ইসরায়েলের সঙ্গে ‘গোপন যোগাযোগ’, গৃহবন্দি সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ!

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, ইরানে হামলার পর সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে তাকেই ক্ষমতা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল ইসরায়েল। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখা গৃহবন্দি করেছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সংবাদপত্র দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

চারজন ইরানি কর্মকর্তার বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কথিত সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় ফেরানোর চেষ্টা হয়েছিল। তবে সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬৯ বছর বয়সী আহমাদিনেজাদকে ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা ইউনিট হেফাজতে নিয়েছে। অভিযোগ, তিনি মোসাদ পরিচালিত একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র (সেইফ হাউজ) থেকে বেরিয়ে আসার পর তাকে আটক করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম প্রহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আহমাদিনেজাদের তেহরানের বাসভবন লক্ষ্যবস্তু হয়। ওই হামলার পর থেকেই তিনি জনসমক্ষে আর দেখা দেননি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তার বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, হামলার পর তাকে একটি মোসাদ-পরিচালিত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এরপর গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে দেখা যায় তাকে। সে সময় তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় নিরাপত্তারক্ষীদের ঘিরে উপস্থিত ছিলেন তিনি।

গত সপ্তাহে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় অংশ নেন আহমেদিনেজাদ। ছবি: সংগৃহীত
গত সপ্তাহে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় অংশ নেন আহমেদিনেজাদ। ছবি: সংগৃহীত

সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনায় আহমাদিনেজাদ?

এর আগে মে মাসে নিউইয়র্ক টাইমসই প্রথম দাবি করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় ফেরানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন আহমাদিনেজাদের বাড়িতে চালানো হামলার উদ্দেশ্য তাকে হত্যা নয়, বরং গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করা ছিল। হামলায় তিনি আহত হলেও পরে ওই পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়ান এবং সহযোগিতা বন্ধ করে দেন বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানানো হয়।

এ দাবি ঘিরে অবশ্য ব্যাপক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ইরান ও ইসরায়েলবিষয়ক কয়েকজন বিশ্লেষক এ পরিকল্পার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের কট্টর ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের কারণে আহমাদিনেজাদকে ইসরায়েলের সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে দেখা কঠিন।

২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি হলোকাস্ট অস্বীকার, ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদারের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচিত হন। তবে ক্ষমতা ছাড়ার পর ধীরে ধীরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। ২০১৭, ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাকে প্রার্থী হতে দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময়ে তিনি রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের সমালোচনাও করেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বেহনাম বেন তালেবলু নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ক্ষমতা ছাড়ার পর আহমাদিনেজাদ এমন এক ধরনের ‘জনতাবাদ-জাতীয়তাবাদ-ইসলামবাদে’র সমন্বিত রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য আদর্শিক ও সামাজিক— উভয় দিক থেকেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল।

ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ

নিউইয়র্ক টাইমসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, আহমাদিনেজাদ অন্তত ২০২৩ সাল থেকেই ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যে ছিলেন। সে বছর পরিবেশবিষয়ক একটি সম্মেলনে অংশ নিতে গুয়াতেমালা যাওয়ার সময় মোসাদের গোয়েন্দাদের সঙ্গে তার প্রথম যোগাযোগ হয়। সফরের আগে তেহরান বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে দেশ ছাড়তে বাধা দিলে তিনি কয়েক ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পরে তাকে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়।

এরপর ২০২৪ সালে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে লুডোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিসে আয়োজিত জলবায়ুবিষয়ক একটি সম্মেলনে অংশ নেন আহমাদিনেজাদ। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর গেরগেই ডেলি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, হাঙ্গেরি সরকারের এক কর্মকর্তার অনুরোধে এ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যেন আহমাদিনেজাদ ও ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকের সুযোগ তৈরি হয়।

২০০৫ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন আহমেদিনেজাদ। ছবি: সংগৃহীত
২০০৫ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন আহমেদিনেজাদ। ছবি: সংগৃহীত

ডেলির ভাষায়, ‘আপনার যদি দুই শত্রু থাকে এবং তারা যদি কথা বলতে চায়, তাহলে তাদের আলোচনার সুযোগ করে দেওয়াই সবচেয়ে ভালো।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুদাপেস্টের ওই বৈঠকে মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বারনিয়াও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আহমাদিনেজাদের সফর ও আবাসনের কিছু ব্যয়ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বহন করা হয়েছিল বলে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে দাবি করা হয়েছে।

‘টাকার জন্য নয়, ক্ষমতার জন্য’

আহমাদিনেজাদের সাবেক উপদেষ্টা আবদোলরেজা দাভারি অবশ্য দাবি করেছেন, অর্থের লোভে তিনি এসব করেননি। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘আহমাদিনেজাদ টাকার জন্য এটা করবেন না। তার নিজের অর্থ আছে, বিস্তৃত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কও আছে। তিনি এটা করবেন ক্ষমতার জন্য। তিনি আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরতে চান।’

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ইরানের সরকার, আইআরজিসি কিংবা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি। ফলে আহমাদিনেজাদের কথিত গৃহবন্দিত্ব, মোসাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও তাকে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনার দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি ইরানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ফের হরমুজ ঘিরে তীব্র সংঘাত, তেহরান বলছে ‘কূটনীতি অর্থহীন’

ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে— এমন কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। এতে গত মাসে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার ভবিষ্যৎ নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

১৬ ঘণ্টা আগে

ব্যাংককে বারে আগুন, প্রাণ গেল ২৭ জনের

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বারের মঞ্চের কাছাকাছি একটি জায়গায় আগুনের সূত্রপাত ঘটে। দ্রুতই সেটি ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বারের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ক্রমে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় ঘরটি।

১৭ ঘণ্টা আগে

আমরা চুক্তির কাছাকাছি ছিলাম, ইরান হঠাৎ জাহাজে হামলা করল: ট্রাম্প

ট্রাম্প বলেছেন, গত শনিবার তারা ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কাছাকাছি ছিলেন। এমন সময় ইরান হঠাৎ একটি জাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়ে সেটি ভেস্তে দেয়।

১ দিন আগে

তীব্র খরা ও খাদ্যসংকট: উগান্ডায় অনাহারে ১৬ জনের মৃত্যু

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে—যা সাধারণত উগান্ডার মূল বপন মৌসুম—কারামোজা অঞ্চলে খুবই সামান্য অথবা একেবারেই বৃষ্টি হয়নি। বৃষ্টির তীব্র অভাবে ভুট্টা, জোয়ার ও সয়াবিনের বিস্তীর্ণ ক্ষেত শুকিয়ে গেছে। ফলে ভালো ফলনের যে আশা ছিল, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। কৃষিজ উৎপাদন শূন্যের কোঠায়

২ দিন আগে