কঙ্গো ও উগান্ডায় ইবোলা প্রাদুর্ভাব: বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা ডব্লিউএইচওর

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কিভু প্রদেশের বুটেম্বো ও গোমা শহরের মধ্যবর্তী সড়কে স্থাপিত একটি ইবোলা স্ক্রিনিং স্টেশনে হাত ধুয়ে নিচ্ছেন এক মোটরসাইকেল চালক। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো) ও প্রতিবেশী উগান্ডায় প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের মারাত্মক প্রাদুর্ভাবকে কেন্দ্র করে বিশ্ব জুড়ে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক জরুরি অবস্থা (পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্ন) ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে অন্তত ৮০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর এই ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি।

সোমবার (১৮ মে) বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ইবোলার বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি মূলত ‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibugyo) নামক ভাইরাসের কারণে ঘটছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, কঙ্গোর সাথে স্থল সীমান্ত থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোতে এই রোগটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।

সংস্থাটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৪৬ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে এবং এর মধ্যে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনও বৈশ্বিক মহামারি (প্যানডেমিক) ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

ভ্যাকসিনহীন ‘বুন্দিবুগিও’ স্ট্রেন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ইবোলার বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি মূলত ইবোলা ভাইরাসের ‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibugyo) নামক স্ট্রেনের কারণে ঘটছে। এই নির্দিষ্ট স্ট্রেনের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো অনুমোদিত ওষুধ বা প্রতিষেধক (ভ্যাকসিন) এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি।

চিকিৎসকেরা জানান, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে— জ্বর, পেশিতে ব্যথা, দুর্বলতা, মাথাব্যথা এবং গলা ব্যথা। পরবর্তীতে আক্রান্ত রোগীর বমি, ডায়রিয়া, চামড়ায় ফুসকুড়ি এবং রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে।

বর্তমানে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় আটজন রোগীর শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়া এবং স্বর্ণখনির শহর হিসেবে পরিচিত মংওয়ালু ও রাম্পারাসহ তিনটি স্বাস্থ্য জোনে আরও বহু মানুষ সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। এমনকি দেশটির রাজধানী কিনশাসাতেও একজনের শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে, যিনি সম্প্রতি ইতুরি প্রদেশ থেকে ফিরেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উগান্ডায়ও আতঙ্ক, যুক্তরাষ্ট্রে সতর্কতা

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সীমানা ছাড়িয়ে ইবোলা ইতোমধ্যে প্রতিবেশী উগান্ডায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দুজনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। উগান্ডার সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি মারা গেছেন, যার নমুনায় ইবোলা পজিটিভ আসে। মৃত ব্যক্তি কঙ্গোর নাগরিক ছিলেন এবং তার মরদেহ ইতোমধ্যে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় শহর গোমা— যা বর্তমানে এম২৩ (M23) বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে— সেখানেও ল্যাব টেস্টে একজনের ইবোলা শনাক্ত হয়েছে।

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কঙ্গোতে অন্তত ছয়জন মার্কিন নাগরিক ইবোলা রোগীর সংস্পর্শে এসেছেন। তাদের মধ্যে একজনের শরীরে প্রাথমিক উপসর্গ দেখা গেলেও এখনও নিশ্চিতভাবে কেউ আক্রান্ত হননি। আক্রান্তদের জার্মানির একটি সামরিক ঘাঁটিতে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে মার্কিন সরকার। কঙ্গো ও উগান্ডায় অতিরিক্ত কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)। কঙ্গোতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এক সতর্কবার্তায় তাদের নাগরিকদের ইতুরি প্রদেশে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে।

ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অস্থিতিশীলতা ও খনি অঞ্চল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মানবিক সংকট, মানুষের ব্যাপক স্থানান্তর, ঘনবসতিপূর্ণ শহর এবং অনিবন্ধিত চিকিৎসা কেন্দ্রের আধিক্যের কারণে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও যাতায়াতের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে রুয়ান্ডা ইতোমধ্যে কঙ্গো সীমান্তের প্রবেশপথগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কড়া করেছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তাদের মেডিকেল টিমগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

২০১৮ সালের জুনে কঙ্গোর ইকুয়েটর প্রদেশের রাজধানী এমবান্দাকায় একদল শিশুর উদ্দেশ্যে ইবোলা থেকে বাঁচতে সচেতনতামূলক বক্তব্য রাখছেন ইউনিসেফের স্বেচ্ছাসেবীরা। ছবি: সংগৃহীত
২০১৮ সালের জুনে কঙ্গোর ইকুয়েটর প্রদেশের রাজধানী এমবান্দাকায় একদল শিশুর উদ্দেশ্যে ইবোলা থেকে বাঁচতে সচেতনতামূলক বক্তব্য রাখছেন ইউনিসেফের স্বেচ্ছাসেবীরা। ছবি: সংগৃহীত

ডব্লিউএইচও কঙ্গো ও উগান্ডাকে জরুরি অপারেশন সেন্টার স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে। সংক্রমণ ঠেকাতে আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পরপর দুটি টেস্টে নেগেটিভ না আসা পর্যন্ত তাদের ছাড়পত্র না দিতে বলা হয়েছে। তবে আক্রান্ত অঞ্চলের বাইরের দেশগুলোকে সীমান্ত বন্ধ বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডব্লিউএইচও বলেছে, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ সাধারণত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়া কেবল আতঙ্কের বশে নেওয়া হয়।’

সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস ঘেব্রেয়েসাস উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এবং ভৌগোলিক বিস্তৃতির সঠিক চিত্র নিয়ে বর্তমানে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।’

এক নজরে ইবোলা: উৎস ও লক্ষণ

  • ইবোলা কী: এটি ভাইরাসজনিত একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী রোগ। ইবোলা ভাইরাসের তিনটি প্রধান প্রজাতির মধ্যে বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি ‘বুন্দিবুগিও’ স্ট্রেনের কারণে হচ্ছে।
  • সংক্রমণের মাধ্যম: আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থ (যেমন- রক্ত, বমি বা লালা) সংস্পর্শে এলে এটি অন্য মানুষের শরীরে ছড়ায়।
  • মৃত্যুর হার: বুন্দিবুগিও স্ট্রেনে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে সামগ্রিকভাবে ইবোলায় গড় মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ।
  • লক্ষণ প্রকাশের সময়: ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়।
  • প্রাথমিক ও চূড়ান্ত লক্ষণ: শুরুতে হঠাৎ তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা ও অবসাদ দেখা দেয়। পরবর্তীতে বমি ও ডায়রিয়া শুরু হয় এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ হয়।
  • উৎস: সাধারণত বাদুড় বা সংক্রমিত বন্য পশুর মাংসের মাধ্যমে এই ভাইরাস প্রথম মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ১৯৭৬ সালে কঙ্গোতেই প্রথম এই ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়েছিল। এটি দেশটিতে ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব।

২০১৯ সালের ৮ অক্টোবর পূর্ব কঙ্গোর বেনি শহরে ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধার বাড়িতে প্রবেশ করার পর, তাঁর এক সহকর্মীকে জীবাণুমুক্ত করছেন স্বাস্থ্যকর্মী কাভোতা মুগিশা রবার্ট। ছবি: সংগৃহীত
২০১৯ সালের ৮ অক্টোবর পূর্ব কঙ্গোর বেনি শহরে ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধার বাড়িতে প্রবেশ করার পর, তাঁর এক সহকর্মীকে জীবাণুমুক্ত করছেন স্বাস্থ্যকর্মী কাভোতা মুগিশা রবার্ট। ছবি: সংগৃহীত

আফ্রিকা সিডিসির নির্বাহী পরিচালক ড. জঁ কাসেয়া বলেন, ‘আক্রান্ত অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত এবং খনি অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে আঞ্চলিক সমন্বয় এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।’ গত ৫০ বছরে আফ্রিকায় ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কঙ্গোতে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ, যেখানে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষ প্রাণ হারান।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে স্পেনের বনাঞ্চলে আগুন: পুড়ছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বাড়ছে প্রাণহানি

বর্তমানে স্পেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দাবানল আরও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে জলকামানসহ শত শত দমকলকর্মী দিনরাত কাজ করছেন।

৬ ঘণ্টা আগে

চীনে জুতা কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, নিহত ২৮

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নেমে প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, কারখানার নিচতলায় যেখানে দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ করা হতো, সেখান থেকেই মূলত আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ঘটনা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী কারখানার মালিকপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে আইন-শৃঙ্খলা

৮ ঘণ্টা আগে

বেরোনোর পথ কঠিন, বিরতি টিকিয়ে রাখাও চ্যালেঞ্জিং— ইরান যুদ্ধে উভয় সংকটে ট্রাম্প

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প বলেছেন, অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যত ‘শেষ’। তার এ অবস্থান এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। এর আগে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলা

১০ ঘণ্টা আগে

স্পেনে ভয়াবহ দাবানলে ১২ জনের মৃত্যু

আঞ্চলিক সরকার জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের আলমেরিয়া প্রদেশের লস গাইয়ারদোস এলাকায় এ দাবানলের সূত্রপাত হয়। নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

১১ ঘণ্টা আগে