গাজায় শিশুদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে ‘গণহত্যা’ অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল: জাতিসংঘ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
গাজার খান ইউনিসে ইসরায়েলি হামলায় নিহত এক শিশুকে কোলে নিয়ে মায়ের আহাজারি। ছবি: সংগৃহীত

গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করে হত্যা করার মাধ্যমে ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (২৩ জুন) ওই কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, অবরোধ, বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যসেবা ধ্বংস এবং মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার মতো কর্মকাণ্ড সম্মিলিতভাবে এমন একটি চিত্র তুলে ধরে, যা ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে নিহতদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। তদন্ত কমিশনের মতে, এ ধরনের বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন বা অনিচ্ছাকৃত ঘটনা নয়; বরং এটি এমন এক ধারাবাহিকতার অংশ, যা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর গণহত্যামূলক অভিপ্রায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরালিধর এক বিবৃতিতে বলেন, তদন্তে পাওয়া প্রমাণ স্পষ্টভাবে দেখায়, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং তাদের হত্যা করেছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও শিশুদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা তদন্তে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জনবহুল আবাসিক এলাকায় শিশু হতাহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকলেও ইসরায়েল উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ও ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র ব্যবহার অব্যাহত রাখে। কমিশনের মতে, শিশুদের ব্যাপক প্রাণহানির পরও একই ধরনের হামলা চালিয়ে যাওয়া থেকে বোঝা যায়, এসব হামলার পরিণতি সম্পর্কে ইসরায়েল অবগত ছিল এবং তবুও অভিযান চালিয়ে গেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বেসামরিক জনগণকে সামগ্রিকভাবে হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হিসেবে বিবেচনা করায় শিশুদেরও সমষ্টিগতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।

মুরালিধর বলেন, শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সক্ষমতাকেই দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে।

গাজার নুসেরাত শরণার্থী শিবিরে খাবারের জন্য শিশুদের ভিড়। ছবি: সংগৃহীত
গাজার নুসেরাত শরণার্থী শিবিরে খাবারের জন্য শিশুদের ভিড়। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাপক সামরিক হামলা, বারবার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং খাদ্য, ওষুধ ও ত্রাণ প্রবেশে অবরোধের কারণে সৃষ্ট অনাহারের মতো গাজার ওপর ইসরায়েলের আরোপিত পরিস্থিতি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে বহু প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ঘটেছে এবং প্রায় পুরো প্রজন্ম গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে বেড়ে উঠছে।

তদন্তে আরও বলা হয়েছে, হাসপাতাল, মাতৃসেবা কেন্দ্র এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার কারণে নবজাতকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে গেছে। একই সঙ্গে গর্ভপাতের হার বেড়েছে বলে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। কমিশনের মতে, বর্তমানে গাজার প্রায় সব শিশুরই মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও মনোসামাজিক সহায়তা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে ইসরায়েলের অবস্থানও তুলে ধরা হয়েছে। জেনেভায় ইসরায়েলের মিশন কমিশনের প্রতিবেদনের অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে একে ‘মানহানিকর প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, হামাস পরিকল্পিতভাবে হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত জ্বালানি ও মানবিক সহায়তা নিজেদের প্রয়োজনে সরিয়ে নেয় এবং ত্রাণ বিতরণে বাধা তৈরি করে। তবে হামাস এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, গাজায় ত্রাণ, খাদ্য ও জ্বালানি প্রবেশে ইসরায়েলই বাধা দিয়ে আসছে।

এর আগেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একই তদন্ত কমিশন এক প্রতিবেদনে উপসংহারে পৌঁছেছিল, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে উসকানি দিয়েছেন।

পৃথকভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছে, যদিও ইসরায়েল গণহত্যার সব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি মিত্র দেশের কূটনৈতিক সমর্থন পেয়ে আসছে।

প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করে, জাতিসংঘের তদন্তকারী, মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং বিশ্বের বিভিন্ন গণহত্যাবিষয়ক গবেষকের বিশ্লেষণেও এমন সিদ্ধান্ত উঠে এসেছে, ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্য ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হচ্ছে।

গাজার জাবালিয়া শিবিরের কাছে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি ভবনের সামনে খেলছে শিশুরা। ছবি: সংগৃহীত
গাজার জাবালিয়া শিবিরের কাছে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি ভবনের সামনে খেলছে শিশুরা। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদনে গণহত্যা শব্দটির আইনি সংজ্ঞারও উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের পর গণহত্যাকে আন্তর্জাতিক আইনে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তিবিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ইসরায়েলের ওই দখলকে অবৈধ ঘোষণা করলেও অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ এখনো ইসরায়েলের হাতেই রয়েছে। কমিশনের তথ্যমতে, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এ ছাড়া গণগ্রেপ্তার ও আটক অভিযানের সময় শিশুদের ওপর নির্যাতনেরও প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে কিশোর ছেলেদের জোর করে কাপড় খুলতে বাধ্য করা, মারধর করা, পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়া এবং যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মতো নির্যাতনের শিকার হওয়ার বহু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

কমিশনের উপসংহার, ফিলিস্তিনি শিশুদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। বিশেষ করে নির্যাতন এবং গুরুতর শারীরিক ও মানসিক কষ্ট সৃষ্টিকারী অমানবিক কর্মকাণ্ডের পর্যাপ্ত প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামাতে নির্দেশ সিনেটের

এর আগে চলতি মাসের শুরুতে প্রতিনিধি পরিষদেও (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) একই ধরনের প্রস্তাব অল্প ব্যবধানে পাস হয়েছিল। ফলে প্রথমবারের মতো কংগ্রেসের উভয় কক্ষই একজন প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব অনুমোদন করল।

৬ ঘণ্টা আগে

রেকর্ড গরমে পুড়ছে ফ্রান্স: বাঁচতে নদী-খালে নেমে ৪০ জনের মৃত্যু

৬ ঘণ্টা আগে

ট্রাম্পের দাবি ইরান ‘অনন্তকাল’ পারমাণবিক পরিদর্শনে সম্মত, অস্বীকার তেহরানের

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মঙ্গলবার বলেন, সুইজারল্যান্ডে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসির কোনো বৈঠক হয়নি। পাশাপাশি জাতিসংঘের এই পারমাণবিক তদারকি সংস্থাকে ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ারও কোনো পরিকল্পনা নেই।

১৮ ঘণ্টা আগে

৩ দশকে যুক্তরাজ্যের তাপমাত্রা ছুঁতে পারে ৪৫ ডিগ্রি— সতর্কতা বিজ্ঞানীদের

মঙ্গলবার (২৩ জুন) লন্ডন ক্লাইমেট অ্যাকশন উইকে বক্তব্য দেন গুতেরেস। সেখানে তিনি বলেন, বিশ্ব এখন একই সঙ্গে দুটি সংকটের মুখোমুখি— জলবায়ু সংকট ও জ্বালানি সংকট। এই দুই সংকটের মূল উৎস একটিই, আর তা হলো জীবাশ্ম জ্বালানি।

১৯ ঘণ্টা আগে