বিবিসির বিশ্লেষণ

বদলে দিতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী সংকট বয়ে আনলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে বিজয় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেবে। অঞ্চলটি সত্যিই বদলাচ্ছে। তবে তাদের কল্পনা অনুযায়ী নয়।

ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র পরাজিত হয়নি। বরং যুদ্ধ ১০০ দিনে পৌঁছানোর পর এখন সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হয়ে উঠেছে একটি দীর্ঘস্থায়ী, ক্ষয়িষ্ণু ও অনির্দিষ্ট সংকট— যেখানে মাঝেমধ্যে যুদ্ধবিরতি থাকবে, আবার হঠাৎ করেই সংঘাত নতুন করে জ্বলে উঠবে।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, তেহরানের শাসকগোষ্ঠী তাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

সম্প্রতি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনা সেই বাস্তবতার নতুন স্মারক। এটি দেখিয়েছে, ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাত করার সক্ষমতা রাখে এবং যুদ্ধ থেকে বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে আসার সংকল্পও হারায়নি।

তেহরানের দৃষ্টিতে বিজয়ের অর্থ শুধু টিকে থাকা নয়, বরং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় এবং ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকাতে কার্যকর প্রতিরোধ সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা।

যুদ্ধ শুরু করা সহজ, শেষ করা কঠিন

হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় ওয়াশিংটন এরই মধ্যে জবাব দিয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— এমন প্রতিক্রিয়া দেখানো, যেন শক্ত অবস্থানের বার্তা যায়, আবার স্থবির হয়ে পড়া কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটিও পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে।

অ্যাপাচির ক্রুরা বেঁচে গেছেন। তারা নিহত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ দিকে যেতে পারত।

ট্রাম্প এখনো এমন একটি চুক্তির আশায় আছেন, যা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পথ তৈরি করবে।

কারণ যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে জনপ্রিয় নয়। ট্রাম্প এমন একটি পথ খুঁজছেন, যেটিকে তিনি রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। কিন্তু সেটি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

ইতিহাসের পুরোনো একটি শিক্ষা এখন আবার সামনে এসেছে— যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, স্পষ্ট বিজয় নিয়ে তা শেষ করা তত কঠিন।

ফেব্রুয়ারির আত্মবিশ্বাস, জুনের বাস্তবতা

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন দুই নেতার বক্তব্যেই ছিল এক ধরনের ঐতিহাসিক আত্মবিশ্বাস। ট্রাম্প তখন মনে করছিলেন, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো রিসোর্ট থেকে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। আমরা কাজ শেষ করলে নিজেদের সরকার নিজেদের হাতে তুলে নাও।’

পরদিন তেল আবিবে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহুও প্রায় একই সুরে কথা বলেন।

চার দশক ধরে ইরানকে প্রধান হুমকি হিসেবে দেখে আসা নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছিলেন, এবার সেই ‘সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে’ চূড়ান্ত আঘাত করা হবে।

দুই নেতার বক্তব্যেই একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল— তারা বিশ্বাস করতেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পতনের দ্বারপ্রান্তে।

কোথায় ভুল করেছিলেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু?

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর কাছে পরিস্থিতি অনুকূল বলেই মনে হয়েছিল। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। হামাস ও হিজবুল্লাহ বড় ধরনের সামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনও তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে দুর্বল করেছিল।

এমন অবস্থায় তারা ধরে নিয়েছিলেন, সর্বোচ্চ নেতা ও শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে হত্যা করলেই পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের স্থিতিস্থাপকতা, নির্মমতা ও কৌশলগত প্রস্তুতিকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন।

প্রায় পাঁচ দশক ধরে বহিরাগত হুমকির মুখে থাকা ইরান তার নিরাপত্তা কাঠামো এমনভাবে গড়ে তুলেছে, যেন নেতৃত্বে আঘাত এলেও রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে। ফলে ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল আসেনি।

হরমুজ: ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র

যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সাফল্য সম্ভবত হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেই পেয়েছে তেহরান। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ পথ বন্ধ করে দিয়ে ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, চাইলে তারা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।

তেহরানের নতুন নেতৃত্ব মনে করে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলকে হামলার আগে বহুবার ভাবতে বাধ্য করার জন্য এই সক্ষমতাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা। তাদের বিশ্বাস, কেবল কূটনৈতিক ভাষা নয়, প্রতিপক্ষকে ব্যথা অনুভব করানোর মতো সক্ষমতাই ভবিষ্যৎ আক্রমণ ঠেকাতে পারে।

লেবাননকে সামনে এনে নতুন সমীকরণ

ইরানের কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো লেবানন ও উপসাগরীয় যুদ্ধক্ষেত্রকে একসূত্রে বেঁধে দেওয়া। তেহরানের বার্তা স্পষ্ট— ইসরাইল যদি লেবাননে হামলা চালাতে থাকে এবং হিজবুল্লাহকে ধ্বংসের চেষ্টা অব্যাহত রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বড় চুক্তির আশা করা যাবে না।

সম্প্রতি বৈরুতে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা থেকে নেতানিয়াহুকে সরে আসতে বলেছিলেন ট্রাম্প। এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে তিনি স্বীকার করেছেন, লেবাননের পরিস্থিতি এবং উপসাগরীয় সংকট পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে নেতানিয়াহু এই অবস্থান মানতে নারাজ। তার মতে, দুই সংকটকে একসঙ্গে দেখাটা ‘অসহনীয় ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং নেতানিয়াহুর সামরিক লক্ষ্য এখন আর পুরোপুরি এক নয়।

উপসাগরীয় মিত্রদেরও বড় ক্ষতি

এই সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ আরব মিত্ররাও। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা বাহরাইনের মতো দেশগুলো গত দুই দশক ধরে নিজেদের স্থিতিশীল ব্যবসা ও বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু যুদ্ধ সেই ভাবমূর্তিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।

শুধু জ্বালানি রপ্তানি নয়, পর্যটন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

সামনে কি অনন্ত সংকট?

মার্চে যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়, তখন ধারণা করা হয়েছিল জুনের মধ্যে হয়তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু জুন এসেও প্রণালিটি পুরোপুরি খোলেনি।

বরং বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতি ছাড়া এটি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে— এমন কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ফলে কে জিতল বা কে হারল— ১০০ দিনে এসে তা আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়। বরং এই সংকট কতদিন টেনে বেড়াতে হবে, সে প্রশ্নই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেটেলারদের হামলা, ২ মসজিদে আগুন

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা হামলা চালিয়ে দুটি মসজিদে আগুন দিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদসহ গ্রামের ভবনগুলোর দেয়ালে হিব্রু ভাষায় বিভিন্ন স্লোগানও লিখেছেন তারা। রোববার ভোরে এসব হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা।

১৫ ঘণ্টা আগে

ইরানে মার্কিন হামলায় বিরতি, তবু যুদ্ধ ছড়াচ্ছে লোহিত-কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত

হামলায় বিরতির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প সব সময়ই স্পষ্ট করে বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানই তার প্রথম পছন্দ। তবে ইরান যদি আন্তরিকভাবে আলোচনার টেবিলে না আসে, তাহলে কী ঘটতে পারে, সেটিও তিনি তাদের দেখিয়ে দিয়েছেন।

১৬ ঘণ্টা আগে

বার্লিনে প্রাইড উৎসবে গাড়ি উঠিয়ে দেওয়ার ঘটনায় নিহত ১, আহত ১৭

শনিবার স্থানীয় সময় রাত ১০টার দিকে ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটসংলগ্ন টিয়ারগার্টেন পার্ক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

২১ ঘণ্টা আগে

দেশের স্বার্থে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য বিরোধিতা করব: বার্নহ্যাম

ইরানকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজের কাছে যেটি সঠিক মনে হবে, সেটিই তিনি প্রকাশ করবেন। ব্রিটেনের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিরুদ্ধেও কথা বলতে তাঁর দ্বিধা থাকবে না।

১ দিন আগে