যেসব চ্যালেঞ্জ ভেস্তে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে সমঝোতা চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। প্রতীকী ছবি

টানা প্রায় চার মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে মুখোমুখি বসছেন মার্কিন ও ইরানি কূটনীতিকরা। দুই দেশের এই শীর্ষ বৈঠকের ওপর এখন নির্ভর করছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পথে এমন কিছু জটিল ও সংবেদনশীল চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে পুরো আলোচনাকে ভেস্তে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন এক সমঝোতার পথ খুলে দিয়েছে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ (এমওইউ)। চলতি সপ্তাহে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদনের পর গতকাল বুধবার ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষরের মাধ্যমে এটি কার্যকর করা হয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকই এখনো সন্দিহান যে, সমঝোতা স্মারকে উল্লিখিত মাত্র ৬০ দিনের এই সংক্ষিপ্ত সময়সীমার মধ্যে দুই পক্ষ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কি না। যে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো এই ঐতিহাসিক চুক্তির সামনে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো—

১. পারমাণবিক দূরত্বের অবসান ঘটবে কি?

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করাই ছিল ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণার মূল অজুহাত। ফলে আলোচনার টেবিলে এটিই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই দাবি করেছেন যে, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; তবে তেহরানের জন্য এটি নতুন কোনো কথা নয়।

আসল জটিলতা তৈরি হবে ইরানের কাছে থাকা ‘বোমা তৈরির কাছাকাছি মানের’ ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে। ট্রাম্প চান এই মজুত হয় ধ্বংস করা হোক, নয়তো দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। ইরান এর কোনোটিই করতে রাজি নয়, বড়জোর তারা এই ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমিয়ে (ডাইলিউট) নিষ্ক্রিয় করতে পারে।

এ ছাড়া ভবিষ্যতের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়েও বিরোধ রয়েছে। ওয়াশিংটন চায় ইরান সমৃদ্ধকরণ একদম ‘শূন্যে’র কোঠায় নামিয়ে আনুক, যা মানতে নারাজ তেহরান। অতীতে ৫ থেকে ২০ বছরের জন্য সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার গুঞ্জন উঠলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। উপরন্তু, ২০১৫ সালের ওবামা চুক্তির মতো কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের সুযোগ ইরান এবার দেবে কি না, তা নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে।

২. হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে দেয়, যার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে তীব্র ধাক্কা লাগে। নতুন সমঝোতা অনুযায়ী শুক্রবার থেকেই বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহনের এই রুটটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার কথা।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ টোল-মুক্ত হতে হবে। কিন্তু যুদ্ধের মাধ্যমে এই প্রণালির ওপর বাড়তি যে ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইরান প্রতিষ্ঠা করেছে, তা তারা হাতছাড়া করতে চায় না। তেহরানের জেদ, এই জলপথ ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা রাখতেই হবে।

৩. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বাজেয়াপ্ত তহবিল

ইরানের দাবি, ট্রাম্পকে অবিলম্বে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং তাদের শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ তহবিল মুক্ত করতে হবে। বিপরীতে ওয়াশিংটনের নীতি হলো— নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে ধাপে ধাপে, যা সরাসরি ইরানের শর্ত মানার ওপর নির্ভর করবে।

যদিও বুধবার মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানকে চুক্তির পরপরই তেল বিক্রির প্রাথমিক সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ট্রাম্পের এই নমনীয় মনোভাবের কারণে মার্কিন কট্টরপন্থিরা ইতোমধ্যেই তার তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন। ট্রাম্প নিজে ওবামার আমলের ইরান চুক্তির কট্টর সমালোচক ছিলেন। ফলে এখন নিজেই ইরানকে অর্থ ফেরত দিচ্ছেন— এমনটা দেখিয়ে তিনি ঘরোয়া রাজনীতিতে দুর্বল হতে চাইবেন না।

৪. ইসরায়েল কি বাধা হয়ে দাঁড়াবে?

এই যুদ্ধের অন্যতম নেপথ্য কারিগর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, লেবাননে ইরানপন্থি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে মার্কিন-ইরান কোনো চুক্তির তোয়াক্কা করবে না ইসরায়েল।

চলতি সপ্তাহে ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির পর লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও, যেকোনো মুহূর্তে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে এই শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাবে। কারণ ইরানের স্পষ্ট শর্ত, এই চুক্তির সফলতার জন্য লেবাননেও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে হবে।

৫. বিপরীতমুখী আলোচনার শৈলী

মার্কিন প্রতিনিধি দলে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিরা কূটনীতিতে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও পোড়খাওয়া। ট্রাম্প সবসময় তাৎক্ষণিক ও দ্রুত ফলাফল পছন্দ করেন, আর ইরানিদের কৌশল হলো আলোচনাকে যতটা সম্ভব দীর্ঘায়িত করা।

ট্রাম্প গণমাধ্যমকে বলেছেন, আলোচনার এই ধাপটি আগের চেয়ে ‘সহজ’ হবে। কারণ তেলের উচ্চ দামের কারণে ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ চাপে আছেন, আর ইরানও সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। কিন্তু মার্কিন দলটিতে কারিগরি ও কৌশলগত বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে, যা চতুর ইরানি কূটনীতিকদের সামনে ৬০ দিনের মধ্যে একটি বিস্তারিত চুক্তি চূড়ান্ত করা কঠিন করে তুলবে।

৬. গভীর অবিশ্বাস ও ব্যক্তিগত প্রতিশোধের রাজনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের অবিশ্বাস ঐতিহাসিক। বিশেষ করে গত এক বছরে আলোচনার মাঝপথেই দু-দুবার মার্কিন হামলার শিকার হয়েছে তারা। তার চেয়েও বড় বিষয়, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির সম্মতি ছাড়া কোনো চুক্তি সম্ভব নয়।

মুজতবা খামেনি তার বাবা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির চেয়েও অনেক বেশি কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত। ফলে এই আলোচনার পেছনে গভীর ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের দেয়াল রয়েছে। একইভাবে মার্কিন প্রশাসনও ইরানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তাদের ভয়, ইরান হয়তো আলোচনার নামে কেবল সময়ক্ষেপণ করছে।

অন্যান্য যে কারণে আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে

  • কট্টরপন্থিদের চাপ: ট্রাম্প যদি মার্কিন কট্টরপন্থিদের চাপে পড়ে ইরানকে ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানান, কিংবা ইরানের কট্টরপন্থিরা যদি তাদের আলোচকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
  • ভুল ব্যাখ্যা: সমঝোতা স্মারকের ধারাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ও সাংঘর্ষিক ব্যাখ্যার কারণে যদি উভয় পক্ষ অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে বসে।
  • হুমকি-ধমকি: ট্রাম্প যদি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আবারও কোনো কঠোর সামরিক হুমকি দিয়ে বসেন, তবে ইরান মুহূর্তের মধ্যে আলোচনা বর্জন করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত যদি কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তি না-ও হয়, তবে আলোচনার সময়সীমা বাড়ানো বা একটি সীমিত চুক্তি করার পথ খোলা থাকবে। তবে সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো মুহূর্তে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স অবলম্বনে

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

লেবাননে 'যুদ্ধবিরতিতে সম্মত' ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ, জানালেন মার্কিন কর্মকর্তা

লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা চুক্তিটিকে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপান্তরের সম্ভাবনা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। এরপরই এই যুদ্ধবিরতির খবর এলো।

১৯ ঘণ্টা আগে

হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ: ৪৮ ঘণ্টা আগে ইরানের অনুমতি বাধ্যতামূলক

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জাহাজ পরিচালনাকারীদের হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করার অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা সরকারি ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদন জমা দিতে হবে। আবেদনে জাহাজের সঠিক যোগাযোগ তথ্য, রুট ও সময়সূচি উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন না করলে প্রণালিতে প্রবেশ কিংবা বের

২০ ঘণ্টা আগে

সুইজারল্যান্ড বৈঠক বাতিল, অনিশ্চয়তায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার সময়সূচি

সুইজারল্যান্ডে ইরানি ও মার্কিন আলোচনাকারীদের মধ্যে শুক্রবার পূর্বনির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় চার মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে (এমওইউ) একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপান্তরের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই আলোচনার সময়সূচি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছ

২১ ঘণ্টা আগে

জরিমানা ছাড়াই দেশ ছাড়ার অনুমতি দিল আরব আমিরাত

আইসিপির তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বেশ কিছু ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় অনেক বিদেশি নাগরিক নির্ধারিত সময়ে নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। মানবিক বিবেচনায় তাদের ওপর আরোপিত ওভারস্টে জরিমানা সাময়িকভাবে মওকুফ করা হয়েছিল।

২১ ঘণ্টা আগে