যুদ্ধে ‘সত্যিকারের বিজয়’ দাবি ইরানের, হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ‘সত্যিকারের বিজয়’ দাবি করেছে ইরান। প্রতীকী ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইরান ‘সত্যিকারের বিজয়’ অর্জন করেছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। একই সঙ্গে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়েও ওয়াশিংটনকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে তেহরান।

ইরানের সংবাদ সংস্থা আইএসএনএকে গালিবাফ বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরান প্রকৃত বিজয় অর্জন করেছে। তার ভাষায়, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক বা ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ইরানের বিজয়ের একটি দলিল।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সামরিক পর্বের পাশাপাশি কূটনৈতিক লড়াইকেও নিজেদের সাফল্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে তেহরান। গালিবাফের বক্তব্যে সেই অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে। তার দাবি, যুদ্ধের মধ্যেও ইরান নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং পরবর্তী কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সেই অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর পাশাপাশি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘সম্পূর্ণ পরাজিত’ না করা পর্যন্ত তারা পিছু হটবে না। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফারসে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিরোধের যে উত্তরাধিকার তৈরি হয়েছে, তা এখন নতুন প্রজন্মের ইরানিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক সামরিক শক্তির বিরুদ্ধেও ইরানিরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

১৯৯০ সালে ইরানি যুদ্ধবন্দিদের ইরাকে আটক থাকার পর দেশে ফেরার বার্ষিকী উপলক্ষ্যে দেওয়া ওই বিবৃতিতে সশস্ত্র বাহিনী জানায়, ‘শত্রু আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত’ ইরান তার বৈধ অধিকার ও দেশটির নেতৃত্বের দাবিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

বিবৃতিতে ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রশংসা করা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ও মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

ইরান পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন। ছবি: এক্স থেকে
ইরান পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন। ছবি: এক্স থেকে

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও নিজেদের সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরছে ইরান। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রায় ছয় মাস ধরে যুদ্ধ চললেও তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন সক্ষমতার ৮৫ শতাংশের বেশি অক্ষত রয়েছে।

ফারসের প্রকাশিত একটি তথ্যচিত্রে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরানের সামরিক উৎপাদন অবকাঠামোর বিভিন্ন স্থানে হামলা হলেও ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উৎপাদন ও সরবরাহের হার যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় কমেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

আইআরজিসির ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের যে পরিমাণ কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল, বর্তমানে তার চেয়েও ভালো অবস্থানে রয়েছে দেশটি। আইআরজিসির নিজস্ব স্বনির্ভরতা সংস্থার মাধ্যমে এসব সরঞ্জামের বড় একটি অংশ উৎপাদন করা হয় বলেও জানান তিনি।

তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চাপের জায়গা হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ পথকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের বিরোধ এখনো কাটেনি।

ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি হরমুজ প্রণালি ‘দখল বা নিজের অংশে পরিণত করা’র কোনো চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার জন্য অনুতপ্ত হতে হবে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো শত্রুতামূলক পরিকল্পনা মোকাবিলা এবং দেশের স্বার্থ রক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও হরমুজের নিরাপত্তা নিয়ে তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণ নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবৈধ কর্মকাণ্ড, হস্তক্ষেপ, হুমকি ও নৌ অবরোধ’ বন্ধ করার ওপর।

পাশাপাশি গত দুই মাসে যেসব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন হয়েছে, সেগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানান বাঘাই। তার ভাষায়, হরমুজের বর্তমান অনিরাপদ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘অবৈধ ও আগ্রাসী পদক্ষেপের সরাসরি ফল’।

এ পরিস্থিতিতে সামরিক সংঘাত কিছুটা কমলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মূল বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তেহরান একদিকে যুদ্ধকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কৌশলগত ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ধরে রেখেছে।

ইরানের সামরিক নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোও ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধ শেষ হলেও দেশটির প্রতিরোধের নীতি বদলাচ্ছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা, ক্ষতিপূরণ ও বিদেশি সামরিক উপস্থিতির মতো বিষয়গুলোকে সামনে রেখে তেহরান পরবর্তী পর্যায়ের দর-কষাকষিতে শক্ত অবস্থান নিতে চাইছে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

হরমুজ নিয়ে বৈঠক স্থগিত, তেল সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবে হুতিদের হামলা, সপ্তাহান্তে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উপসাগরে জাহাজে হামলার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।

১ দিন আগে

ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের কথা বলে পাঠানো হয় রাশিয়ায়, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত মামুন

রাশিয়ায় পৌঁছানোর চার দিনের মাথায় এজেন্সির লোকজন ও সেখানকার একটি পাচারকারী চক্র মামুনসহ দলের সবাইকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। সেখানে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে জোরপূর্বক যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

১ দিন আগে

যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি উদ্যোগ, তবু রাশিয়া-ইউক্রেনে সংঘাত অব্যাহত

মার্কিন কর্মকর্তারা বৈঠকগুলোকে ইতিবাচক ও অর্থবহ বলে বর্ণনা করেছেন। জেলেনস্কিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র শীতকালে সংঘাত কমানোর কিছু পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরকে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরুর সম্ভাব্য সময় হিসেবে দেখছে কিয়েভ।

১ দিন আগে

গাজায় গণহত্যা নিয়ে তথ্যচিত্র, নির্মাতাদের নাগরিকত্ব বাতিল চান ইসরায়েলি মন্ত্রী

ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পাওয়ার পরই ‘নাজা’ নিয়ে ইসরায়েলি সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। গত শনিবার ঘোষিত পুরস্কারের আগে ছবিটি ২৫ মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওবেশন পেয়েছিল। ছবিটির দুই পরিচালক এর আগে ‘নো আদার ল্যান্ড’ তথ্যচিত্রের সহপরিচালক হিসেবে ২০২৫ সালে অস্কারে সেরা তথ্যচিত্

১ দিন আগে
Advertisement