওয়ার’ সামরিক মহড়ার ফাঁকে বেসিজ ইউনিট পরিদর্শন করছেন। ফাইল ছবি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে যে শান্তি চুক্তির রূপরেখা তৈরি হচ্ছে, তার ভেতরে একটি গভীর বৈপরীত্য (প্যারাডক্স) লুকিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দৃষ্টিতে যাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটিতে পরিণত হতে পারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার ছায়ায় থেকেও আইআরজিসি ধীরে ধীরে ইরানের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। তেল ও নির্মাণ খাত থেকে শুরু করে শিপিং, টেলিযোগাযোগ এবং বন্দর ব্যবস্থাপনা— সবখানেই বিস্তৃত একটি বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে তারা।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাড়বে লাভের সুযোগ

এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি চুক্তির দিকে এগোচ্ছে, যা ইরানের জন্য শত শত কোটি ডলারের আর্থিক প্রবাহের দরজা খুলে দিতে পারে এবং দেশটির অর্থনীতিকে পুনরায় বৈশ্বিক বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে আইআরজিসিই।

ইরানের চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানির পুনরুদ্ধার এবং বিদেশি বিনিয়োগ থেকে আসা বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধার বড় অংশই কার্যত আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণাধীন নেটওয়ার্কে প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছেন, অর্থনীতিতে আইআরজিসির এই গভীর প্রভাবই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে। কারণ ইরানি ব্যবসার কাঠামোর সঙ্গে বাহিনীটি এতটাই গভীরভাবে যুক্ত যে, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকা অবস্থায় নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা আইনি ও কূটনৈতিকভাবে জটিল হয়ে উঠতে পারে।

আইআরজিসির বিস্তৃত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক

ইরানের প্রয়াত বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি প্রতিষ্ঠিত এই বাহিনী পরবর্তীতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনামলে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি দেশের ভেতরে ভিন্নমত দমনেও তাদের ভূমিকা রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা রাষ্ট্রের ভেতরে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের শুরুর দিকেই আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর থেকেই আইআরজিসি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা আরও সুসংহত করে এবং খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। এখন তারা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচ্য চুক্তির প্রতিও সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে।

একজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘আইআরজিসি এখন এই সংঘাতের প্রকৃত বিজয়ী।’ তার মতে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো টিকে থাকার পর এখন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে এই বাহিনী, কারণ গত কয়েক দশকে নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার প্রায় সব বড় নেটওয়ার্কই তারা পরিচালনা করেছে।

চুক্তি ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা

গত সপ্তাহে ঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হলে অন্যান্য সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হতে পারে এবং ইরান ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আইআরজিসি তাদের কোনো আর্থিক হিসাব প্রকাশ না করলেও এই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার তাদের বিশাল বাণিজ্যিক ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। বর্তমানে তেল, শিপিং, নির্মাণ এবং অবকাঠামো খাতে তাদের শত শত কোটি ডলারের নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, খাতাম আল-আনবিয়া নামে আইআরজিসির ইঞ্জিনিয়ারিং শাখা দেশের প্রধান অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত শত শত অনুমোদিত কোম্পানি পরিচালনা করে। পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ, গাড়ি নির্মাণ, পর্যটন এবং লজিস্টিকস খাতেও তাদের প্রভাব বিস্তৃত।

বিদেশি বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা

ইরানের বিনিয়োগ আইন অনুযায়ী, বিদেশি কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় অংশীদারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হয়। ফলে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এতটাই বিস্তৃত যে, বড় বিনিয়োগে প্রবেশ করতে চাওয়া বিদেশি কোম্পানির জন্য তারা প্রায় অপরিহার্য গেটকিপারে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে রয়টার্স বলছে, এই বাস্তবতায় পশ্চিমা কোম্পানিগুলো ইরানে ফিরলেও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আইআরজিসি-সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে বাধ্য হতে পারে, যা তাদের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বাড়াবে।

সাবেক মার্কিন ট্রেজারি কর্মকর্তার পাশাপাশি বর্তমানে ‘হিউজ হাবল অ্যান্ড রিড’-এর অংশীদার জেরেমি প্যানার বলেন, ‘আইআরজিসি তেল খাতের নেপথ্যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, তাই তাদের উপস্থিতি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও আইআরজিসির উপস্থিতির কারণে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য আইনি ঝুঁকি থেকেই যাবে।

২০১৬ সালে পাস হওয়া মার্কিন ‘জাস্টিস এগেইনস্ট স্পন্সরস অব টেররিজম অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, সন্ত্রাসী হামলার শিকার ব্যক্তিরা আইআরজিসির মতো গোষ্ঠীকে সহায়তার অভিযোগে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন।

নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

ইরানি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানান, বৃহত্তর কোনো চুক্তি না হলেও অন্তর্বর্তীকালীন তেল রপ্তানি ছাড় থেকেও আইআরজিসি লাভবান হবে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাদের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সহায়তা করবে।

২০০০-এর দশকের শুরুতে পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সময়েই আইআরজিসি তাদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করে। তখন তারা ফ্রন্ট কোম্পানি ও মধ্যস্থতাকারী ব্যবহার করে তেল রপ্তানি, শিপিং ও বাণিজ্য চালু রাখে।

তবে ২০১৮ সালে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি সেই মডেলকে বড় ধরনের চাপে ফেলে দেয়। ট্রাম্প প্রশাসন তার বর্তমান মেয়াদেও নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়িয়েছে।

একজন ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, এসব পদক্ষেপ নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পথ সংকুচিত করে দেয় এবং এসব নেটওয়ার্ক পরিচালনার খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তোলে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইএসি সদস্যদের সরালেন ট্রাম্প, বাড়ছে উদ্বেগ

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে—ওই ই-মেইলে বলা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, ইলেকশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিশনের কমিশনার হিসেবে আপনার দায়িত্ব অবিলম্বে কার্যকরভাবে শেষ করা হলো।’

৮ ঘণ্টা আগে

মার্কিন হামলার জবাব ইরানের, ফের উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দিনের হামলার জবাব হিসেবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব দেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের ভূখণ্ড ইরানে হামলার জন্য ব্যবহার করা হয়নি।

৮ ঘণ্টা আগে

মাশহাদে চিরনিদ্রায় শায়িত আলি খামেনি, বিদায় জানাতে লাখো মানুষের ঢল

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) মাশহাদের দিকে এগিয়ে যায় খামেনির মরদেহবাহী ট্রাক। রাস্তার দুই পাশে কালো পোশাক পরা লাখো শোকাহত মানুষ ইরানের পতাকা, খামেনির ছবি ও বিপ্লবী স্লোগান লেখা লাল প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ধীরগতিতে এগিয়ে চলা শবযাত্রার সময় পুরো শহরে শোক, ধর্মীয় আবেগ ও প্রতিশোধের আহ্বানের মিশ্র পরিবেশ

১৭ ঘণ্টা আগে

আমিরাতে বিগ টিকেট লটারিতে ১০ লাখ দিরহাম জিতলেন বাংলাদেশি আতিক

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এ খবর দিয়েছে গালফ নিউজ। খবরে বলা হয়েছে, বিগ টিকেট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিজয়ী বাংলাদেশি মোহাম্মদ আতিক হাসানের টিকিট নম্বর ছিল ৩৫৯৬৮৫। তবে তিনি কত দিন ধরে এই ড্রতে অংশ নিচ্ছিলেন বা পুরস্কারের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

১৯ ঘণ্টা আগে