হরমুজ প্রণালি বন্ধ

৬ সপ্তাহ আটকে আছেন পারস্য উপসাগরে, মানসিক শক্তির শেষ সীমায় নাবিকরা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছে দুই হাজারের বেশি জাহাজ এবং ২০ হাজারের বেশি নাবিক। ছবি: রয়টার্স

“এই পরিস্থিতি মানসিকভাবে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেটা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করতে পারি, কিন্তু এখন তা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে।”

ছয় সপ্তাহ ধরে উপসাগরে আটকে থাকা ২০ হাজারের বেশি নাবিকের একজন এভাবেই তুলে ধরেছেন নিজের মানসিক অবস্থাকে। হরমুজ প্রণালি ইরান নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় তারা কার্যত বন্দি হয়ে পড়েছেন, আর ধীরে ধীরে পৌঁছে যাচ্ছেন মানসিক সক্ষমতার শেষ সীমায়।

প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর এসব নাবিক বন্দি দশা থেকে মুক্তির আশা দেখতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলের লেবাননে হামলার জের ধরে ইরান ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় যুদ্ধবিরতি নড়বড়ে হয়ে গেছে। তাতে এসব নাবিক সাগর থেকে মুক্তির যে আশা দেখতে শুরু করেছিলেন, তা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।

ওই নাবিক বলেন, “আমরা নোঙর করে আছি, আশপাশে ডজনখানেক তেলভর্তি ট্যাংকার। কেউ এক ইঞ্চিও নড়েনি।”

সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলের কাছে শত শত জাহাজ আটকে আছে। সেখান থেকেই তারা কয়েক সপ্তাহ আগে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রে আগুনে পুড়ে যাওয়া কুয়েতের একটি তেলবাহী জাহাজ দেখতে পেয়েছেন।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ধোঁয়ার রেখা দেখতে পান নাবিকরা। দেড় মাস ধরে ড্রোন হামলা ও পানির নিচে মাইন থাকার আশঙ্কার মধ্যে অনেক নাবিকই এখন প্রণালিটি অতিক্রম করতে অনিচ্ছুক, যদিও যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী তাদের হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।

এ অবস্থায় রীতিমতো মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন নাবিকরা। ওই নাবিক গার্ডিয়ানকে বলেন, “আমি ঠিক এক মাস আগে চাকরি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছি। ক্যাপ্টেনকে জানিয়েছি, আমি এই প্রণালি দিয়ে যেতে রাজি নই। এটা পুরোটাই এখন নিরাপত্তা ইস্যু।”

ওই নাবিকের ভাষ্য, একই জাহাজে থাকা প্রায় ৯০ শতাংশ নাবিকই এই ঝুঁকি নিতে চান না এবং ‘সেইল’ করতে অস্বীকৃতি জানানোর অধিকার প্রয়োগ করতে চান। এক সহকর্মী এরই মধ্যে “মানসিক বিপর্যয়ে”র শিকার হয়েছেন। তাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।

তেলবাহী জাহাজে থাকা নাবিকটি বলেন, “আমি নিশ্চিত, এই মানসিক বিপর্যয়ের ঘটনা শুধু আমাদের জাহাজে নয়, বরং চারপাশের অনেক ট্যাংকারেই ঘটছে। সাপোর্ট হেল্পলাইনগুলো চেষ্টা করছে। কিন্তু শুরু থেকেই আমরা জানতাম, এটা যথেষ্ট হবে না।”

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন জানিয়েছে, তারা তিন শতাধিক জাহাজ থেকে প্রায় এক হাজার ঘটনার খবর পেয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ ঘটনায় নাবিকরা দেশে ফেরার অনুরোধ করেছেন। অন্যদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে বেতন, জ্বালানি, খাদ্য ও পানির মতো জরুরি পণ্যের সরবরাহ।

কয়েক মাইল দূরে কুয়েতের একটি তেলবাহী জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার পর প্রথমবারের মতো হেল্পলাইনে ফোন করেন ওই নাবিক। তিনি বলেন, “আমি খুব চাপে ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না এই অনুভূতিগুলো সামলাতে পারব কি না। আমি চাই না কেউ আমাকে কাঁদতে দেখুক। কিন্তু একজন অচেনা মানুষের কাছে সব খুলে বলাটা কিছুটা সাহায্য করেছে।”

তবে দূর থেকে পরামর্শ দিয়ে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন নটিলাস সংগঠনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডেভিড অ্যাপলটন। তিনি বলেন, “সবাই সাহায্য করার চেষ্টা করে, কিন্তু আসলে যা দরকার তা হলো— মানুষকে এই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনা।”

অ্যাপলটন আরও বলেন, “সহিংসতার হুমকি একদিকে যেমন মানসিক চাপ তৈরি করে, তেমনি বসা হাঁস’ (সহজ লক্ষ্যবস্তু) হয়ে থাকার অনুভূতিও আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিশ্চয়তা— কতদিন এভাবে চলবে, কেউ জানে না।”

আটকে থাকা জাহাজগুলোর নাবিকদের মানসিক অবস্থার অবনতি নতুন করে দাবি তুলেছে— জাহাজ মালিকদের উচিত তাদের বদলে নতুন ক্রু পাঠানো। আন্তর্জাতিক নৌবিধি অনুযায়ী, বিপজ্জনক এলাকায় নাবিকদের জোর করে কাজ করানো যায় না। তবে এমন অনেকেই আছেন, যারা বাধ্য হয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিতে পারেন।

ওই নাবিক বলেন, “আমাদের জায়গায় যারা আসতে পারে, তাদের বেশির ভাগই ইউক্রেনীয়। তারা নিজের দেশে ফিরতে পারে না, বিদেশে খরচ চালাতে হচ্ছে বলে এই কাজ নিতে বাধ্য হচ্ছে।”

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করা নাবিকদের দ্বিগুণ বেতন দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। জাহাজ কোম্পানিগুলো পদোন্নতির লোভ দেখিয়ে কিংবা যারা দীর্ঘদিন কাজের বাইরে আছেন, তাদেরও এই কাজে আনতে পারে।

“আমাদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য একটাই— পছন্দের সুযোগ। কারণ যেটাই হোক, তারা অন্তত নিজের সিদ্ধান্তে এখানে আসবে,”— বলেন ওই নাবিক। তার আশা, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের জাহাজটি এমন স্থানে নেওয়া হবে, যেখানে নতুন ক্রুরা এসে দায়িত্ব নিতে পারবেন।

তিনি বলেন, “ক্যাপ্টেন ক্রু ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তিনি চাইছিলেন আমরা যেন মাল খালাসের বন্দরে পৌঁছানো পর্যন্ত থাকি। কিন্তু ক্যাপ্টেন সেটা সঙ্গে সঙ্গেই নাকচ করে দেন। এ অবস্থার পর আমি মানসিকভাবে কোনো কঠিন কাজ করার মতো অবস্থায় নেই। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।”

ওই নাবিক জানান, হয়তো আর কখনো সমুদ্রে ফিরবেন না। তিনি বলেন, “আমি সারা জীবন ট্যাংকারে কাজ করেছি। এই পেশা ছাড়তে হলে আমার সব অর্জন ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু যদি এ পেশাতেই থাকি, তাহলে আবার কোনো একসময় এখানে ফিরতে হতে পারে। এ সিদ্ধান্ত নিতে পারব শুধু তখনই, যখন কয়েক মাস বাড়িতে থাকব, এই জাহাজ থেকে অনেক দূরে।”

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বড় সুবিধা পাবে আইআরজিসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য

যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দৃষ্টিতে যাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটিতে পরিণত হতে পারে।

৬ ঘণ্টা আগে

‘বিশ্বাসঘাতক’ ট্রাম্পের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় ক্ষোভ, এককভাবে লড়াইয়ের পক্ষে ইসরায়েলিরা

৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন এই নেতা এখন ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখনও তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।

৬ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা: সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন উইটকফ ও আরাগচি

লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর অন্তর্বর্তীকালীন ইরান যুদ্ধ চুক্তিকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক চুক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা আবারও জোরদার হয়েছে। এই আলোচনার অংশ হিসেবে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি উভয়েই সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে এক্সিওসের বরাতে জানিয়ে

৮ ঘণ্টা আগে

ইরান ইস্যুই গড়তে পারে জে ডি ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী এ ধরনের হাই-প্রোফাইল আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর। কিন্তু ট্রাম্প দৃশ্যত রুবিওর পরিবর্তে ভ্যান্সকেই সামনে নিয়ে এসেছেন। ফলে প্রশাসনের ভেতরে রুবিওর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

৯ ঘণ্টা আগে